কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ

মোশতাক আহমেদ  avatar   
মোশতাক আহমেদ
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক তথ্যে দেখা গেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় (টিভিইটি) মোট শিক্ষার্থীর হার ২০ শতাংশে উন্নীত...

সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক তথ্যে দেখা গেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় (টিভিইটি) মোট শিক্ষার্থীর হার ২০ শতাংশে উন্নীত করার সরকারি লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও, বর্তমান হার এখনো ১৪ শতাংশের আশেপাশে স্থবির রয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ধীরগতি কেবল একটি সংখ্যাগত ব্যর্থতা নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে এক বড় ধরনের শূন্যতা নির্দেশ করে। বিশেষ করে, যখন দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী কর্মসংস্থানের অভাবে ভুগছে এবং শিল্প খাত দক্ষ শ্রমিকের অভাবে ধুঁকছে, তখন কারিগরি শিক্ষার এই স্থবিরতা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বহুলাংশে নির্ভরশীল দক্ষ জনশক্তির ওপর, আর সেখানেই টিভইটি খাতের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ব্যর্থতার মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে সনাতন পাঠ্যক্রম এবং শিল্প-প্রতিষ্ঠানের চাহিদার সাথে এর অসামঞ্জস্য। অধিকাংশ কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রম আধুনিক শিল্পের দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তিগত চাহিদা পূরণে ব্যর্থ। উদাহরণস্বরূপ, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স বা অ্যাডভান্সড ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মতো বিষয়গুলো পাঠ্যক্রমে পর্যাপ্ত গুরুত্ব পাচ্ছে না, যা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য। উপরন্তু, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত আধুনিক সরঞ্জাম ও ল্যাবরেটরির অভাব প্রকট। অনেক প্রতিষ্ঠানে পুরনো যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ শেখানো হয়, যা শিক্ষার্থীদের বাস্তব কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত করতে পারে না। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই অবকাঠামোগত ঘাটতি একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা, যা অর্থায়ন ও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে দূর হচ্ছে না। প্রশিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগের অভাবও একটি বড় কারণ; অনেক প্রশিক্ষকই আধুনিক প্রযুক্তি ও শিল্প পদ্ধতির সাথে পরিচিত নন, ফলে তারা শিক্ষার্থীদের কার্যকরভাবে প্রশিক্ষণ দিতে পারছেন না।

এই দুর্বলতাগুলোর ফলস্বরূপ, কারিগরি শিক্ষা থেকে উত্তীর্ণ অনেক শিক্ষার্থীই বেকার থাকছে অথবা তাদের অর্জিত দক্ষতা বাজারের চাহিদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ না হওয়ায় অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS)-এর বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, কারিগরি শিক্ষা থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তাদের অর্জিত ডিগ্রির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ চাকরি খুঁজে পায় না। এটি সমাজে কারিগরি শিক্ষার প্রতি একটি নেতিবাচক ধারণার জন্ম দিচ্ছে, যেখানে উচ্চশিক্ষা বা সাধারণ শিক্ষাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলস্বরূপ, মেধাবী শিক্ষার্থীরা কারিগরি শিক্ষায় আসতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) দক্ষতা মান নির্ধারণ ও সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, মাঠ পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন এবং শিল্প-প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় এখনো দুর্বল। দক্ষতা সনদপ্রাপ্ত কর্মীদের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা ও তাদের দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা গেলে এই খাতের প্রতি আগ্রহ বাড়ত। এছাড়া, কারিগরি শিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষায় (যেমন ডিপ্লোমা থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি) রূপান্তরের পথ সুগম না থাকায় অনেক শিক্ষার্থীই ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, যা তাদের পেশাগত উন্নতির পথে বাধা সৃষ্টি করে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (UGC)-এর তত্ত্বাবধানে এই রূপান্তর প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করা সম্ভব।

সাল কারিগরি শিক্ষায় মোট শিক্ষার্থী (লক্ষ) কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার (মোট শিক্ষার্থীর শতাংশ) মোট কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
২০১৬ ১২.৮ ১২.২০% ৬,৫৭২
২০১৮ ১৩.৯ ১৩.৫০% ৬,৮৯৪
২০২০ ১৪.৫ ১৩.৮০% ৭,০৫০
২০২২ ১৫.২ ১৪.১০% ৭,২১৫

উৎস: বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এর বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে সংকলিত।

সুপারিশ

  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে অবিলম্বে একটি জাতীয় কারিগরি শিক্ষানীতি পুনর্গঠন করতে হবে, যা শিল্প-প্রতিষ্ঠানের চাহিদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ আধুনিক ও যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করবে। এই নীতিতে NSDA কর্তৃক নির্ধারিত জাতীয় দক্ষতা মান (National Skills Qualification Framework - NSQF) বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং প্রতি দুই বছর অন্তর পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা ও আপডেটের জন্য শিল্প প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী 'কারিকুলাম রিভিউ কমিটি' গঠন করতে হবে।
  • কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রশিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে প্রতিটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে আধুনিক ল্যাব সরঞ্জাম ও ব্যবহারিক সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য একটি পাঁচ বছর মেয়াদী বিনিয়োগ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি, প্রশিক্ষকদের জন্য নিয়মিত শিল্প-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করতে হবে, যেখানে তাদের সর্বশেষ প্রযুক্তি ও শিল্প পদ্ধতির সাথে পরিচিত করানো হবে, এবং এর জন্য সরকারি বাজেট থেকে 'শিক্ষক দক্ষতা উন্নয়ন তহবিল' গঠন করতে হবে।
  • কারিগরি শিক্ষার প্রতি সামাজিক নেতিবাচক ধারণা দূর করতে এবং শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (UGC) কে ডিপ্লোমা ও সমমানের কারিগরি ডিগ্রিধারীদের জন্য সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্রেডিট ট্রান্সফার এবং উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পথকে আরও সুগম করতে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। একই সাথে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে NSDA-এর সাথে সমন্বয় করে একটি ব্যাপক জনসচেতনতামূলক প্রচার অভিযান চালাতে হবে, যা কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং সফল ক্যারিয়ারের উদাহরণ তুলে ধরবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মোশতাক আহমেদ

মোশতাক আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

没有找到评论


News Card Generator