বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তর-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ | আই নিউজ বিডি

বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তর-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ

ব্যারিস্টার রাজীব  avatar   
ব্যারিস্টার রাজীব
বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তর-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ
বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তর-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক 'ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্প' (দ্বিতীয় পর্যায়) সম্প্রসারণের ঘোষণা বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তরের চলমান প্র...

সম্প্রতি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক 'ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্প' (দ্বিতীয় পর্যায়) সম্প্রসারণের ঘোষণা বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তরের চলমান প্রচেষ্টাকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এনেছে। এই প্রকল্পের আওতায় দেশের আরও ১৫০০ আদালত কক্ষে ভার্চুয়াল কোর্ট পরিচালনার উপযোগী অবকাঠামো স্থাপন এবং ডিজিটাল নথি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির উন্নয়নে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রাথমিক প্রস্তাবনা বাংলাদেশ সরকার অনুমোদন করেছে। এই পদক্ষেপ বিচারিক প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করার যে দীর্ঘমেয়াদী অঙ্গীকার, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। কিন্তু এই বিশাল বিনিয়োগ এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যমাত্রা কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং মাঠ পর্যায়ে এর প্রকৃত প্রভাব কী, সে বিষয়ে তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ অত্যাবশ্যক।

বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তরের প্রথম ধাপ মূলত কোভিড-১৯ মহামারীর সময় ভার্চুয়াল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে গতি লাভ করে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ত্বরিত পদক্ষেপের ফলে ২০২০ সালের মে মাস থেকে ভার্চুয়াল আদালত কার্যক্রম শুরু হয়। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, প্রথম এক বছরে সারা দেশে প্রায় ১,০০,০০০ (এক লক্ষ) এরও বেশি ভার্চুয়াল শুনানির মাধ্যমে প্রায় ৬০,০০০ (ষাট হাজার) আসামীর জামিন মঞ্জুর করা সম্ভব হয়। এটি একটি তাৎক্ষণিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হলেও, এর কার্যকারিতা কেবল জামিন আবেদন নিষ্পত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং নিয়মিত বিচারিক কার্যক্রমের একটি ভগ্নাংশকেই স্পর্শ করতে পেরেছিল। 'ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্প' এর মাধ্যমে বিচার বিভাগের জন্য একটি সমন্বিত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি, ই-ফাইলিং সিস্টেম চালু, বিচারকদের জন্য ডিজিটাল টুলস সরবরাহ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত সকলের ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধিতে জোর দেওয়া হচ্ছে। World Bank এবং Asian Development Bank (ADB) এর মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরা এই প্রকল্পে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও আর্থিক ঋণ প্রদান করে আসছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। বিশেষ করে ADB এর 'Judicial Sector Reform Project' এর আওতায় বিচারকদের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা প্রদান করা হয়েছে, যা বিভিন্ন জেলা ও মহানগর দায়রা জজ আদালতে আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে, এই বিনিয়োগের সম্পূর্ণ সুফল পেতে হলে কেবল অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং এর টেকসই ব্যবহার এবং রক্ষণাবেক্ষণের উপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

তবে, এই ডিজিটাল রূপান্তরের পথে চ্যালেঞ্জের অভাব নেই। দেশের অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগের অভাব এখনও একটি বড় বাধা। আদালত কক্ষগুলোতে আধুনিক হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার সরবরাহ করা হলেও, সেগুলোর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিচারক, আইনজীবী এবং আদালত কর্মীদের মধ্যে পর্যাপ্ত ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, জেলা পর্যায়ের প্রায় ৩০% আইনজীবী এখনও ই-ফাইলিং বা ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না, যা ডিজিটাল ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। তাছাড়া, বিচার বিভাগের বিভিন্ন স্তরের ডেটাবেসগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। পুলিশ, কারাগার, প্রসিকিউশন এবং আদালতের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য একটি একক, সুরক্ষিত এবং ইন্টিগ্রেটেড প্ল্যাটফর্মের অভাব বিচারিক প্রক্রিয়ায় অযথা দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি করছে। ডেটা নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তা নিশ্চিত করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ, বিশেষ করে যখন সংবেদনশীল বিচারিক তথ্য ডিজিটালাইজ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের 'ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮' থাকা সত্ত্বেও, সাইবার নিরাপত্তা প্রোটোকল এবং নিয়মিত অডিট পদ্ধতির অনুপস্থিতি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে, প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ হলেও, সেগুলোর বাস্তবায়ন ধীর গতিতে চলছে, যার ফলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনে বিলম্ব হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, প্রথম পর্যায়ের 'ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্প'-এর অধীনে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সকল আদালত কক্ষে ডিজিটাল ডিসপ্লে এবং ভিডিও কনফারেন্সিং সরঞ্জাম স্থাপন করা যায়নি, যা প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে, কেবলমাত্র সংখ্যাগত সাফল্য নয়, বরং গুণগত পরিবর্তন এবং ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল গ্রহণ করা জরুরি।

সূচক ২০২০-২১ অর্থবছর ২০২১-২২ অর্থবছর ২০২২-২৩ অর্থবছর (প্রাক্কলিত)
ভার্চুয়াল শুনানির মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া মামলার সংখ্যা ১,১০,০০০ ১,৩০,০০০ ১,৫০,০০০
ই-ফাইলিং সিস্টেমের আওতায় আসা আদালতের সংখ্যা (মোটের %) ১৫% ২৫% ৪০%
বিচারক ও আদালত কর্মীদের ডিজিটাল সাক্ষরতা প্রশিক্ষণ গ্রহণকারীর সংখ্যা ৮,৫০০ ১২,০০০ ১৫,০০০
ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্পের বাজেট বরাদ্দ (কোটি টাকা) ২৫০ ৩৫০ ৪০০
প্রকল্প বাস্তবায়নের হার (%) ৬০% ৬৫% ৭০%

উৎস: আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বার্ষিক প্রতিবেদন (আনুমানিক)।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকারের 'ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্প ২০৪১' এর অধীনে সকল জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের আদালতকে উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ এবং আধুনিক হার্ডওয়্যার সরবরাহ নিশ্চিত করতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে নির্দিষ্ট সময়সীমা ও জবাবদিহিতা থাকবে।
  • বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন এবং জুডিশিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ট্রেনিং ইনস্টিটিউটকে (JATI) বিচারক, আইনজীবী ও আদালত কর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক ও নিয়মিত ডিজিটাল সাক্ষরতা, সাইবার নিরাপত্তা এবং ই-জুডিশিয়ারি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের উপর প্রশিক্ষণ কর্মসূচী প্রবর্তন করতে হবে, যা 'জাতীয় বিচার বিভাগীয় প্রশিক্ষণ নীতি'র আওতায় পরিচালিত হবে এবং এর কার্যকারিতা নিয়মিত মূল্যায়ন করা হবে।
  • আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় করে একটি কেন্দ্রীয়, সুরক্ষিত ডেটা ইন্টিগ্রেশন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে যা পুলিশ, কারাগার, প্রসিকিউশন এবং আদালতের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানকে সুসংহত করবে এবং 'ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮' এর কঠোর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিচার বিভাগের সকল ডিজিটাল উপাত্তের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ব্যারিস্টার রাজীব

ব্যারিস্টার রাজীব 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তর। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator