বাংলাদেশের শ্রমবাজারে মালয়েশিয়া-গমন নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো—রাষ্ট্র একটি খরচ নির্ধারণ করে, কিন্তু বাস্তবে তা কেন মানা হয় না? ২০২২ সালের ৫ জুলাই প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় একটি অফিস আদেশে মালয়েশিয়াগামী কর্মীর সর্বোচ্চ ব্যয় ৭৮,৯৯০ টাকা নির্ধারণ করেছিল। ওই আদেশে স্পষ্ট বলা হয়, বাংলাদেশ প্রান্তের খরচ শ্রমিক বহন করবে, আর মালয়েশিয়া প্রান্তের বিমানভাড়া, ভিসা, নিরাপত্তা জমা, বীমা, চিকিৎসা পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয় বহন করবে নিয়োগকর্তা
কিন্তু কাগজের এই সীমা মাঠে গিয়ে আর কার্যকর থাকেনি। ২০২৪ সালের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে গড় ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা; একই প্রতিবেদনে ৪,৫০০ থেকে ৬,০০০ ডলারের ব্যয়ের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে । অর্থাৎ, সরকারি ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব ব্যয়ের ব্যবধান কয়েক গুণ। এই ব্যবধানই দেখায়, সমস্যা শুধু ফি বাড়ার নয়; সমস্যাটি নিয়ন্ত্রণহীন নিয়োগব্যবস্থার।
এইখানেই “সিন্ডিকেট” শব্দটি আবার সামনে আসে। সীমিত কয়েকটি এজেন্সি বা মধ্যস্বত্বভোগীর হাতে যখন বাজার কেন্দ্রীভূত হয়, তখন প্রতিযোগিতা কমে এবং খরচ বাড়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়া শ্রমবাজারে অতীতে একটি সংগঠিত কাঠামো কাজ করেছে, যেখানে প্রতিটি কর্মী নিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ আদায় হয়েছে এবং এর ফলে পুরো ব্যবস্থাই ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।এর ফল শ্রমিকের জন্য শুধু অতিরিক্ত খরচ নয়; এর মানে জমি বিক্রি, ঋণ, সুদ, আর পরিবারে দীর্ঘমেয়াদি চাপ। বৈধ অভিবাসন তখন নিরাপদ পথ না হয়ে ঋণের ফাঁদে পরিণত হয়।
এখন নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে মালয়েশিয়ার সাম্প্রতিক যোগ্যতার শর্ত। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এজেন্সির অন্তত পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা, গত পাঁচ বছরে ৩,০০০ কর্মী পাঠানোর রেকর্ড, তিনটি দেশে কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা, নিজস্ব ট্রেনিং সেন্টার এবং ১০,০০০ বর্গফুটের স্থায়ী অফিস থাকতে হবে । কাগজে এগুলো মানসম্মত নিয়োগের শর্ত মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এই শর্তগুলো বাজারকে অল্প কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত করতে পারে। আর যখন প্রতিযোগী কমে যায়, তখন খরচ কমে না—বরং বাড়ে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই শর্তগুলো আরও প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ, শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে মূল মানদণ্ড হওয়া উচিত স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ন্যায্য খরচ। ১০,০০০ বর্গফুট অফিস বা নিজস্ব ট্রেনিং সেন্টারকে বাধ্যতামূলক করলে ছোট ও মাঝারি এজেন্সির পক্ষে বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে বাজারে একচেটিয়াকরণ বাড়ে, আর সেই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত শ্রমিকের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, এ ধরনের কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থাই সিন্ডিকেটকে শক্তিশালী করে।
তাই বাংলাদেশের অবস্থান হওয়া উচিত স্পষ্ট ও দৃঢ়। প্রথমত, ৭৮,৯৯০ টাকার সরকারি সীমা কাগজে নয়, বাস্তবেও কার্যকর করতে হবে । দ্বিতীয়ত, সব বৈধ ও যোগ্য এজেন্সিকে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে লেনদেনের পথ বন্ধ করতে হবে, যাতে শ্রমিকের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় না হয়। এ ক্ষেত্রে কোনো সীমিত গোষ্ঠীকে বাজারের নিয়ন্ত্রণ দিলে সিন্ডিকেট ফিরে আসার ঝুঁকি থেকেই যাবে। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ও কঠোর নজরদারিই হতে পারে শ্রমিক সুরক্ষার একমাত্র টেকসই পথ।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য রেমিট্যান্সের বড় উৎস, কিন্তু সেই বাজার যদি আবারও অস্বচ্ছ নিয়োগ, অতিরিক্ত খরচ ও সীমিত এজেন্সির দখলে চলে যায়, তাহলে এর ক্ষতি শুধু শ্রমিকের নয়, পুরো দেশের। একজন কর্মী যদি বিদেশে যেতে গিয়ে গ্রামের জমি বন্ধক রাখেন, তবে সেটি উন্নয়ন নয়, বিপর্যয়। রাষ্ট্রের কাজ শুধু দরজা খোলা নয়; সেই দরজা দিয়ে ঢোকার পথটিও নিরাপদ করা। তা না হলে ৭৮,৯৯০ টাকার প্রজ্ঞাপন থাকবে কাগজে, আর বাস্তবে চলবে ৫ লাখের ঋণ, ৬ লাখের চাপ।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব সহজ: শ্রমবাজার কি শ্রমিকের জন্য, নাকি সিন্ডিকেটের জন্য? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর না দিলে মালয়েশিয়ার বাজার আবারও পুরোনো ভুলের পুনরাবৃত্তি হতে পারে।
শরিফুল খান প্লাবন
লেখক ও সাংবাদিক