বিশেষজ্ঞ চোখে কর্পোরেট লিডারশিপ ও এইচআর: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বিশেষজ্ঞ চোখে কর্পোরেট লিডারশিপ ও এইচআর: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

শারমিন সুলতানা  avatar   
শারমিন সুলতানা
বিশেষজ্ঞ চোখে কর্পোরেট লিডারশিপ ও এইচআর: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
বিশেষজ্ঞ চোখে কর্পোরেট লিডারশিপ ও এইচআর: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) কর্তৃক প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে উচ্চশিক্ষা সম্পন্নকারীদের মধ্যে কর্মসংস্থানযোগ্য দক্ষতার অভাব নিয়ে উ...

সম্প্রতি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) কর্তৃক প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে উচ্চশিক্ষা সম্পন্নকারীদের মধ্যে কর্মসংস্থানযোগ্য দক্ষতার অভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের কর্পোরেট সেক্টরে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, প্রতিবেদনটি ইঙ্গিত দেয় যে প্রতি বছর হাজার হাজার স্নাতক ডিগ্রিধারী কর্মবাজারে এলেও, তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রয়োজনীয় ‘সফট স্কিল’ এবং ‘টেকনিক্যাল স্কিল’ উভয় ক্ষেত্রেই পিছিয়ে থাকছে, যা নিয়োগকর্তাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই পরিস্থিতি কেবল দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নকেই নয়, বরং সামগ্রিকভাবে কর্পোরেট নেতৃত্ব ও এইচআর ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যৎ গতিপথকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

কর্পোরেট বিশ্বে নেতৃত্ব ও মানবসম্পদ (HR) ব্যবস্থাপনার বিষয়টি বরাবরই জটিল এবং বহুমাত্রিক। প্রচলিত একটি মিথ হলো, নেতৃত্ব সহজাত এবং কিছু মানুষ জন্মগতভাবেই নেতা হন। বাস্তবতা হলো, আধুনিক কর্পোরেট কাঠামোয় নেতৃত্ব একটি শেখার প্রক্রিয়া, যা সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা এবং নিরন্তর আত্ম-উন্নয়নের মাধ্যমে বিকশিত হয়। এইচআর বিভাগগুলো এখন আর কেবল বেতন-ভাতা বা নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; তারা প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে কাজ করছে, যারা কর্মীর দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মপরিবেশের উন্নতি, এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের পাইপলাইন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের দেশের অনেক প্রতিষ্ঠানেই এইচআর বিভাগ এখনো শুধুমাত্র প্রশাসনিক কাজকর্মে সীমাবদ্ধ, যার ফলে কর্মীদের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না এবং নেতৃত্বের গুণাবলী বিকাশে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষত, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে আসা স্নাতকদের মধ্যে শিল্প-প্রাসঙ্গিক দক্ষতার ঘাটতি পূরণে UGC-এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা প্রায়শই পিছিয়ে থাকে। ফলাফলস্বরূপ, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রশিক্ষণে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হয়, যা তাদের উৎপাদনশীলতা এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে ব্যাহত করে। BANBEIS (বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো) এর তথ্য অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও, গুণগত মান এবং শিল্প চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ শিক্ষার অভাব প্রকট।

এই দক্ষতা-ঘাটতি পূরণে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য, যা দীর্ঘকাল ধরে কর্পোরেট নিয়োগকর্তাদের কাছে কম মূল্যায়ন করা হয়েছে। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) তাদের ন্যাশনাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক (NTVQF) এর মাধ্যমে শিল্প-প্রাসঙ্গিক দক্ষতার মান নির্ধারণ এবং সনদ প্রদানে কাজ করছে, যা দেশের জনশক্তিকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সহায়ক। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এর অধীনে পরিচালিত বিভিন্ন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারগুলো থেকে প্রতি বছর যে হাজার হাজার ডিপ্লোমা প্রকৌশলী ও দক্ষ কর্মী তৈরি হচ্ছে, তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে কর্পোরেট এইচআর বিভাগগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করা উচিত। বিশেষ করে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত Skills for Employment Investment Program (SEIP) এর মতো প্রকল্পগুলো শিল্প-ভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে, যেখানে শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয় এবং কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হয়। এই প্রকল্পগুলো প্রমাণ করে যে, সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা সম্ভব, যারা কর্পোরেট জগতের চাহিদা পূরণ করতে পারে। কিন্তু অনেক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান এখনো প্রচলিত ডিগ্রিভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আটকে আছে, যা দেশের দক্ষ জনশক্তির একটি বড় অংশকে মূলধারার কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত করছে। ফলস্বরূপ, তথাকথিত 'অদক্ষ' শ্রমবাজার এবং 'অপ্রাসঙ্গিক' ডিগ্রিধারীদের মধ্যে ব্যবধান আরও বাড়ছে।

আধুনিক কর্পোরেট নেতৃত্ব এখন কেবল নির্দেশ প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি অনুপ্রেরণামূলক, কৌশলগত এবং দূরদর্শী প্রক্রিয়া। শিল্প ৪.০ এর যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা এবং অটোমেশনের মতো প্রযুক্তির দ্রুত প্রসারের সাথে সাথে কর্পোরেট নেতাদের নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে, এইচআর বিভাগগুলোর উচিত কর্মীদের মধ্যে অভিযোজন ক্ষমতা, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, সমস্যা সমাধান এবং উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনার মতো দক্ষতাগুলো বিকাশে বিনিয়োগ করা। নেতৃত্বের গুণাবলী বিকাশে মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম, কোচিং এবং ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। একটি মিথ হলো, "নেতারা জন্ম নেন, তৈরি হন না", কিন্তু বাস্তবে, নেতৃত্ব একটি বিকশিত দক্ষতা যা সঠিক পরিবেশ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের কর্মীদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব চিহ্নিত করতে এবং তাদের বিকাশে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। কর্মসংস্থানযোগ্য দক্ষতা এবং নেতৃত্বের গুণাবলী উন্নয়নে বিনিয়োগ কেবল কর্মীদের ব্যক্তিগত উন্নতি নয়, বরং এটি প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ও সাফল্যের জন্য অপরিহার্য। এই বিনিয়োগ ছাড়া, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমশ প্রতিযোগিতামূলক বৈশ্বিক বাজারে পিছিয়ে পড়বে এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতা হারাবে।

প্রতিষ্ঠান/প্রকল্প কার্যক্রমের ক্ষেত্র বার্ষিক শিক্ষার্থী/প্রশিক্ষণার্থী (২০২৩-২৪, আনুমানিক) শিল্পে সরাসরি কর্মসংস্থান হার (প্রকল্প/কোর্স শেষে, আনুমানিক)
UGC (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন) সাধারণ উচ্চশিক্ষা (স্নাতক) ৪,৯০,০০০+ ৩০-৩৫%
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ডিপ্লোমা ও ভোকেশনাল শিক্ষা ৫,৩০,০০০+ ৫৫-৬৫%
SEIP (Skills for Employment Investment Program) শিল্প-ভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ ১,৬০,০০০+ ৭০-৭৮%
NSDA (জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) NTVQF সনদ প্রদান ও মান নিশ্চিতকরণ ৮৫,০০০+ ৬৫-৭৫%

উৎস: UGC বার্ষিক প্রতিবেদন, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর, SEIP প্রকল্প দলিলাদি, NSDA বার্ষিক প্রতিবেদন ও BANBEIS পরিসংখ্যান (বিভিন্ন বছরের উপাত্তের গড়)।

সুপারিশ

  • UGC-কে অবিলম্বে শিল্প বিশেষজ্ঞদের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পাঠ্যক্রম আধুনিকায়ন করতে হবে। প্রতিটি স্নাতক প্রোগ্রামে বাধ্যতামূলকভাবে ৬ মাসের শিল্প-সংশ্লিষ্ট ইন্টার্নশিপ এবং 'ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিং' ও 'প্রবলেম সলভিং' এর মতো সফট স্কিল অন্তর্ভুক্ত করার জন্য একটি নতুন নীতি প্রণয়ন করা উচিত, যা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন আইন, ১৯৭৩ এর আওতায় বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
  • NSDA এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-কে যৌথভাবে জাতীয় দক্ষতা মান (NTVQF) এর ব্যাপক প্রচার ও কর্পোরেট সেক্টরে এর গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। কর্পোরেট এইচআর বিভাগগুলোকে NTVQF সনদপ্রাপ্ত কর্মীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগের জন্য উৎসাহিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট প্রণোদনা (যেমন: কর ছাড়) ঘোষণা করা যেতে পারে, যা জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১৮ এর অধীনে বাস্তবায়নযোগ্য।
  • SEIP-এর পরবর্তী পর্যায় বা অনুরূপ সরকারি প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের কর্মীদের জন্য ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন (CPD) এবং নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে বিনিয়োগের জন্য আর্থিক সহায়তা এবং নীতিগত সুবিধা প্রদান করতে হবে। বিশেষ করে, মধ্যম সারির ব্যবস্থাপকদের জন্য 'অ্যাজাইল লিডারশিপ' এবং 'ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন' বিষয়ক প্রশিক্ষণে বিনিয়োগের জন্য NBR-এর মাধ্যমে কর রেয়াত বা ম্যাচিং গ্রান্টের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শারমিন সুলতানা

শারমিন সুলতানা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: কর্পোরেট লিডারশিপ ও এইচআর। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nema komentara


News Card Generator