এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ

আনিসুর রহমান  avatar   
আনিসুর রহমান
এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ
এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং এর ফলস্বরূপ স্পট মার্কেটে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-এর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন...

সম্প্রতি, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং এর ফলস্বরূপ স্পট মার্কেটে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-এর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতকে এক কঠিন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই এলএনজি আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়কে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এই অপ্রত্যাশিত চাপ একদিকে যেমন লোডশেডিং বৃদ্ধি করেছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাগুলোকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। বিশেষ করে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ এবং এলএনজি নির্ভরতার কৌশলগত ঝুঁকি এখন সরকারের উচ্চ পর্যায়ের আলোচনায় প্রাধান্য পাচ্ছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি মিশ্রণে এলএনজি ও কয়লার ভূমিকা একটি জটিল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যেখানে অর্থনৈতিক সক্ষমতা, পরিবেশগত প্রভাব এবং জ্বালানি নিরাপত্তা পরস্পরবিরোধী অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। একদিকে, পরিবেশগত উদ্বেগের কারণে বিশ্বব্যাংক (World Bank) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কয়লাভিত্তিক প্রকল্পে অর্থায়ন থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে, যা বাংলাদেশের নতুন কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে বড় বাধা সৃষ্টি করছে। এর ফলস্বরূপ, বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যেই ১০টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করেছে, যা দেশের বিদ্যুৎ খাতের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনাকে এলএনজি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু এই পরিবর্তন হুট করে আসেনি এবং এর সাথে জড়িত রয়েছে উচ্চ আর্থিক ঝুঁকি। বর্তমানে, দেশে বিদ্যমান এলএনজি টার্মিনালগুলো (যেমন মহেশখালীর ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট বা এফএসআরইউ) ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে এবং নতুন টার্মিনাল স্থাপনের প্রক্রিয়া ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। পেট্রোবাংলা (Petrobangla) দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির মাধ্যমে এলএনজি আমদানির চেষ্টা করলেও, বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সরবরাহ চেইন বিভ্রাটের কারণে তা প্রায়শই ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি কিনতে বাধ্য হচ্ছে দেশ। এই অনিশ্চিত এলএনজি সরবরাহ বিদ্যুৎ উৎপাদনকে অস্থির করে তুলছে এবং শিল্প খাতে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ব্যাহত করছে।

অন্যদিকে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ তুলনামূলকভাবে কম উৎপাদন ব্যয় এবং স্থিতিশীল সরবরাহের সুবিধা নিয়ে আসে, যদিও এর পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং রামপাল মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্টের মতো বৃহৎ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই কেন্দ্রগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে উচ্চ প্রযুক্তির মাধ্যমে দূষণ নিয়ন্ত্রণের দাবি করলেও, কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের বৈশ্বিক চাপ অব্যাহত আছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় একটি টেকসই জ্বালানি মিশ্রণের দিকে এগোতে চাইছে, যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে (যেমন সৌর ও বায়ু) বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎসগুলোর অস্থির প্রকৃতি (intermittency) এবং গ্রিড ইন্টিগ্রেশনের সীমাবদ্ধতা বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। এই পরিস্থিতিতে, বিদ্যমান কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার এবং ভবিষ্যতে এলএনজি সরবরাহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উভয়ই জরুরি হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে, অফশোর গ্যাস অনুসন্ধানে ধীরগতি এবং দেশীয় গ্যাস মজুদের হ্রাস এলএনজির ওপর নির্ভরতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

জ্বালানির উৎস স্থাপিত ক্ষমতা (MW, জুন ২০২৩) মোট উৎপাদনে অংশ (%, ২০২২-২৩) গড় উৎপাদন ব্যয় (টাকা/kWh, ২০২২-২৩)
এলএনজি-ভিত্তিক বিদ্যুৎ ৩,৪০০ ১৩.৫% ১০.৮৫
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ ২,৬০০ ১২.০% ৯.২০
প্রাকৃতিক গ্যাস (দেশীয়) ১০,০০০ ৫০.০% ৩.৫০
ফার্নেস অয়েল ৬,২০০ ১৫.০% ১৮.৫০
ডিজেল ১,৩০০ ২.৫% ২৩.০০
নবায়নযোগ্য ১,০০০ ২.০% ৮.০০

উৎস: বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (BPDB) বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২২-২৩ এবং বাংলাদেশ জ্বালানি রেগুলেটরি কমিশন (BERC) এর তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে আনুমানিক।

সুপারিশ

  • জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: পেট্রোবাংলাকে (Petrobangla) অবিলম্বে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রমে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে এবং বিদ্যমান বাপেক্স (BAPEX) সক্ষমতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, বৈশ্বিক এলএনজি বাজার স্থিতিশীলতার জন্য একাধিক উৎস থেকে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি সম্পাদনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
  • বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি পুনর্বিবেচনা: বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (BPDB) এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (BPDB)-কে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (BERC)-এর সাথে যৌথভাবে অব্যবহৃত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা কমাতে বিদ্যমান উচ্চ ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (PPA) গুলো পুনর্বিবেচনা করতে হবে এবং ভবিষ্যতের চুক্তিগুলোতে 'নো-হার্ডশিপ' ধারা সন্নিবেশিত করার আইনগত দিক খতিয়ে দেখতে হবে।
  • নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে অর্থায়ন ও নীতি সংস্কার: বাংলাদেশ সরকার (Government of Bangladesh) এবং বিদ্যুৎ বিভাগকে (Power Division) বিশ্বব্যাংক (World Bank) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর সহায়তায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে (যেমন সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ) অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। এর জন্য 'জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০০৮' এর সময়োপযোগী সংস্কার এবং গ্রিড আধুনিকায়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: আনিসুর রহমান

আনিসুর রহমান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

لم يتم العثور على تعليقات


News Card Generator