কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ

মোশতাক আহমেদ  avatar   
মোশতাক আহমেদ
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS)-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ শিক্ষাবর্ষে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় (TVET) মোট শিক্ষা...

সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS)-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ শিক্ষাবর্ষে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় (TVET) মোট শিক্ষার্থী ভর্তির হার মাধ্যমিক স্তরে এখনও ২০ শতাংশের নিচে রয়ে গেছে, যা সরকারের ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি দেশের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। যেখানে উন্নত দেশগুলো কারিগরি শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছে, সেখানে বাংলাদেশে এই খাতের ধীরগতি গভীর অনুসন্ধানের দাবি রাখে। এই পশ্চাৎপদতা কেবল অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় নয়, বরং পাঠ্যক্রমের অপ্রাসঙ্গিকতা, প্রশিক্ষকদের দক্ষতার অভাব এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির মতো বহুবিধ জটিলতার গভীরে প্রোথিত।

কারিগরি শিক্ষার ব্যর্থতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো বিদ্যমান পাঠ্যক্রমের সঙ্গে শিল্প খাতের চাহিদার সুস্পষ্ট ব্যবধান। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এর অধীনে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে শেখানো বিষয়বস্তু অনেক ক্ষেত্রেই পুরনো প্রযুক্তিনির্ভর এবং আধুনিক শিল্পের চাহিদা পূরণে অক্ষম। উদাহরণস্বরূপ, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে রোবটিক্স, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা ডেটা অ্যানালিটিক্সের মতো উচ্চ-চাহিদাসম্পন্ন দক্ষতার পরিবর্তে প্রচলিত ইলেকট্রিক্যাল বা সিভিল ট্রেডগুলোতে অতিরিক্ত জোর দেওয়া হচ্ছে, যা স্নাতকদের কর্মসংস্থান সক্ষমতা হ্রাস করছে। ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতিমালার আওতায় দক্ষতা মান নির্ধারণের চেষ্টা করলেও, এই মানগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা ও মনিটরিংয়ের অভাব প্রকট। অনেক প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ ও ল্যাব সুবিধা এক দশক বা তারও বেশি পুরনো, যা শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ সীমিত করে।

শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের অভাব এবং তাদের পেশাগত উন্নয়নে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকাও এই খাতের একটি বড় দুর্বলতা। কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনেক প্রশিক্ষক আধুনিক শিল্প প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত নন অথবা তাদের প্রশিক্ষণ হালনাগাদ করা হয় না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় (MoE) এর অধীনে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ নীতি নির্ধারণ করলেও, প্রশিক্ষকদের জন্য নিয়মিত শিল্প-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ বা পুনঃপ্রশিক্ষণের ব্যবস্থা অপ্রতুল। এর ফলে, শ্রেণীকক্ষে যে শিক্ষা দেওয়া হয়, তা বাস্তব কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া, কারিগরি শিক্ষার প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এখনও নেতিবাচক, যেখানে উচ্চশিক্ষার প্রথম পছন্দ হিসেবে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়কেই দেখা হয়। এই সামাজিক চাপ এবং তথ্যের অভাব অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীকে কারিগরি শিক্ষা থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে, যা এই খাতের গুণগত মান উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কারিগরি শিক্ষাপ্রাপ্তদের জন্য সরাসরি উচ্চতর ডিগ্রির পথ সুগম করতে পুরোপুরি সফল হয়নি, যা এই ধারার শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করে।

সূচক ২০১৯ সাল ২০২১ সাল ২০২৩ সাল (প্রাক্কলিত)
মাধ্যমিক স্তরে কারিগরি শিক্ষায় মোট শিক্ষার্থী ভর্তির হার (%) ১৪.৭ ১৬.২ ১৮.৫
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮,২০০ ৯,০০০ ৯,৭৫০
কারিগরি শিক্ষা বাজেট বরাদ্দ (মোট শিক্ষা বাজেটের %) ৮.৫ ৯.২ ৯.৮
TVET স্নাতকদের ৬ মাসের মধ্যে কর্মসংস্থান হার (%) ৫০ ৫২ ৫৩

উৎস: BANBEIS বার্ষিক প্রতিবেদন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বাজেট সারসংক্ষেপ ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এর তথ্য।

সুপারিশ

  • কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এবং ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) যৌথভাবে প্রতি দুই বছর অন্তর শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি পাঠ্যক্রমের বাধ্যতামূলক আধুনিকায়ন করবে। এই প্রক্রিয়ায় শিল্পের শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধিদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে এবং এনএসডিএ'র ন্যাশনাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক (NTVQF) এর সঙ্গে পূর্ণাঙ্গভাবে সঙ্গতিপূর্ণ নতুন মডিউল ও ট্রেড চালু করতে হবে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় (MoE) এবং অর্থ মন্ত্রণালয় কারিগরি শিক্ষার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'কারিগরি শিক্ষা উন্নয়ন তহবিল' গঠন করবে, যা থেকে কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোর ল্যাব আধুনিকীকরণ, অত্যাধুনিক যন্ত্রাংশ ক্রয় এবং প্রশিক্ষকদের জন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শিল্প-ভিত্তিক উচ্চতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। এই তহবিলের একটি অংশ প্রশিক্ষকদের জন্য 'শিল্প অভিজ্ঞতা বৃত্তি' হিসেবে বরাদ্দ থাকবে, যা তাদের শিল্প প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ দেবে।
  • বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্রেডিট ট্রান্সফার এবং উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে। এর পাশাপাশি, NSDA-এর মাধ্যমে প্রতিটি কারিগরি কোর্সের জন্য শিল্প প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক তিন থেকে ছয় মাসের ইন্টার্নশিপ বা অ্যাপ্রেন্টিসশিপ প্রোগ্রাম চালু করতে হবে, যেখানে সরকার সংশ্লিষ্ট শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে উৎসাহিত করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মোশতাক আহমেদ

মোশতাক আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator