ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার ১০ নম্বর বিসকা ইউনিয়নের মেছেড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি গঠন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপির দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আজ দুপুর ১২টার দিকে বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এই বিরোধ প্রকাশ্যে আসে, যখন কমিটি গঠনের এজেন্ডা নিয়ে দলটির বিবদমান দুটি পক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়ায়। মূলত বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি পদে বিএনপি নেতা সুমনের প্রার্থিতাকে কেন্দ্র করেই এই উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটে। এক পক্ষ সুমনকে সভাপতি হিসেবে দেখতে চাইলেও অন্য পক্ষ এর তীব্র বিরোধিতা করে, যার ফলে সভার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং উপস্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় শুরু হয়। এই ঘটনাটি সরকারি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অপচেষ্টাকেই স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার নেপথ্যে ছিল ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক আক্রমণাত্মক বক্তব্য। সভার এক পর্যায়ে ভাটিয়াপাড়া গ্রামের বিএনপি সমর্থক বাবুল সরাসরি মোফাজ্জল হোসেন নামক স্থানীয় এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ তোলেন, যা উপস্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। ভুক্তভোগী মোফাজ্জল হোসেন এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কোনো অবস্থাতেই দলীয়করণের হাতিয়ার করা যাবে না। তিনি আরও বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সব ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব ও বলয় থেকে মুক্ত রাখতে হবে। মোফাজ্জল হোসেনের এই বক্তব্যের পর পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে এবং দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়, যা শেষ পর্যন্ত একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে।
ঘটনার প্রেক্ষিতে স্থানীয় সচেতন মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো সংবেদনশীল স্থানে দলীয় প্রভাব খাটানো এবং কমিটি গঠনের নামে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। স্থানীয়দের দাবি, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়নের পরিবর্তে যোগ্য ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের মাধ্যমে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি, তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা যেভাবে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে পড়ছে, তাতে করে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন অভিভাবকবৃন্দ। তারা দাবি জানিয়েছেন, অনতিবিলম্বে স্থানীয় প্রশাসন ও দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের হস্তক্ষেপে যেন এই বিরোধের নিষ্পত্তি করা হয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখা হয়।
এই ধরণের অভ্যন্তরীণ সংঘাত কেবল একটি বিদ্যালয়ের কার্যক্রমকেই বিঘ্নিত করছে না, বরং তৃণমূল পর্যায়ে দলের ভাবমূর্তিকে জনসাধারণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের এই প্রবণতা বন্ধ না হলে তা দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধের সমাধান নিজ নিজ বলয়ে করবে এবং শিক্ষাঙ্গনের পবিত্রতা রক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে। কমিটি গঠন প্রক্রিয়াটি যদি স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে সম্পন্ন না হয়, তবে তা ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।