চট্টগ্রাম বন্দরের অদৃশ্য জট: রপ্তানি খরচের যে ফাঁদে আটকা দেশ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

চট্টগ্রাম বন্দরের অদৃশ্য জট: রপ্তানি খরচের যে ফাঁদে আটকা দেশ

মেহেদী হাসান  avatar   
মেহেদী হাসান
চট্টগ্রাম বন্দরের অদৃশ্য জট: রপ্তানি খরচের যে ফাঁদে আটকা দেশ
চট্টগ্রাম বন্দরের অদৃশ্য জট: রপ্তানি খরচের যে ফাঁদে আটকা দেশ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের লিড টাইম (Lead Time) প্রতি বছর গড়ে ১৫-২০% বৃ...

সম্প্রতি সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের লিড টাইম (Lead Time) প্রতি বছর গড়ে ১৫-২০% বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরের অদৃশ্য জট এবং সংশ্লিষ্ট লজিস্টিকস অব্যবস্থাপনার ফল। এই অদৃশ্য জট শুধু জাহাজের দীর্ঘ সারি বা কন্টেইনারের স্তূপ নয়, বরং এটি একটি জটিল প্রক্রিয়াগত ও কাঠামোগত সমস্যা যা রপ্তানি খরচকে এমন এক ফাঁদে ফেলছে, যেখানে দেশের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতা প্রতিনিয়ত ক্ষুণ্ন হচ্ছে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম, যা দিয়ে প্রায় ৯২% আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পন্ন হয়, তার অদক্ষতা এখন কেবল একটি অপারেশনাল সমস্যা নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি কৌশলগত দুর্বলতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই পরিস্থিতি দেশের প্রধান রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পকে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে সময় এবং খরচ উভয়ই লাভজনকতার মূল নির্ধারক।

চট্টগ্রাম বন্দরের এই অদৃশ্য জট মূলত তিনটি স্তরে কাজ করে: প্রথমত, বন্দরের ভৌত অবকাঠামো ও সরঞ্জামাদির অপ্রতুলতা এবং পুরাতন পদ্ধতি; দ্বিতীয়ত, শুল্ক ও অন্যান্য সরকারি দপ্তরের দীর্ঘসূত্রিতা; এবং তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ পরিবহন ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতা। কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে বন্দরের সক্ষমতা এখনো বৈশ্বিক মানদণ্ডের তুলনায় অনেক নিচে। এনবিআর (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড)-এর কাস্টমস ক্লিয়ারিং প্রক্রিয়ায় এখনো ম্যানুয়াল পদ্ধতির ব্যাপক ব্যবহার, একাধিক এজেন্সির অনুমোদন এবং প্রায়শই অপ্রত্যাশিত পরিদর্শনের কারণে পণ্য খালাসে অস্বাভাবিক বিলম্ব হয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি রপ্তানি চালান বন্দরে পৌঁছানোর পর থেকে জাহাজে ওঠা পর্যন্ত গড়ে ৫-৭ দিন সময় লাগার কথা থাকলেও, অনেক ক্ষেত্রে তা ১০-১৫ দিনেও গড়ায়। এই অতিরিক্ত সময় মানেই অতিরিক্ত কস্ট, যা পণ্য গুদামজাতকরণ, ডেমারেজ চার্জ এবং সর্বোপরি বিদেশি ক্রেতার কাছে সময়মতো পণ্য পৌঁছাতে না পারার ঝুঁকি বাড়ায়। এই বিলম্ব শুধু সরাসরি আর্থিক ক্ষতিই করে না, বরং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে এবং ক্রেতাদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে নতুন অর্ডার হারানোর কারণ হয়।

এই অদৃশ্য জট দেশের রপ্তানি খাতকে একটি দুষ্টচক্রের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছর ধরে রপ্তানি আয়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, যার একটি বড় কারণ হিসেবে লজিস্টিকস খরচ বৃদ্ধিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। যখন একটি পণ্যের উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনা সম্ভব হয় না এবং লজিস্টিকস খরচ বেড়ে যায়, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়, যা প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশকে পিছিয়ে দেয়। সিপিডি'র বিশ্লেষণ মতে, বাংলাদেশের লজিস্টিকস খরচ দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ, যা মোট রপ্তানি মূল্যের প্রায় ১৪-১৬% পর্যন্ত হতে পারে। এই উচ্চ খরচ বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি রপ্তানিকারকদের জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠে, কারণ তাদের পক্ষে বৃহৎ রপ্তানিকারকদের মতো দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি বা সাপ্লাই চেইন ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা থাকে না। ফলস্বরূপ, নতুন বাজার অন্বেষণ বা বৈচিত্র্যময় পণ্য রপ্তানির উদ্যোগগুলো শুরুতেই হোঁচট খায়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সময়ে লজিস্টিকস খরচ কমানোর বিষয়ে নির্দেশনা জারি করলেও, মাঠ পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন ধীরগতিতে এগোচ্ছে, যার কারণে রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো তাদের কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারছে না।

বন্দর এবং সংশ্লিষ্ট লজিস্টিকস ব্যবস্থার এই অদক্ষতা শুধু রপ্তানি খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে না, বরং দেশের বিনিয়োগ পরিবেশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এমন একটি সাপ্লাই চেইন চান যা নির্ভরযোগ্য, দ্রুত এবং ব্যয়সাশ্রয়ী। চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান পরিস্থিতি এই তিন মানদণ্ডেই পিছিয়ে থাকায়, অনেক সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করেন। কন্টেইনারের দীর্ঘ ডেমারেজ চার্জ, জাহাজ বার্থিংয়ে বিলম্ব এবং আমদানি করা কাঁচামাল সময়মতো কারখানায় পৌঁছাতে না পারার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া – এসবই দেশের অর্থনীতির জন্য এক অদৃশ্য বোঝা। দেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক অনুমোদিত অনেক লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইন সংশ্লিষ্ট কোম্পানি এই চ্যালেঞ্জগুলির মুখে পড়ে তাদের ব্যবসায়িক সক্ষমতা হারায়, যা সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই সমস্যাগুলো সমাধানে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে, দেশের রপ্তানি সম্ভাবনা অপূর্ণই থেকে যাবে এবং মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ধরনের বাধার সম্মুখীন হতে হবে।

প্যারামিটার ২০২০ ২০২২ ২০২৩
গড় কন্টেইনার ডুয়েল টাইম (দিন) ৪.৫ ৫.৮ ৬.২
বার্ষিক কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা (মিলিয়ন টিইইউ) ৩.০ ৩.৩ ৩.৫
প্রকৃত বার্ষিক কন্টেইনার হ্যান্ডলিং (মিলিয়ন টিইইউ) ২.৮ ৩.১ ৩.৪
রপ্তানি মূল্যের লজিস্টিকস খরচ (%) ১৩.০% ১৪.৫% ১৫.২%
EPB রপ্তানি প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা বনাম অর্জিত (%) লক্ষ্য: ৮.০%, অর্জিত: ৭.৫% লক্ষ্য: ১০.০%, অর্জিত: ৯.২% লক্ষ্য: ৯.৫%, অর্জিত: ৮.৮%

উৎস: চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, এনবিআর, ইপিবি ও সিপিডি এর বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে সংকলিত।

সুপারিশ

  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কে দ্রুত ASYCUDA World এর সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং এর আওতায় প্রি-অ্যারাইভাল প্রসেসিং (PAP) এবং রিস্ক ম্যানেজমেন্ট মডিউল সক্রিয় করতে হবে। এর মাধ্যমে পণ্য খালাসের জন্য শারীরিক পরিদর্শন কমিয়ে আনতে হবে এবং অনুমোদিত ব্যবসায়ীদের জন্য 'ফাস্ট-ট্র্যাক' ক্লিয়ারেন্স পদ্ধতি চালু করতে হবে, যা ৯০% কন্টেইনারের জন্য অনলাইন ক্লিয়ারেন্স নিশ্চিত করবে।
  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন 'জাতীয় লজিস্টিকস সমন্বয় কমিটি' গঠন করতে হবে, যেখানে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, NBR, EPB, বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এই কমিটি ২০২৫ সালের মধ্যে একটি সমন্বিত 'জাতীয় লজিস্টিকস নীতি' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে, যা বন্দর, সড়ক, রেল ও অভ্যন্তরীণ নৌপথের লজিস্টিকস কার্যক্রমকে একটি একক উইন্ডো (Single Window) পদ্ধতির আওতায় আনবে।
  • চট্টগ্রাম বন্দরের দীর্ঘমেয়াদী সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য 'বে টার্মিনাল' এবং 'পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল' প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে। এর পাশাপাশি, বিদ্যমান টার্মিনালগুলোর জন্য অত্যাধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেন, রিচ স্ট্যাকার এবং ইয়ার্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মতো সরঞ্জামাদি সংগ্রহ ও স্থাপন করতে হবে। এই বিনিয়োগগুলো একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে তদারকি জোরদার করতে হবে এবং প্রয়োজনে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) মডেলকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মেহেদী হাসান

মেহেদী হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও এক্সপোর্ট-ইম্পোর্ট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator