৫জি স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনা: সর্বোচ্চ ব্যবহার ও সেবার মান নিশ্চিতে চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

৫জি স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনা: সর্বোচ্চ ব্যবহার ও সেবার মান নিশ্চিতে চ্যালেঞ্জ

কামরুল হাসান  avatar   
কামরুল হাসান
৫জি স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনা: সর্বোচ্চ ব্যবহার ও সেবার মান নিশ্চিতে চ্যালেঞ্জ
৫জি স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনা: সর্বোচ্চ ব্যবহার ও সেবার মান নিশ্চিতে চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
গত ২০২২ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর ৫জি স্পেকট্রাম নিলামে, যেখানে মোট ৭৬০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম বিক্রির জন্...

গত ২০২২ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর ৫জি স্পেকট্রাম নিলামে, যেখানে মোট ৭৬০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম বিক্রির জন্য উন্মুক্ত ছিল, তার মধ্যে মাত্র ২১০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম বিক্রি হয়। দেশের শীর্ষস্থানীয় মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক এবং রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটক মিলে এই স্পেকট্রাম ক্রয় করে, যা থেকে সরকারের কোষাগারে ১০ হাজার ৬৪৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকা জমা পড়ে। তবে, নিলামে প্রায় ৭২ শতাংশ স্পেকট্রাম অবিক্রীত রয়ে যায়, যা ৫জি প্রযুক্তির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোকেই প্রকট করে তোলে। এই অবিক্রীত স্পেকট্রাম এবং অপারেটরদের সীমিত ৫জি রোলআউটের চিত্র স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, কেবলমাত্র স্পেকট্রাম বরাদ্দই নয়, বরং এর কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা একটি জটিল প্রক্রিয়া, যার জন্য প্রয়োজন একটি সুসংহত কৌশলগত পদক্ষেপ এবং নিরবচ্ছিন্ন নীতি সহায়তা।

৫জি প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো অবকাঠামোগত প্রস্তুতি এবং বিনিয়োগের উচ্চ ব্যয়। ৫জি নেটওয়ার্ক পরিচালনার জন্য বিদ্যমান ৪জি অবকাঠামোর তুলনায় অনেক বেশি ঘনত্বের বেস স্টেশন (স্মল সেল) এবং অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক (ফাইবারাইজেশন) প্রয়োজন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল তো বটেই, এমনকি শহরাঞ্চলেও এই ফাইবারাইজেশনের হার এখনো যথেষ্ট নয়। উপরন্তু, স্পেকট্রামের উচ্চ মূল্য এবং ৫জি-এর জন্য এখনো পর্যন্ত শক্তিশালী ও ব্যাপক ব্যবহারিক ক্ষেত্র (use cases) তৈরি না হওয়ায় অপারেটররা বড় ধরনের বিনিয়োগে দ্বিধাগ্রস্ত। বিটিআরসি কর্তৃক নির্ধারিত স্পেকট্রাম মূল্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় বেশি হওয়ায় অপারেটরদের পক্ষে দ্রুত এবং ব্যাপকভাবে ৫জি সেবা সম্প্রসারণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এর পাশাপাশি, বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং ৫জি বেস স্টেশনের উচ্চ বিদ্যুৎ খরচও একটি বড় উদ্বেগের কারণ। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা না করে কেবল প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের উপর নির্ভর করে ৫জি-এর সুফল ঘরে তোলা সম্ভব নয়।

৫জি স্পেকট্রামের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে একটি শক্তিশালী ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা আবশ্যক। এর জন্য কেবল টেলিকম অপারেটরদের বিনিয়োগই যথেষ্ট নয়, বরং সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) কে একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় ৫জি কৌশল প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে শুধু নেটওয়ার্ক রোলআউট নয়, বরং এর ব্যবহারিক ক্ষেত্রগুলোর উন্নয়ন এবং ডিজিটাল রূপান্তরে এর অবদানকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। উদাহরণস্বরূপ, শিল্প কারখানায় অটোমেশন, স্মার্ট সিটি অ্যাপ্লিকেশন, দূরশিক্ষণ ও টেলিমেডিসিন সেবায় ৫জি-এর ব্যবহারিক প্রয়োগের মডেল তৈরি করা যেতে পারে। বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) তাদের অধীনস্থ হাই-টেক পার্কগুলোতে ৫জি ইনোভেশন হাব প্রতিষ্ঠা করতে পারে, যেখানে স্টার্টআপ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো ৫জি-ভিত্তিক নতুন পণ্য ও সেবা নিয়ে কাজ করতে পারবে। এতে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS)-এর সদস্যরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবে। পাশাপাশি, এটুআই (a2i) প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে সরকারি সেবাসমূহে ৫জি প্রযুক্তির ব্যবহারিক প্রয়োগের সম্ভাবনা যাচাই ও বাস্তবায়ন করা যেতে পারে, যা ৫জি-এর চাহিদা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

ভবিষ্যৎ চাহিদার কথা বিবেচনা করে, ৫জি স্পেকট্রামের পুনঃবিন্যাস এবং বিদ্যমান ২জি/৩জি নেটওয়ার্কের 'সানসেটিং' বা পর্যায়ক্রমিক বন্ধ করার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ২জি এবং ৩জি প্রযুক্তির জন্য বরাদ্দকৃত স্পেকট্রামকে ৪জি এবং ৫জি-এর জন্য পুনরায় ব্যবহার করার মাধ্যমে স্পেকট্রামের অভাব পূরণ করা সম্ভব। তবে, এটি করতে হলে গ্রাহকদের পর্যায়ক্রমে উচ্চতর প্রযুক্তিতে স্থানান্তরিত করার জন্য একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। এছাড়াও, ৫জি-এর জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষুদ্র সেল বা স্মল সেলের স্থাপনা সহজ করতে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। ভবন বা অন্যান্য অবকাঠামোতে স্মল সেল স্থাপনের অনুমতি প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলির সাথে সমন্বয় সাধন করা না গেলে ৫জি-এর ডেনসিফিকেশন সম্ভব নয়। পাশাপাশি, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ ৫জি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংযুক্ত ডিভাইসের সংখ্যা বহুগুণ বাড়বে, যা নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকির সৃষ্টি করবে। এই সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, নীতিগত সহায়তা এবং আন্তঃসংস্থা সমন্বয় অপরিহার্য।

স্পেকট্রাম ব্যান্ড (GHz) মোট উপলব্ধ স্পেকট্রাম (MHz) বিক্রিত স্পেকট্রাম (MHz) অবিক্রীত স্পেকট্রাম (MHz) বিক্রিত স্পেকট্রামের হার (%)
2.3 (2300-2400) 100 90 10 90
2.6 (2500-2690) 190 60 130 31.58
3.5 (3300-3600) 470 60 410 12.77
মোট 760 210 550 27.63

উৎস: বিটিআরসি ৫জি স্পেকট্রাম নিলাম (মার্চ ২০২২)

সুপারিশ

  • বিটিআরসি-কে অবিক্রীত স্পেকট্রামের জন্য একটি নমনীয় মূল্য কাঠামো এবং "ব্যবহার করো অথবা হারাবে" (use-it-or-lose-it) নীতিসহ পুনরায় নিলামের আয়োজন করতে হবে, যেখানে অপারেটরদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী কিস্তি সুবিধা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ন্যূনতম রোলআউট প্রতিশ্রুতির উপর ভিত্তি করে মূল্য ছাড়ের বিধান রাখা যেতে পারে।
  • তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) এবং বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) কে যৌথভাবে একটি 'জাতীয় ৫জি ইনফ্রাস্ট্রাকচার শেয়ারিং নীতিমালা' প্রণয়ন করতে হবে, যা প্যাসিভ ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং স্মল সেল স্থাপনার প্রক্রিয়া সহজ করবে এবং বিএইচটিপিএ পরিচালিত হাই-টেক পার্কগুলোতে ৫জি টেস্টবেড ও ইনোভেশন হাব প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করবে।
  • এটুআই (a2i) এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) কে সমন্বিতভাবে ৫জি-ভিত্তিক স্থানীয় উদ্ভাবনী অ্যাপ্লিকেশন এবং ব্যবহারের ক্ষেত্র (use cases) চিহ্নিতকরণ ও উন্নয়নে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে, পাশাপাশি দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যৌথভাবে ৫জি প্রযুক্তি ও অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্টের উপর বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: কামরুল হাসান

কামরুল হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: টেলিকম, ৫জি ও ইন্টারনেট অবকাঠামো। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

لم يتم العثور على تعليقات


News Card Generator