বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক: পরিবেশবান্ধব সমাধান নাকি নতুন এক ফাঁদ? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক: পরিবেশবান্ধব সমাধান নাকি নতুন এক ফাঁদ?

তৌহিদুর রহমান  avatar   
তৌহিদুর রহমান
বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক: পরিবেশবান্ধব সমাধান নাকি নতুন এক ফাঁদ?
বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক: পরিবেশবান্ধব সমাধান নাকি নতুন এক ফাঁদ?
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, পরিবেশ দূষণ মোকাবিলায় বিশ্বব্যাপী ‘বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক’ ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যা প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং শিল্পের জন্য একটি নতুন দিগন্ত ...

সম্প্রতি, পরিবেশ দূষণ মোকাবিলায় বিশ্বব্যাপী ‘বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক’ ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যা প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং শিল্পের জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তবে বাংলাদেশে এই ধরনের প্লাস্টিকের ব্যাপক প্রচলন নিয়ে গভীর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। গত বছর, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত একটি প্রাথমিক প্রতিবেদনে দেশে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং তথাকথিত ‘বায়োডিগ্রেডেবল’ প্লাস্টিকের সঠিক সংজ্ঞায়ন ও নিষ্পত্তির অবকাঠামোগত অভাবকে প্রকটভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যা এ খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে, বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক কি সত্যিই পরিবেশবান্ধব সমাধান, নাকি এটি এক নতুন ফাঁদ, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি।

প্লাস্টিক বর্জ্যের ক্রমবর্ধমান চাপ মোকাবিলায় বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিককে প্রায়শই একটি মহৎ সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বিশেষ করে ফুড প্যাকেজিং, কৃষি বর্জ্য ব্যাগ এবং ডিসপোজেবল কাটলারির মতো পণ্যগুলিতে এর ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী প্লাস্টিকের তুলনায় এই ধরনের প্লাস্টিক পরিবেশগতভাবে কম ক্ষতিকর বলে দাবি করা হয়, কারণ এগুলি নির্দিষ্ট শর্তাধীনে অণুজীব দ্বারা দ্রুত পচনশীল। এটি landfill-এ বর্জ্যের পরিমাণ কমানো এবং সামুদ্রিক দূষণ রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে এমন ধারণা পোষণ করা হয়। অনেক উন্নত দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা, যেমন World Bank, প্লাস্টিক দূষণ কমাতে এই ধরনের উদ্ভাবনী উপাদানের গবেষণায় এবং উৎপাদনে বিনিয়োগের জন্য উৎসাহ দিচ্ছে। এটি এমন একটি শিল্প যা কাঁচামাল থেকে শুরু করে উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং শেষ পর্যন্ত নিষ্পত্তি পর্যন্ত একটি ভিন্ন সাপ্লাই চেইনের সম্ভাবনা তৈরি করে, যা প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং শিল্পের জন্য নতুন বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

তবে, ‘বায়োডিগ্রেডেবল’ শব্দটির আড়ালে বেশ কিছু জটিলতা লুকিয়ে আছে যা একটি বড় ফাঁদে পরিণত হতে পারে। বেশিরভাগ বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক শুধুমাত্র নির্দিষ্ট শিল্পভিত্তিক কম্পোস্টিং সুবিধার (industrial composting facilities) অধীনেই সম্পূর্ণরূপে পচে যায়, যা উচ্চ তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলিতে এই ধরনের অত্যাধুনিক কম্পোস্টিং সুবিধার সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে একেবারেই নেই। ফলস্বরূপ, এই প্লাস্টিকগুলি সাধারণ landfill বা প্রাকৃতিক পরিবেশে পচতে দীর্ঘ সময় নেয় এবং অসম্পূর্ণ পচনের ফলে মাইক্রোপ্লাস্টিকে (microplastics) রূপান্তরিত হতে পারে, যা ঐতিহ্যবাহী প্লাস্টিকের মতোই পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকারক। উপরন্তু, বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক প্রায়শই প্রচলিত প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহারযোগ্য (recycling) প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে, কারণ মিশ্রিত হলে তা পুনর্ব্যবহৃত পণ্যের গুণগত মান নষ্ট করে দেয়। এটি প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং শিল্পের মধ্যে একটি 'গ্রে এরিয়া' তৈরি করছে যেখানে পণ্যের সঠিক নিষ্পত্তি পদ্ধতি সম্পর্কে স্বচ্ছতার অভাব প্রকট।

এই সামগ্রিক চ্যালেঞ্জের পরিপ্রেক্ষিতে, বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলির জন্য একটি সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা অপরিহার্য। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) এবং World Bank-এর মতো সংস্থাগুলি যদিও প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে, তবে এর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এখনও একটি সমন্বিত ও কার্যকর মডেলের অভাব রয়েছে। স্থানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলি নতুন কাঁচামাল ব্যবহারে আগ্রহী হলেও, এর পরিবেশগত প্রভাব এবং সঠিক নিষ্পত্তি পদ্ধতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত গবেষণার অভাব রয়েছে। প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল এবং উৎপাদিত পণ্যের জীবনচক্র মূল্যায়ন (life cycle assessment) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে ‘সবুজ’ হিসেবে দাবি করা পণ্যগুলির প্রকৃত পরিবেশগত প্রভাব সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যায়। এই ক্ষেত্রে, শুধুমাত্র উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, বরং পণ্যের সমগ্র জীবনচক্রের পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করে নীতি প্রণয়ন করা উচিত।

বাংলাদেশে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিকের প্রাসঙ্গিক তথ্য
সূচক পরিমাণ/শতাংশ সাল/উৎস
বাংলাদেশে দৈনিক প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন ৩,০০০ টন ২০২০ (World Bank)
শহরাঞ্চলে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহের হার ৩৭% ২০২০ (World Bank)
কম্পোস্টিং সুবিধার অভাবে অপচনশীল বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিকের শতাংশ ৭৫% (আনুমানিক) ২০২১ (পরিবেশ অধিদপ্তর গবেষণা)
World Bank কর্তৃক বাংলাদেশে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অনুমোদিত তহবিল ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ২০২২ (Circular Economy Project)
ADB কর্তৃক প্লাস্টিক দূষণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা (দক্ষিণ এশিয়া) ৩০% হ্রাস (২০২৫ সাল নাগাদ) ২০১৯ (ADB Strategy 2030)

উৎস: World Bank, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB), পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর।

সুপারিশ

  • পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে 'জৈব-পচনশীল' (Compostable) এবং 'জৈব-বিয়োজ্য' (Degradable) প্লাস্টিকের মধ্যে সুস্পষ্ট সংজ্ঞা ও মানদণ্ড নির্ধারণ করে একটি জাতীয় আইন বা নীতি প্রণয়ন করতে হবে। এই আইন উৎপাদকদের জন্য বাধ্যতামূলক লেবেলিং প্রথা নিশ্চিত করবে, যেখানে পণ্যের সঠিক নিষ্পত্তি পদ্ধতি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে।
  • স্থানীয় সরকার বিভাগকে (Local Government Division) বাংলাদেশ সরকারের 'জাতীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০১৫'-এর আওতায় শহর ও শিল্পাঞ্চলে অত্যাধুনিক শিল্পভিত্তিক কম্পোস্টিং সুবিধা (industrial composting facilities) স্থাপনের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। এই প্রকল্পগুলিতে World Bank এবং ADB-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করা যেতে পারে।
  • শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (BIDA) প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং শিল্পে প্রকৃত পরিবেশবান্ধব এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য বিকল্প উপাদান (যেমন: উন্নত মানের বায়োবেসড পলিমার বা কাগজভিত্তিক প্যাকেজিং) গবেষণা, উন্নয়ন ও উৎপাদনে বিনিয়োগের জন্য নির্দিষ্ট কর ছাড়, ভর্তুকি এবং সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা প্রদান করতে হবে, যা কেবল 'বায়োডিগ্রেডেবল' নামকরণের আড়ালে পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করবে না।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তৌহিদুর রহমান

তৌহিদুর রহমান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator