বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯.৪৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা অক্টোবরের ৯.৯৩ শতাংশ থেকে সামান্য কম হলেও খাদ্য মূল্যস্ফীতি তখনও ১০.৭৬ শতাংশের উদ্বেগজনক স্তরে অবস্থান করছে। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ওপর চেপে বসা অর্থনৈতিক চাপের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। একদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা – এই দুইয়ের সমন্বয়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এক জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই ধারাবাহিক উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জনজীবনের ওপর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ এবং যার থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ।
মূল্যস্ফীতির এই ধারাবাহিক উচ্চ প্রবণতার পেছনে কেবল আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও পণ্যের মূল্য বৃদ্ধিকেই দায়ী করা যায় না। দেশের অভ্যন্তরে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় মূল্যের ক্রমাগত অবমূল্যায়ন, যা আমদানি ব্যয়কে সরাসরি বৃদ্ধি করছে, তা একটি বড় কারণ। গত এক বছরে টাকার মান প্রায় ১৫-২০ শতাংশ কমেছে, যার ফলস্বরূপ আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রায় প্রতিটি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যক্ষ করছে। এই অবমূল্যায়ন মূলত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং ডলারের সরবরাহ ঘাটতির কারণে ঘটেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, যদিও কিছু খাতে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির হার তার চেয়েও বেশি হওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে রয়ে গেছে, যা ডলারের ওপর চাপ বজায় রাখছে। অন্যদিকে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কর্তৃক আদায়কৃত রাজস্বের বড় অংশ আসে আমদানি শুল্ক থেকে, যা টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আরও বেশি আদায় হলেও তা সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে উস্কে দিচ্ছে।
মনিটারি পলিসি বা মুদ্রানীতির কার্যকারিতাও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে একাধিকবার নীতি সুদহার বৃদ্ধি করলেও এর প্রভাব সীমিত। এর কারণ হলো, দেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণের সুদের হার এখনও একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আবদ্ধ, যা বাজারের প্রকৃত চাহিদা ও সরবরাহের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে নীতি সুদহার বাড়লেও ব্যাংকগুলো সেই অনুযায়ী ঋণের সুদহার বাড়াতে পারে না, যা অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) সহ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারবার বাজারভিত্তিক সুদহার প্রবর্তনের ওপর জোর দিলেও এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এছাড়াও, বাজারে সিন্ডিকেট ও কারসাজি একটি বড় সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও এর অধীনস্থ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করলেও, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে টেকসই প্রভাব ফেলতে পারছে না। এই সিন্ডিকেটগুলো পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বা অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আশায় মূল্য বৃদ্ধি করে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক গৃহীত নীতিগুলি যদিও পুঁজি বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষায় সচেষ্ট, তবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা হ্রাস করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ প্রবাহ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
| মাস ও বছর | সার্বিক মূল্যস্ফীতি (শতাংশ) | খাদ্য মূল্যস্ফীতি (শতাংশ) | খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি (শতাংশ) |
|---|---|---|---|
| জানুয়ারি ২০২৩ | ৯.৫৩ | ৯.৫৮ | ৯.৪৩ |
| ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ৮.৭৮ | ৭.৯৪ | ৯.৯৮ |
| মার্চ ২০২৩ | ৯.২৪ | ৮.৯১ | ৯.৭২ |
| এপ্রিল ২০২৩ | ৯.২৪ | ৮.৮৪ | ৯.৮২ |
| মে ২০২৩ | ৯.৯৪ | ৯.২৪ | ১০.৪৭ |
| জুন ২০২৩ | ৯.৭৪ | ৯.৭৩ | ৯.৭৬ |
| জুলাই ২০২৩ | ৯.৬৯ | ৯.৪৭ | ৯.৯৬ |
| আগস্ট ২০২৩ | ৯.৯২ | ১২.৫৬ | ৭.৯১ |
| সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ৯.৬৩ | ১২.৩৭ | ৭.৮৫ |
| অক্টোবর ২০২৩ | ৯.৯৩ | ১২.৫০ | ৭.৯২ |
| নভেম্বর ২০২৩ | ৯.৪৯ | ১০.৭৬ | ৮.১৪ |
উৎস: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)
সুপারিশ
- বাংলাদেশ ব্যাংককে অবশ্যই মুদ্রানীতির কার্যকারিতা বাড়াতে একটি পূর্ণাঙ্গ বাজারভিত্তিক সুদহার ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে, যেখানে ঋণের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সুদহারের সীমা তুলে দিয়ে ব্যাংকগুলোকে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী সুদহার নির্ধারণের স্বাধীনতা দেওয়া হবে, যা অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
- বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে প্রতিযোগিতা কমিশন (Competition Commission) এর সাথে সমন্বয় করে প্রতিযোগিতা আইন ২০১২ (Competition Act 2012) এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি এবং সিন্ডিকেটভিত্তিক মূল্য কারসাজি প্রতিরোধ করা যায় এবং ভোক্তাদের অধিকার সুরক্ষিত থাকে।
- জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কে করের আওতা বৃদ্ধি এবং কর আদায় প্রক্রিয়াকে ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে আরও দক্ষ করতে হবে, যাতে পরোক্ষ করের উপর নির্ভরতা কমে এবং প্রত্যক্ষ করের মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধি পায়, পাশাপাশি রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) কে নতুন বাজার অন্বেষণ এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় করে সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেমন CPD কর্তৃক প্রস্তাবিত রপ্তানি প্রণোদনা প্যাকেজগুলির সময়োপযোগী বাস্তবায়ন।