অপ্রকাশিত সত্য: মেধা স্বত্ব, কপিরাইট ও পেটেন্ট আইন নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অপ্রকাশিত সত্য: মেধা স্বত্ব, কপিরাইট ও পেটেন্ট আইন নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

ব্যারিস্টার নাদিয়া  avatar   
ব্যারিস্টার নাদিয়া
অপ্রকাশিত সত্য: মেধা স্বত্ব, কপিরাইট ও পেটেন্ট আইন নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
অপ্রকাশিত সত্য: মেধা স্বত্ব, কপিরাইট ও পেটেন্ট আইন নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশন (WIPO) এর এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে মেধা স্বত্ব, কপিরাইট ও পেটেন্ট নিবন্ধনের হার...

সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশন (WIPO) এর এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে মেধা স্বত্ব, কপিরাইট ও পেটেন্ট নিবন্ধনের হার আশানুরূপভাবে বৃদ্ধি পেলেও এর প্রয়োগ ও সুরক্ষা ব্যবস্থায় এখনো বহুলাংশে ঘাটতি রয়ে গেছে। বিশেষত, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সৃষ্টিকর্মের কপিরাইট লঙ্ঘন এবং স্থানীয় উদ্ভাবকদের পেটেন্টকৃত প্রযুক্তির অনুলিপি রোধে বিদ্যমান আইনি কাঠামো ও প্রশাসনিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাগুলো প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২১ সালে বাংলাদেশ পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (DPDT)-এ দেশীয় উদ্ভাবকদের পেটেন্ট আবেদনের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৫০টি, যা একই সময়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এই পরিস্থিতি কেবল উদ্ভাবকদের নিরুৎসাহিত করছে না, বরং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথেও একটি অদৃশ্য বাধা তৈরি করছে। দুর্বল মেধা স্বত্ব সুরক্ষার কারণে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং স্থানীয় শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে, যা বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে।

বাংলাদেশের মেধা স্বত্ব সুরক্ষার আইনি কাঠামো মূলত তিনটি প্রধান স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে: কপিরাইট আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০১০), পেটেন্ট আইন ১৯১১ (যা নতুন পেটেন্ট আইন ২০২২ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হতে যাচ্ছে) এবং ট্রেডমার্ক আইন ২০০৯। যদিও এই আইনগুলি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করার চেষ্টা করা হয়েছে, তবে এদের কার্যকর প্রয়োগে অনেক চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। কপিরাইট আইন, বিশেষ করে ডিজিটাল যুগে সৃষ্ট সংগীত, সাহিত্যকর্ম, সফটওয়্যার এবং অনলাইন কনটেন্টের সুরক্ষায় যথেষ্ট নমনীয়তা ও দ্রুত পদক্ষেপের অভাব দেখা যায়। সাইবার নিরাপত্তা আইনের অধীনে কিছু বিধান থাকলেও, কপিরাইট লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ এবং দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার জন্য বিশেষায়িত ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। অন্যদিকে, পেটেন্ট আইন ১৯১১ ছিল বহু পুরোনো এবং আধুনিক প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সাথে তাল মেলাতে অক্ষম। নতুন পেটেন্ট আইন ২০২২ পাশ হলেও, এর বিধিমালা প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়ন এখনও প্রক্রিয়াধীন, যা স্থানীয় উদ্ভাবকদের দ্রুত তাদের উদ্ভাবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাধা দিচ্ছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে DPDT এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে কপিরাইট অফিস এই আইনগুলি প্রয়োগের দায়িত্বে থাকলেও, জনবল, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং আর্থিক বরাদ্দ উভয় ক্ষেত্রেই তাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

মেধা স্বত্ব আইনের দুর্বল প্রয়োগের একটি অন্যতম কারণ হলো আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা এবং বিচারিক দুর্বলতা। বাংলাদেশে মেধা স্বত্ব লঙ্ঘনের মামলা নিষ্পত্তির হার অত্যন্ত কম এবং গড় সময়কাল কয়েক বছর ছাড়িয়ে যায়, যা বাদী ও বিবাদী উভয়কেই হতাশ করে। বিশেষায়িত আদালত বা বিচারকের অনুপস্থিতি এই দীর্ঘসূত্রিতার প্রধান কারণ। সাধারণ আদালতে অন্যান্য দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার ভিড়ে মেধা স্বত্ব সংক্রান্ত জটিল বিষয়গুলি প্রায়শই সঠিক গুরুত্ব পায় না। এর পাশাপাশি, মেধা স্বত্ব বিষয়ে পুলিশ ও বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের অভাবও একটি বড় সমস্যা। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও এডিবি তাদের 'ডুয়িং বিজনেস' প্রতিবেদনে একাধিকবার বাংলাদেশের আইনি প্রয়োগ ব্যবস্থার দুর্বলতা তুলে ধরেছে, যা বিনিয়োগ পরিবেশকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা প্রায়শই তাদের প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন, যার ফলে তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগে দ্বিধাগ্রস্ত হন। স্থানীয় উদ্ভাবকদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়; তাদের উদ্ভাবন সুরক্ষিত না থাকায় কপি হওয়ার ভয় থাকে, যা নতুন গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগের আগ্রহ কমিয়ে দেয়। ফলস্বরূপ, সৃজনশীল অর্থনীতি এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, যা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে বাধা সৃষ্টি করে।

এই দুর্বলতাগুলোর সরাসরি অর্থনৈতিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী। দুর্বল মেধা স্বত্ব সুরক্ষা দেশে নকল ও পাইরেসির বাজারকে উৎসাহিত করে, যা বৈধ পণ্যের বাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং সরকারের রাজস্ব আয় কমায়। উদাহরণস্বরূপ, সফটওয়্যার পাইরেসির কারণে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারায় সরকার এবং স্থানীয় সফটওয়্যার শিল্প ক্ষতির সম্মুখীন হয়। একইসাথে, শিল্প খাত, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ (SMEs) যারা নতুন পণ্য বা প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করে, তারা তাদের মেধা স্বত্ব সুরক্ষিত রাখতে না পারায় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান বা আন্তর্জাতিক কর্পোরেশনগুলির সাথে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। বাংলাদেশের জিডিপিতে সৃজনশীল অর্থনীতির অবদান বৃদ্ধির বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও, মেধা স্বত্বের দুর্বলতার কারণে তা পূর্ণ বিকশিত হতে পারছে না। বাংলাদেশ সরকার যখন 'স্মার্ট বাংলাদেশ' গড়ার স্বপ্ন দেখছে, যেখানে জ্ঞান, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে অর্থনীতি পরিচালিত হবে, তখন মেধা স্বত্ব সুরক্ষার এই দুর্বলতাগুলি সেই স্বপ্ন পূরণের পথে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। শক্তিশালী মেধা স্বত্ব ব্যবস্থা উদ্ভাবকদের উৎসাহিত করে, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দেশের অবস্থানকে সুসংহত করে, যা টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।

মেধা স্বত্ব ক্ষেত্র ২০২২ সালে নিবন্ধিত ২০২৩ সালে নিবন্ধিত ২০২৪ সালের প্রক্ষেপণ বৃদ্ধির হার (২০২২-২৪)
পেটেন্ট (দেশীয় উদ্ভাবক) ৩৫০ ৪১০ ৫০০ ৪২.৮৬%
ডিজাইন ৫০০ ৫৫০ ৬০০ ২০.০০%
ট্রেডমার্ক ৮,০০০ ৮,৮০০ ৯,৫০০ ১৮.৭৫%
কপিরাইট (সফটওয়্যার) ২৫০ ৩০০ ৩৫০ ৪০.০০%
কপিরাইট (সংগীত) ৭০০ ৭৫০ ৮০০ ১৪.২৯%
কপিরাইট (সাহিত্য) ১,২০০ ১,৩০০ ১,৪০০ ১৬.৬৭%

উৎস: পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (DPDT), কপিরাইট অফিস, বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়-এর বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত আনুমানিক তথ্য।

সুপারিশ

  • আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে দ্রুত নতুন পেটেন্ট আইন ২০২২ এর বিধিমালা প্রণয়ন ও চূড়ান্ত বাস্তবায়ন করতে হবে এবং মেধা স্বত্ব সংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিদ্যমান বিচারিক ব্যবস্থায় বিশেষায়িত আইপি বেঞ্চ বা ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে, যা বিচারকদের মেধা স্বত্ব আইনে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেবে।
  • শিল্প মন্ত্রণালয় (DPDT) এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় (কপিরাইট অফিস) কে তাদের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো আধুনিকীকরণ এবং জনবল বৃদ্ধি করতে হবে। একই সাথে, World Bank এবং ADB এর সহায়তায় স্থানীয় উদ্ভাবক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (SMEs) এবং সৃজনশীল পেশাজীবীদের জন্য মেধা স্বত্ব নিবন্ধন ও সুরক্ষার গুরুত্ব নিয়ে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক ও প্রশিক্ষণমূলক কর্মসূচি চালু করতে হবে।
  • বাংলাদেশ সরকার কে জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত মেধা স্বত্ব কৌশল প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে মেধা স্বত্ব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনে মেধা স্বত্বের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা প্রদান করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ব্যারিস্টার নাদিয়া

ব্যারিস্টার নাদিয়া 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মেধা স্বত্ব, কপিরাইট ও পেটেন্ট আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

कोई टिप्पणी नहीं मिली


News Card Generator