সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ডিজিটাল বাণিজ্য খাতে ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, কিউকমের মতো ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোর বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এবং এর ফলে হাজার হাজার গ্রাহকের শত শত কোটি টাকা আটকে পড়ার ঘটনা নতুন করে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। এই ঘটনাগুলো কেবল গ্রাহকদের আর্থিক ক্ষতিই করেনি, বরং দেশের উদীয়মান ই-কমার্স ও এফ-কমার্স খাতের সামগ্রিক ভবিষ্যৎ এবং সম্ভাবনার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গ্রাহক সুরক্ষায় বিভিন্ন নির্দেশিকা জারি করলেও, কার্যত আইনি কাঠামোতে বিদ্যমান ফাঁকফোকরগুলোই এই ধরনের প্রতারণার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। যেখানে দ্রুত বিকাশমান এই খাত দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতো, সেখানে আইনি দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে একটি অসাধু চক্র পুরো খাতকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
বাংলাদেশের ই-কমার্স ও এফ-কমার্স খাত কোভিড-১৯ মহামারির সময় অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি লাভ করেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে বিলাসবহুল সামগ্রী পর্যন্ত সবই এখন অনলাইনে কেনাবেচা হচ্ছে। বিশেষত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নির্ভর এফ-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তবে এই দ্রুত প্রসারের সাথে তাল মিলিয়ে আইনি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো বিকশিত হয়নি। এনবিআর (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) বৃহৎ ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে ভ্যাট ও ট্যাক্স আদায়ে কিছুটা অগ্রগতি দেখালেও, লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র এফ-কমার্স ব্যবসা, যা মূলত ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মে পরিচালিত হয়, তাদের রাজস্ব আদায় এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে যাচ্ছে। ফলে, একদিকে যেমন সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে এসব অসংগঠিত প্ল্যাটফর্মে পণ্য ও সেবার মান, ডেলিভারি এবং গ্রাহক সেবার বিষয়ে কোনো জবাবদিহিতা থাকছে না। গ্রাহকদের অগ্রিম পরিশোধিত অর্থ ফেরত না পাওয়া, নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ বা পণ্য ডেলিভারি না হওয়ার মতো অভিযোগগুলো প্রায়শই শোনা যাচ্ছে, যা খাতটির প্রতি সামগ্রিক আস্থাকে মারাত্মকভাবে আঘাত করছে।
এই আস্থার সংকটের মূলে রয়েছে সুনির্দিষ্ট আইনি ফাঁকফোকর এবং বিদ্যমান আইনের দুর্বল প্রয়োগ। ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা ২০২০ (সংশোধিত) এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ থাকলেও, ই-কমার্স ও এফ-কমার্সের বিশেষায়িত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় এগুলো যথেষ্ট নয়। উদাহরণস্বরূপ, অগ্রিম পরিশোধিত অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর এসক্রো সিস্টেমের অভাব একটি বড় সমস্যা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে নির্দেশনা দিলেও, তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর এবং সর্বজনীন নয়। সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট (CPTU) দ্বারা পরিচালিত সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় এসক্রো পদ্ধতি কার্যকর থাকলেও, বেসরকারি ই-কমার্সে এর বাধ্যতামূলক প্রয়োগের অভাব রয়েছে। এছাড়াও, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) যদিও সরাসরি ই-কমার্স খাত নিয়ন্ত্রণ করে না, তবে পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে এর ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু ই-কমার্স খাতের এই অস্থিরতা সামগ্রিকভাবে দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা দীর্ঘমেয়াদে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বিএসইসি-এর অধীনে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য একটি সুস্থ বাজার পরিবেশ তৈরিতেও বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এক্সপোর্ট প্রোমোশন ব্যুরো (EPB) যখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দেশের পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধির চেষ্টা করছে, তখন অভ্যন্তরীণ বাজারে আস্থার সংকট আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছেও বাংলাদেশের ডিজিটাল বাণিজ্য খাতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর বিভিন্ন গবেষণায়ও দেখা গেছে যে, ডিজিটাল অর্থনীতির এই অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি একদিকে যেমন নতুন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনই অন্যদিকে গ্রাহক সুরক্ষার বিষয়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করছে, বিশেষ করে প্রান্তিক গ্রাহকদের মধ্যে যারা ডিজিটাল লেনদেনের জটিলতা সম্পর্কে কম ওয়াকিবহাল।
| সাল | ই-কমার্স মার্কেট আকার (আনুমানিক, কোটি টাকা) | এনবিআর ভ্যাট আদায় (ই-কমার্স, কোটি টাকা) | বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ভোক্তা অভিযোগ (সংখ্যা) |
|---|---|---|---|
| ২০১৯ | ৮,০০০ | ৩০ | ১,২০০ |
| ২০২০ | ১৬,০০০ | ৮০ | ৩,৫০০ |
| ২০২১ | ২৫,০০০ | ১৫০ | ৭,০০০ |
| ২০২২ (প্রক্ষেপিত) | ৩০,০০০ | ২৫০ | ৯,০০০+ |
উৎস: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, এনবিআর ও সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
সুপারিশ
শক্তিশালী এসক্রো সিস্টেমের বাধ্যতামূলক প্রয়োগ: বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা ২০২০-এর অধীনে অবিলম্বে একটি সুনির্দিষ্ট এবং বাধ্যতামূলক এসক্রো পেমেন্ট সিস্টেম চালু করা হোক, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট দ্বারা তত্ত্বাবধান করা হবে। এই সিস্টেমে গ্রাহকের অগ্রিম পরিশোধিত অর্থ পণ্য ডেলিভারি এবং গ্রাহকের সন্তুষ্টি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তৃতীয় পক্ষের কাছে (যেমন ব্যাংক বা পেমেন্ট গেটওয়ে) জমা থাকবে।
এফ-কমার্স নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ: বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক একটি সহজ কিন্তু বাধ্যতামূলক অনলাইন নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালু করা হোক, যার মাধ্যমে সকল এফ-কমার্স ব্যবসাকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিবন্ধিত হতে হবে। এই নিবন্ধন প্রক্রিয়া এনবিআর-এর সাথে সংযুক্ত থাকবে, যাতে তাদের টিআইএন/বিন নিশ্চিত করা যায় এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯-এর অধীনে তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়।
ডিজিটাল কমার্স রেগুলেটরি অথরিটি গঠন: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি স্বতন্ত্র 'ডিজিটাল কমার্স রেগুলেটরি অথরিটি' (DCRA) গঠন করা হোক, যা ই-কমার্স ও এফ-কমার্স খাতের জন্য সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন, নীতি বাস্তবায়ন, লাইসেন্সিং, তদারকি এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একক কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করবে। এটি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের সাথে সমন্বয় করে কাজ করবে।