আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের হেলথ-টেক ও টেলিমেডিসিন: তুলনামূলক বিশ্লেষণ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের হেলথ-টেক ও টেলিমেডিসিন: তুলনামূলক বিশ্লেষণ

ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা  avatar   
ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা
আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের হেলথ-টেক ও টেলিমেডিসিন: তুলনামূলক বিশ্লেষণ
আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের হেলথ-টেক ও টেলিমেডিসিন: তুলনামূলক বিশ্লেষণ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত 'বাংলাদেশ ডিজিটাল স্বাস্থ্য রূপরেখা ২০২৪' শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের হেলথ-টেক ও টেলিমেডিসিন খাতের অভূতপূর্ব অগ্রগতির প...

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত 'বাংলাদেশ ডিজিটাল স্বাস্থ্য রূপরেখা ২০২৪' শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের হেলথ-টেক ও টেলিমেডিসিন খাতের অভূতপূর্ব অগ্রগতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এই প্রতিবেদনটি এমন এক সময়ে প্রকাশিত হলো, যখন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের জন্য একাধিক পাইলট প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বিশেষ করে, ২০২২ সাল থেকে শুরু হওয়া 'গ্রামীণ ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা পাইলট প্রকল্প' বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় দেশের ৩০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে টেলিমেডিসিন ইউনিট স্থাপন করে প্রায় ৫ লক্ষাধিক মানুষকে সরাসরি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছে। এটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের ডিজিটাল রূপান্তরের একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। এই প্রেক্ষাপটে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের হেলথ-টেক ও টেলিমেডিসিনের বর্তমান অবস্থান, তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা অত্যাবশ্যক।

বাংলাদেশের হেলথ-টেক খাত মূলত টেলিমেডিসিন, ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ডস (EHR), মোবাইল স্বাস্থ্য (mHealth) এবং সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT) ভিত্তিক সমাধানগুলির উপর জোর দিচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে, ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে সরকারি হাসপাতালগুলোতে টেলিমেডিসিন সেবা চালু হলেও, এর ব্যাপকতা এবং গুণগত মান বৃদ্ধি পেয়েছে গত পাঁচ বছরে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারী চলাকালীন সময়ে, যখন ব্যক্তিগত উপস্থিতিতে চিকিৎসা গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়েছিল, তখন টেলিমেডিসিন সেবা এক অপরিহার্য মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত হেলথলাইন ১৬২৬৩ এবং বিভিন্ন বেসরকারি প্ল্যাটফর্মগুলি তখন লক্ষ লক্ষ মানুষকে ঘরে বসেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে সহায়তা করেছে। এই সময়কালে, বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে, যার ফলস্বরূপ গ্রামীণ অঞ্চলেও ইন্টারনেট penetration বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অগ্রগতি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় বেশ দ্রুতগতিতে হয়েছে, যেখানে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার প্রসারে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অবকাঠামোগত ঘাটতি এখনও বড় বাধা। বাংলাদেশের ই-হেলথ স্ট্র্যাটেজি ২০১২-২০১৭ এবং এর পরবর্তী আপডেটগুলোতে ইলেকট্রনিক মেডিকেল রেকর্ড (EMR) এবং স্বাস্থ্য তথ্য বিনিময় প্ল্যাটফর্ম তৈরির উপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা স্বাস্থ্যসেবার মান, দক্ষতা এবং রোগীর নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। তবে, ইএমআর সিস্টেমের আন্তঃপরিচালনা (interoperability) এবং ডাটা সুরক্ষার মানদণ্ড আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছাতে আরও কাজ করা প্রয়োজন।

তবে, এই অগ্রগতির পাশাপাশি কিছু গুরুতর চ্যালেঞ্জও রয়েছে যা আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের হেলথ-টেক ও টেলিমেডিসিনের পূর্ণ সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে। প্রথমত, স্বাস্থ্যকর্মী এবং রোগীদের মধ্যে ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব এখনও একটি বড় সমস্যা, বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। অনেক চিকিৎসক এবং নার্স অত্যাধুনিক হেলথ-টেক প্ল্যাটফর্মগুলি ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য নন, এবং রোগীরাও এর সুবিধা সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন। দ্বিতীয়ত, টেলিমেডিসিন এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার জন্য একটি সুসংহত ও আধুনিক আইনি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অনুপস্থিতি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। যদিও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC) টেলিমেডিসিন প্র্যাকটিস গাইডলাইনস তৈরি করেছে, এটি এখনও একটি পূর্ণাঙ্গ আইন বা নীতিতে রূপান্তরিত হয়নি যা ডাটা গোপনীয়তা, চিকিৎসকের দায়বদ্ধতা এবং ক্রস-বর্ডার টেলিমেডিসিন সেবার মতো বিষয়গুলিকে সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করে। তৃতীয়ত, সাইবার নিরাপত্তা এবং রোগীর তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বব্যাপী সাইবার হামলার ঝুঁকি বাড়ার সাথে সাথে, বাংলাদেশের হেলথ-টেক প্ল্যাটফর্মগুলিকে আন্তর্জাতিক মানের সাইবার নিরাপত্তা প্রোটোকল এবং ডাটা এনক্রিপশন পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) তাদের 'বাংলাদেশ স্বাস্থ্য খাত উন্নয়ন কর্মসূচি'-তে সাইবার নিরাপত্তা এবং ডাটা সুরক্ষাকে একটি মূল উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যা প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিও এই বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করছে। চতুর্থত, স্থানীয় উদ্ভাবন এবং গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) বিনিয়োগের অভাব রয়েছে। যদিও কিছু স্টার্টআপ হেলথ-টেক সমাধান নিয়ে কাজ করছে, তাদের আন্তর্জাতিক মানের পণ্য তৈরি এবং বিশ্ববাজারে প্রবেশ করার জন্য পর্যাপ্ত তহবিল, মেন্টরশিপ এবং গবেষণা সহায়তার অভাব রয়েছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে না পারলে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের হেলথ-টেক ও টেলিমেডিসিন খাত তার পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জন করতে পারবে না।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের হেলথ-টেক ও টেলিমেডিসিনের তুলনামূলক অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারত, সিঙ্গাপুর এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলি ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা খাতে অনেক এগিয়ে আছে। তারা শুধু অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারেই এগিয়ে নেই, বরং তাদের রয়েছে সুসংহত নীতি, ব্যাপক ডাটা সুরক্ষা আইন এবং শক্তিশালী R&D ইকোসিস্টেম। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের 'আয়ুষ্মান ভারত ডিজিটাল মিশন' এবং 'জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্য মিশন' দেশটির স্বাস্থ্যসেবাকে ডিজিটালাইজ করার ক্ষেত্রে একটি মডেল হিসেবে কাজ করছে, যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য আইডি তৈরি করা হচ্ছে। সিঙ্গাপুর তাদের 'Smart Nation' উদ্যোগের আওতায় এআই-ভিত্তিক রোগ নির্ণয়, রোবোটিক সার্জারি এবং ব্যক্তিগতকৃত স্বাস্থ্যসেবায় ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। এই দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের মূল শক্তি হলো তার বিশাল জনসংখ্যা এবং ডিজিটাল রূপান্তরের প্রতি সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার। বিশ্বব্যাংক এবং ADB-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির সাথে অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের জন্য জ্ঞান বিনিময়, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং আর্থিক সহায়তা লাভের একটি বড় সুযোগ। বিশেষ করে, বিশ্বব্যাংকের 'বাংলাদেশ হেলথ সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট' এবং ADB-এর 'দুর্বল জনগোষ্ঠী স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রকল্প' ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই প্রকল্পগুলির মাধ্যমে অর্জিত অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ তার নিজস্ব মডেল তৈরি করতে পারে, যা অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও অনুপ্রেরণামূলক হতে পারে। বাংলাদেশের হেলথ-টেক স্টার্টআপগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে, যদি তারা আন্তর্জাতিক মানের পণ্য ও সেবা নিশ্চিত করতে পারে এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোগুলোকে আধুনিকায়ন করা হয়। এক্ষেত্রে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং আফ্রিকার দেশগুলোতে বাংলাদেশের টেলিমেডিসিন মডেল রপ্তানির একটি বড় সুযোগ রয়েছে, যেখানে স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

সূচক ২০১৮ ২০২০ ২০২২ ২০২৪ (প্রক্ষেপিত)
টেলিমেডিসিন ব্যবহারকারী বৃদ্ধি (লক্ষ) ১২ ৮৫ ১৪০ ১৮০
স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল রেকর্ড ব্যবহার (%) ১০% ২৫% ৪৫% ৬০%
বিশ্বব্যাংক/ADB ডিজিটাল স্বাস্থ্য বিনিয়োগ (মিলিয়ন USD) ২০ ৫০ ১২০ ১৫০
গ্রামীণ অঞ্চলে ইন্টারনেট কভারেজ (%) ৪০% ৬৫% ৮০% ৯২%
স্বাস্থ্য পেশাদারদের ডিজিটাল সাক্ষরতা প্রশিক্ষণ (%) ৫% ১৫% ৩৫% ৫৫%

উৎস: বিশ্বব্যাংক ডিজিটাল স্বাস্থ্য রূপরেখা ২০২৪, ADB স্বাস্থ্য খাত পর্যালোচনা ২০২৩ এবং বাংলাদেশ সরকার ই-হেলথ রিপোর্ট।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে দ্রুত 'ডিজিটাল স্বাস্থ্য আইন ও নীতিমালা' প্রণয়ন করতে হবে, যা টেলিমেডিসিন প্র্যাকটিসের লাইসেন্সিং, রোগীর ডাটা সুরক্ষা (GDPR-এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ), চিকিৎসকের দায়বদ্ধতা এবং ক্রস-বর্ডার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও আধুনিক আইনি কাঠামো নিশ্চিত করবে।
  • বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে বিশ্বব্যাংকের 'ডিজিটাল বাংলাদেশ এনাবলমেন্ট প্রজেক্ট'-এর আওতায় গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেট অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ডিজিটাল সাক্ষরতা ও হেলথ-টেক প্রশিক্ষণের জন্য একটি জাতীয় কর্মসূচি হাতে নিতে হবে; এর সাথে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটি ডেডিকেটেড ডিজিটাল স্বাস্থ্য সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে।
  • ADB-এর 'স্বাস্থ্যখাত উন্নয়ন ঋণ প্রকল্প'-এর অধীনে একটি 'হেলথ-টেক ইনোভেশন ফান্ড' প্রতিষ্ঠা করে স্থানীয় স্টার্টআপ এবং গবেষকদের ডিজিটাল স্বাস্থ্য সমাধান উন্নয়নে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে জ্ঞান বিনিময়ের জন্য নিয়মিত ওয়ার্কশপ ও সেমিনারের আয়োজন করতে হবে, যা নতুন প্রযুক্তির দ্রুত গ্রহণ ও রপ্তানি সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা

ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: হেলথ-টেক ও টেলিমেডিসিন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Hiçbir yorum bulunamadı


News Card Generator