খাদ্য মূল্যস্ফীতি: সরবরাহ চেইনের দুর্বলতা ও কৃষক-ভোক্তার ন্যায্যমূল্যের লড়াই | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

খাদ্য মূল্যস্ফীতি: সরবরাহ চেইনের দুর্বলতা ও কৃষক-ভোক্তার ন্যায্যমূল্যের লড়াই

ফারহানা ইয়াসমিন  avatar   
ফারহানা ইয়াসমিন
খাদ্য মূল্যস্ফীতি: সরবরাহ চেইনের দুর্বলতা ও কৃষক-ভোক্তার ন্যায্যমূল্যের লড়াই
খাদ্য মূল্যস্ফীতি: সরবরাহ চেইনের দুর্বলতা ও কৃষক-ভোক্তার ন্যায্যমূল্যের লড়াই
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১২.৫৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই ...

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১২.৫৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই পরিস্থিতি দেশের আপামর জনসাধারণের জীবনযাত্রার ব্যয়কে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, এই উল্লম্ফনের মূলে রয়েছে সরবরাহ চেইনের গভীর দুর্বলতা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, যা কৃষক ও চূড়ান্ত ভোক্তার মধ্যে এক বিশাল মূল্য ব্যবধান তৈরি করছে। কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অথচ ভোক্তাদের চড়া দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে, যা অর্থনীতিতে এক ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করেছে। এই ব্যাপক মূল্যস্ফীতি কেবল দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলছে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করছে।

খাদ্য মূল্যস্ফীতির এই ঊর্ধ্বগতির প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো কৃষি পণ্যের সরবরাহ চেইনে বিদ্যমান বহুস্তরীয় মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবস্থা। একজন কৃষক যখন তার উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিয়ে আসেন, তখন তা সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছায় না। বরং, প্রথমে স্থানীয় ফড়িয়া, এরপর আড়তদার, জেলা পর্যায়ের পাইকারি বিক্রেতা, শহর পর্যায়ের পাইকারি বিক্রেতা এবং সবশেষে খুচরা বিক্রেতার হাত ঘুরে সেটি ভোক্তার কাছে পৌঁছায়। এই প্রতিটি স্তরেই পণ্যের উপর অতিরিক্ত মার্জিন যোগ হয়, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়ে চাপে। উদাহরণস্বরূপ, পচনশীল কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে, যেমন শাকসবজি ও ফলমূল, এই মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা আরও প্রকট। অপ্রতুল আধুনিক গুদামজাতকরণ সুবিধা, বিশেষ করে কোল্ড চেইনের অভাব, কৃষকদের দ্রুত পচনশীল পণ্য কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য করে। অনুমান করা হয়, বাংলাদেশে পচনশীল কৃষিপণ্যের প্রায় ২০-৩০ শতাংশ ফসল তোলার পর নষ্ট হয়, যা সরবরাহ চেইনের দুর্বলতার চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত। গ্রামীণ অবকাঠামোর দুর্বলতা এবং পরিবহন ব্যবস্থার অদক্ষতাও পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়িয়ে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তা মূল্যে প্রতিফলিত হয়। এছাড়া, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়, যা খাদ্যপণ্যের দামকে আরও প্রভাবিত করে।

সরবরাহ চেইনের দুর্বলতার পাশাপাশি, বাজারে অসাধু সিন্ডিকেট ও কারসাজিও খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে। দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যদিও বাজার তদারকির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে, কিন্তু তা প্রায়শই পর্যাপ্ত ও কার্যকর বলে প্রমাণিত হয় না। বিশেষ করে, পেঁয়াজ, আলু, ভোজ্যতেল এবং চালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাব সুস্পষ্ট। বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২ এর কার্যকর প্রয়োগের অভাবে এসব সিন্ডিকেট অনায়াসে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এবং পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এর আমদানি শুল্ক ও কর নীতিও খাদ্যপণ্যের মূল্যে পরোক্ষ প্রভাব ফেলে। যখন অপরিহার্য খাদ্যদ্রব্য বা কৃষি উপকরণের (যেমন সার, বীজ, কৃষি যন্ত্রপাতি) উপর উচ্চ আমদানি শুল্ক আরোপ করা হয়, তখন তা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয় অথবা আমদানিকৃত পণ্যের দাম বৃদ্ধি করে, যার ফলে স্থানীয় বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যায়। অন্যদিকে, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এর মাধ্যমে যখন অপরিহার্য খাদ্যদ্রব্য রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়, তখন অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ কমে গিয়ে দাম বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়, যদি না অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে সতর্ক ভারসাম্য বজায় রাখা হয়। এই নীতিগত সমন্বয়হীনতাও অনেক সময় মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করে।

কৃষক এবং ভোক্তা – উভয়ই এই মূল্যস্ফীতির জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, অনেক সময় উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের কৃষি কাজ চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহকে হ্রাস করছে। এর দীর্ঘমেয়াদী ফলস্বরূপ, কৃষিজমিতে বিনিয়োগ কমে যায় এবং উৎপাদন ব্যাহত হয়, যা ভবিষ্যতের খাদ্য সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। অন্যদিকে, ভোক্তারা, বিশেষ করে শহুরে দরিদ্র এবং নিম্ন আয়ের মানুষ, খাদ্যপণ্যের চড়া দামের কারণে তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছেন। তাদের আয়ের একটি বড় অংশ খাদ্যের পেছনে ব্যয় হওয়ায় অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় করার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং দক্ষ সরবরাহ চেইন তৈরির জন্য দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ অপরিহার্য। এখানে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে। BSEC পুঁজিবাজারের মাধ্যমে কৃষি-ভিত্তিক শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট, আধুনিক গুদামজাতকরণ সুবিধা এবং কোল্ড চেইন লজিস্টিকস খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়তা করতে পারে। পুঁজিবাজার থেকে তহবিল সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হলে এই গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন সম্ভব হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ চেইনকে শক্তিশালী করবে, অপচয় কমাবে এবং মূল্য স্থিতিশীলতায় অবদান রাখবে। এই ধরনের বিনিয়োগ খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে একটি টেকসই সমাধান এনে দিতে পারে, যা কৃষক ও ভোক্তা উভয়কেই উপকৃত করবে।

পণ্য কৃষকের বিক্রয়মূল্য (টাকা/কেজি, আনুমানিক) খুচরা ভোক্তার ক্রয়মূল্য (টাকা/কেজি, আনুমানিক) মূল্য পার্থক্য (%)
আলু ২০ ৫০ ১৫০%
পেঁয়াজ ৪০ ৯০ ১২৫%
টমেটো ৩০ ৮০ ১৬৭%
বেগুন ২৫ ৬৫ ১৬০%

উৎস: সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর বিভিন্ন গবেষণা ও বাজার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন, ২০২৩-২৪ (আনুমানিক চিত্র)।

সুপারিশ

  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনকে প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২ এর অধীনে বাজার তদারকি এবং অসাধু সিন্ডিকেট দমনে কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যাতে কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা যায় এবং বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হয়।
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কে কৃষিপণ্যের উৎপাদন উপকরণ (যেমন সার, বীজ), কোল্ড চেইন সরঞ্জাম এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের কাঁচামালের উপর আরোপিত আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট যৌক্তিকীকরণ করতে হবে, যাতে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পায় এবং সরবরাহ চেইন আরও সাশ্রয়ী হয়।
  • বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কে কৃষি-ভিত্তিক শিল্প, আধুনিক গুদামজাতকরণ এবং লজিস্টিকস খাতে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য পুঁজিবাজারের মাধ্যমে বিশেষ তহবিল বা বন্ডের প্রচলনকে উৎসাহিত করতে হবে, যা সরবরাহ চেইনের অবকাঠামোগত উন্নয়নে সহায়ক হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ফারহানা ইয়াসমিন

ফারহানা ইয়াসমিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: সামষ্টিক অর্থনীতি ও ইনফ্লেশন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nema komentara


News Card Generator