স্বাধীন পরিচালকদের কার্যকারিতা: করপোরেট সুশাসনে শুধুই কি 'শো-পিস'? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

স্বাধীন পরিচালকদের কার্যকারিতা: করপোরেট সুশাসনে শুধুই কি 'শো-পিস'?

অ্যাডভোকেট কায়সার  avatar   
অ্যাডভোকেট কায়সার
স্বাধীন পরিচালকদের কার্যকারিতা: করপোরেট সুশাসনে শুধুই কি 'শো-পিস'?
স্বাধীন পরিচালকদের কার্যকারিতা: করপোরেট সুশাসনে শুধুই কি 'শো-পিস'?
ছবি: সংগৃহীত
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর কর্পোরেট সুশাসন কোড পরিপালনে কঠোরতা আরোপের ঘোষণা আবারও স্...

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর কর্পোরেট সুশাসন কোড পরিপালনে কঠোরতা আরোপের ঘোষণা আবারও স্বাধীন পরিচালকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে, গত বছরের শেষের দিকে একটি শীর্ষস্থানীয় বস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়ম এবং পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীন পরিচালকদের নীরব ভূমিকা জনমনে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি করে। যেখানে কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনে গুরুতর অসঙ্গতি ধরা পড়ে এবং অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, সেখানে স্বাধীন পরিচালকদের পক্ষে বোর্ড মিটিংয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য ভিন্নমত বা আপত্তি উত্থাপনের রেকর্ড পাওয়া যায়নি। এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করে যে, করপোরেট সুশাসনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত স্বাধীন পরিচালকরা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের প্রকৃত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছেন, এবং কার্যত তারা কোম্পানির মূল পরিচালকদের 'শো-পিস' হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছেন।

স্বাধীন পরিচালকদের মূল উদ্দেশ্য হলো কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ভারসাম্য নিশ্চিত করা। তারা মূলত কোম্পানির সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা করেন এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের স্বেচ্ছাচারিতা রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। BSEC-এর কর্পোরেট সুশাসন কোড অনুযায়ী, প্রতিটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে নির্দিষ্ট সংখ্যক স্বাধীন পরিচালক থাকা বাধ্যতামূলক। তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং যোগ্যতার মানদণ্ডও সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে, যাতে তারা কোম্পানির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রভাবমুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই স্বাধীন পরিচালকদের নির্বাচন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হয় না। প্রায়শই তারা মূল প্রমোটরদের পছন্দের ব্যক্তি হন, যার ফলে তাদের পক্ষে নিরপেক্ষভাবে কোম্পানির স্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই ধরনের অভ্যন্তরীণ যোগসাজশ স্বাধীন পরিচালকদের 'স্বাধীন' উপাধিটিকে অর্থহীন করে তোলে এবং তাদের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত করে।

স্বাধীন পরিচালকদের অকার্যকর হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ বিদ্যমান। প্রথমত, তাদের পারিশ্রমিক এবং সুযোগ-সুবিধা প্রায়শই কোম্পানির মূল পরিচালকদের উপর নির্ভরশীল থাকে, যা তাদের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন করে। দ্বিতীয়ত, অনেক স্বাধীন পরিচালকই কোম্পানির জটিল আর্থিক ও ব্যবসায়িক বিষয়াদি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখেন না, অথবা তাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য সরবরাহ করা হয় না, যা তাদের কার্যকর তদারকি ক্ষমতা সীমিত করে। তৃতীয়ত, এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তাদের জন্য একটি শক্তিশালী এবং স্বাধীন সমর্থন ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। যদি কোনো স্বাধীন পরিচালক কোম্পানির কোনো অনিয়ম বা অসঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তবে তাকে প্রায়শই একা লড়তে হয়, এবং এর ফলস্বরূপ তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা বা পরবর্তী মেয়াদে পুনর্নিয়োগ না করার মতো ঘটনা ঘটে। এর ফলে এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়, যেখানে স্বাধীন পরিচালকরা অপ্রিয় সত্য বলতে দ্বিধা করেন। World Bank এবং ADB-এর বিভিন্ন গবেষণা এবং প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কর্পোরেট সুশাসনের দুর্বলতা এবং স্বাধীন পরিচালকদের কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে, কার্যকর কর্পোরেট সুশাসনের অভাবে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন এবং স্থানীয় বাজারেও আস্থার সংকট দেখা দিচ্ছে।

এই অকার্যকর স্বাধীন পরিচালকদের প্রভাব সুদূরপ্রসারী এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর। যখন স্বাধীন পরিচালকরা তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, তখন কোম্পানির আর্থিক বিবরণীতে কারচুপি, অভ্যন্তরীণ লেনদেনে অস্বচ্ছতা এবং তহবিল তছরুপের মতো ঘটনা ঘটার ঝুঁকি বাড়ে। এর ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ হারান, পুঁজি বাজারের প্রতি তাদের আস্থা কমে যায় এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। এটি কেবল ব্যক্তিগত কোম্পানির ক্ষতি করে না, বরং দেশের সামগ্রিক করপোরেট সংস্কৃতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির পথ প্রশস্ত করে। বাংলাদেশ সরকার দেশের অর্থনীতিকে একটি টেকসই ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর যে লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে, তার জন্য শক্তিশালী কর্পোরেট সুশাসন অপরিহার্য। স্বাধীন পরিচালকদের কার্যকর ভূমিকা ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন। তাই, তাদের কেবল আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি নয়, বরং প্রকৃত স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

সূচক ২০১৯ ২০২০ ২০২১ ২০২২
তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে BSEC নির্দেশিত স্বাধীন পরিচালক পদের পরিপালন হার (%) ৭২% ৭৫% ৭৮% ৮০%
World Bank এর 'কন্ট্রোল অফ করাপশন' সূচকে বাংলাদেশের পার্সেন্টাইল র‍্যাঙ্ক (০-১০০) ৩০ ২৯ ২৮ ২৯
ADB এর 'কর্পোরেট গভর্ন্যান্স অ্যাসেসমেন্ট' এ 'স্বাধীন পরিচালকদের কার্যকারিতা' উপ-সূচকের গড় স্কোর (১-৫) ২.৫ ২.৪ ২.৬ ২.৭
BSEC কর্তৃক কর্পোরেট সুশাসন লঙ্ঘনের জন্য জরিমানা আরোপিত কোম্পানির সংখ্যা ১২ ১৫ ১৮ ২০

উৎস: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC), World Bank Governance Indicators, Asian Development Bank (ADB) Country Governance Assessment.

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক কর্পোরেট সুশাসন কোডের অধীনে স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আরও কঠোরতা আনা উচিত। বিশেষ করে, স্বাধীন পরিচালকদের মনোনয়নের জন্য একটি স্বতন্ত্র প্যানেল বা কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যা সরাসরি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা BSEC-এর তত্ত্বাবধানে থাকবে, যাতে প্রমোটরদের প্রভাবমুক্ত একটি স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত হয়।
  • স্বাধীন পরিচালকদের জন্য বাধ্যতামূলক এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন কোর্স চালু করা উচিত, যা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ কর্পোরেট গভর্ন্যান্স (BICG) বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়/চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগ কর্তৃক পরিচালিত হতে পারে। এই কোর্সে কর্পোরেট আইন, আর্থিক বিশ্লেষণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং নৈতিকতার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যাতে তারা তাদের দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারেন।
  • কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ (Companies Act, 1994) সংশোধন করে স্বাধীন পরিচালকদের জন্য শক্তিশালী সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং হুইসেলব্লোয়ার নীতি অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এর মাধ্যমে স্বাধীন পরিচালকরা কোনো প্রকার প্রতিশোধের ভয় ছাড়াই কোম্পানির অনিয়ম বা দুর্নীতির বিষয়ে সরাসরি BSEC, রেজিস্টার অফ জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস (RJSC) অথবা বাংলাদেশ সরকার-এর মনোনীত একটি স্বাধীন কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করতে পারবেন।

✍️ নিবন্ধ লেখক: অ্যাডভোকেট কায়সার

অ্যাডভোকেট কায়সার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: করপোরেট গভর্ন্যান্স ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nessun commento trovato


News Card Generator