ই-স্পোর্টস অর্থায়ন: খেলোয়াড়দের টিকে থাকার লড়াই ও স্পনসরশিপের সংকট | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ই-স্পোর্টস অর্থায়ন: খেলোয়াড়দের টিকে থাকার লড়াই ও স্পনসরশিপের সংকট

তানজিম আহমেদ  avatar   
তানজিম আহমেদ
ই-স্পোর্টস অর্থায়ন: খেলোয়াড়দের টিকে থাকার লড়াই ও স্পনসরশিপের সংকট
ই-স্পোর্টস অর্থায়ন: খেলোয়াড়দের টিকে থাকার লড়াই ও স্পনসরশিপের সংকট
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি বাংলাদেশ ই-স্পোর্টস ফেডারেশন (বিইএফ) আয়োজিত 'জাতীয় ই-স্পোর্টস চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৩'-এর ফাইনাল ম্যাচটি দর্শক ও অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা...

সম্প্রতি বাংলাদেশ ই-স্পোর্টস ফেডারেশন (বিইএফ) আয়োজিত 'জাতীয় ই-স্পোর্টস চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৩'-এর ফাইনাল ম্যাচটি দর্শক ও অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা জাগালেও, টুর্নামেন্টের সীমিত পুরস্কার অর্থ এবং স্পনসরশিপের অভাব আবারও দেশের ই-স্পোর্টস খাতের ভঙ্গুর আর্থিক কাঠামোর দিকে আলোকপাত করেছে। মাত্র কয়েক লক্ষ টাকার পুরস্কার পুল নিয়ে আয়োজিত এই টুর্নামেন্ট, যেখানে শত শত প্রতিভাবান খেলোয়াড় অংশগ্রহণ করেন, তা বিশ্বব্যাপী বিলিয়ন ডলারের ই-স্পোর্টস বাজারের তুলনায় নিতান্তই নগণ্য। এই সংকট কেবল খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত টিকে থাকার লড়াইকেই কঠিন করছে না, বরং একটি উদীয়মান ডিজিটাল ক্রীড়া শিল্পের সম্ভাবনাকেও সীমিত করে ফেলছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যেখানে ই-স্পোর্টস খেলোয়াড়রা মিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করছেন এবং পেশাদার লিগে অংশ নিচ্ছেন, সেখানে বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রতিভাবান খেলোয়াড় পরিবার বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে টিকে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত। এটি দেশের ই-স্পোর্টস ইকোসিস্টেমের মৌলিক দুর্বলতাগুলোকেই উন্মোচন করে, যা একটি টেকসই ভবিষ্যৎ গঠনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের ই-স্পোর্টস খেলোয়াড়দের টিকে থাকার লড়াই মূলত আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং পৃষ্ঠপোষকতার অভাবকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। একজন পেশাদার ই-স্পোর্টস খেলোয়াড়ের জন্য উন্নত গেমিং পিসি, হাই-স্পিড ইন্টারনেট সংযোগ, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং পুষ্টিকর খাদ্যের ব্যবস্থা করা অত্যাবশ্যক। কিন্তু অধিকাংশ খেলোয়াড়ই এই মৌলিক সুবিধাগুলো থেকে বঞ্চিত হন। জাতীয় পর্যায়ের টুর্নামেন্টগুলোতে প্রাপ্ত পুরস্কার অর্থ এতটাই কম যে তা খেলোয়াড়দের বছরের পর বছর ধরে করা কঠোর পরিশ্রমের ন্যূনতম স্বীকৃতি দিতেও ব্যর্থ। উদাহরণস্বরূপ, একটি শীর্ষস্থানীয় দলের একজন খেলোয়াড় মাসিক ৫০০-১০০০ ডলার আয় করার স্বপ্ন দেখতে পারেন, যেখানে দক্ষিণ কোরিয়া বা ইউরোপের একজন গড়পড়তা পেশাদার খেলোয়াড় মাসে কমপক্ষে ৫,০০০-১০,০০০ ডলার আয় করেন। এই বিশাল ব্যবধান খেলোয়াড়দের মধ্যে হতাশা তৈরি করে এবং অনেকেই বাধ্য হন ই-স্পোর্টস ছেড়ে প্রচলিত পেশায় চলে যেতে। ফলে, দেশে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের একটি বড় অংশ তাদের সম্ভাবনাকে পূর্ণতা দিতে পারছেন না, যা দেশের ই-স্পোর্টসকে আন্তর্জাতিক মান থেকে অনেক পিছিয়ে রাখছে। কর্পোরেট বিনিয়োগের অভাবে খেলোয়াড়দের জন্য স্বাস্থ্য বীমা, অবসর ভাতা, বা মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার মতো পেশাদার খেলার আবশ্যিক দিকগুলোও অনুপস্থিত, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদী ক্যারিয়ারের পথকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে।

ই-স্পোর্টস খাতে স্পনসরশিপের সংকট কেবল খেলোয়াড়দের আয়ের ওপরই প্রভাব ফেলছে না, এটি পুরো ইকোসিস্টেমের বৃদ্ধিকেও বাধাগ্রস্ত করছে। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ই-স্পোর্টসে বিনিয়োগ করতে দ্বিধা বোধ করে, কারণ তারা এই খাতকে এখনো একটি সুসংগঠিত এবং লাভজনক বাজার হিসেবে দেখতে পারছে না। ব্র্যান্ডিং এবং মার্কেটিং এর জন্য প্রয়োজনীয় রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট (ROI) পরিমাপের স্পষ্ট কোনো কাঠামো নেই। প্রচলিত ক্রীড়াগুলোর মতো ই-স্পোর্টসের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট জাতীয় নীতি বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা না থাকায়, স্পনসররা আইনি জটিলতা বা বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয়ে থাকে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, ই-স্পোর্টসকে এখনো মূলত 'শুধুই খেলা' হিসেবে দেখা হয়, যেখানে এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করা হয়। ফলে, টেলিকম সংস্থা, পানীয় প্রস্তুতকারক, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বা ফ্যাশন ব্র্যান্ডের মতো সম্ভাব্য বড় স্পনসররা এই খাতে আসতে আগ্রহী হচ্ছে না। এই স্পনসরশিপের অভাব টুর্নামেন্টের আয়োজন, অনলাইন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের উন্নয়ন, এবং স্থানীয় গেমিং কন্টেন্ট তৈরিতে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। World Bank-এর ডিজিটাল ইকোনমি বিষয়ক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ডিজিটাল খাতের অপার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ থাকলেও, ই-স্পোর্টসকে একটি স্বতন্ত্র উপ-খাত হিসেবে চিহ্নিত করে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব রয়েছে, যা এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

এই স্পনসরশিপ সংকটের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সুদূরপ্রসারী। যখন দেশের ভেতরের খেলোয়াড়রা পর্যাপ্ত সুযোগ ও আর্থিক নিরাপত্তা পান না, তখন তারা বিদেশের লিগ বা দলের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হন। এটি এক প্রকার 'ব্রেন ড্রেন' তৈরি করে, যেখানে দেশের সেরা প্রতিভাগুলো বিদেশি ই-স্পোর্টস ইকোসিস্টেমকে সমৃদ্ধ করে। স্থানীয় ই-স্পোর্টস দলগুলো পর্যাপ্ত তহবিল না পাওয়ায়, তারা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নিতে পারে না, যার ফলে দেশের প্রতিনিধিত্ব কমে যায় এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পরিচিতি গড়ে ওঠে না। এছাড়া, ই-স্পোর্টস শুধু খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত নয়; এর সাথে জড়িত রয়েছে গেম ডেভেলপার, টুর্নামেন্ট আয়োজক, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, কোচ, বিশ্লেষক এবং প্রযুক্তিবিদরা। স্পনসরশিপের অভাবে এই সহায়ক খাতগুলোও বিকশিত হতে পারছে না। উদাহরণস্বরূপ, স্থানীয় গেম ডেভেলপাররা নতুন ই-স্পোর্টস টাইটেল তৈরিতে বিনিয়োগের অভাবে পিছিয়ে পড়ছেন, যা বাংলাদেশের নিজস্ব গেমিং সংস্কৃতি গড়ে তোলার পথকে রুদ্ধ করছে। ADB (এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক) বাংলাদেশের যুবকদের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও, ই-স্পোর্টসকে একটি সম্ভাব্য কর্মসংস্থান ক্ষেত্র হিসেবে এখনো সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, যার ফলে এই সম্ভাবনাময় খাতটি তার পূর্ণাঙ্গ রূপ নিতে পারছে না। এই সামগ্রিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের ডিজিটাল ক্রীড়া অর্থনীতিকে একটি স্থবির অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছে, যা দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে বড় একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

সূচক বাংলাদেশ (২০২৩ আনুমানিক) বৈশ্বিক গড় (২০২৩)
ই-স্পোর্টস বাজার আকার (মিলিয়ন USD) ৭-১০ ১,৬০০-১,৮০০
শীর্ষ ই-স্পোর্টস খেলোয়াড়ের গড় বার্ষিক আয় (USD) ৩,০০০-৫,০০০ ৬০,০০০-৮০,০০০
ই-স্পোর্টস ইভেন্টে কর্পোরেট স্পনসরশিপের হার ১৫%-২০% ৭০%-৭৫%
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ই-স্পোর্টস খাতে বরাদ্দ (%) ০.১% এর কম N/A (দেশভেদে ভিন্ন কাঠামো)
ই-স্পোর্টস খাতে সরকারি বিনিয়োগ (মিলিয়ন USD) ০.৫-১.০ ৫-৫০ (প্রধান ই-স্পোর্টস দেশগুলোতে)

উৎস: বাংলাদেশ ই-স্পোর্টস ফেডারেশন, World Bank ডিজিটাল ইকোনমি রিপোর্ট বিশ্লেষণ ও গ্লোবাল ই-স্পোর্টস ইনসাইটস।

সুপারিশ

  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে (অথবা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়) দ্রুততম সময়ে একটি জাতীয় ই-স্পোর্টস নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। এই নীতিমালায় খেলোয়াড়দের পেশাদার লাইসেন্সিং, চুক্তি সুরক্ষা, টুর্নামেন্ট আয়োজনের মানদণ্ড এবং ই-স্পোর্টসকে একটি স্বীকৃত ক্রীড়া খাত হিসেবে ঘোষণা করার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
  • বাংলাদেশ সরকার ও এডিবি (Asian Development Bank) এর যৌথ অর্থায়নে একটি 'ই-স্পোর্টস ইনোভেশন ফান্ড' গঠন করা যেতে পারে, যা স্থানীয় ট্যালেন্ট ডেভেলপমেন্ট একাডেমি, অবকাঠামো নির্মাণ এবং ই-স্পোর্টস স্টার্টআপগুলোকে (যেমন, স্থানীয় গেম ডেভেলপার, ইভেন্ট অর্গানাইজার) স্বল্প সুদে ঋণ ও অনুদান প্রদানের মাধ্যমে উৎসাহিত করবে।
  • সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর সাথে সমন্বয় করে ই-স্পোর্টস খাতে বিনিয়োগকারী কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিশেষ কর ছাড় বা প্রণোদনা প্যাকেজ প্রদানের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতি তৈরি করতে হবে, যাতে কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) কর্মসূচির আওতায় এই খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানজিম আহমেদ

তানজিম আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ই-স্পোর্টস (eSports) ও গেমিং ইন্ডাস্ট্রি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nema komentara


News Card Generator