স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের অন্দরমহল: রয়্যালটির জটিল হিসাব ও শিল্পীর বঞ্চনা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের অন্দরমহল: রয়্যালটির জটিল হিসাব ও শিল্পীর বঞ্চনা

রকিবুল ইসলাম  avatar   
রকিবুল ইসলাম
স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের অন্দরমহল: রয়্যালটির জটিল হিসাব ও শিল্পীর বঞ্চনা
স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের অন্দরমহল: রয়্যালটির জটিল হিসাব ও শিল্পীর বঞ্চনা
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি World Bank-এর 'বাংলাদেশ ডিজিটাল ইকোনমি রিপোর্ট ২০২৩' অনুযায়ী, দেশের ডিজিটাল বিনোদন খাতের অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয়েছে, যেখানে অনলাইন স্ট্রিমি...

সম্প্রতি World Bank-এর 'বাংলাদেশ ডিজিটাল ইকোনমি রিপোর্ট ২০২৩' অনুযায়ী, দেশের ডিজিটাল বিনোদন খাতের অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয়েছে, যেখানে অনলাইন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো বিশাল রাজস্ব আহরণ করছে। এই প্রবৃদ্ধির উল্টো পিঠে, বাংলাদেশের সঙ্গীত শিল্পীদের মধ্যে তাদের সৃষ্টি থেকে প্রাপ্ত রয়্যালটি নিয়ে গভীর অসন্তোষ ও বঞ্চনার অভিযোগ ক্রমশ প্রকট হচ্ছে। বিশেষ করে, আন্তর্জাতিক ও দেশীয় স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর অস্বচ্ছ রয়্যালটি বন্টন প্রক্রিয়া এবং শিল্পীদের ন্যায্য হিস্যা না পাওয়ার বিষয়টি এখন আর কেবল চাপা গুঞ্জন নয়, বরং এটি সঙ্গীত শিল্পের ভবিষ্যৎ অস্তিত্বের জন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। শিল্পীরা অভিযোগ করছেন যে, তাদের গান লাখ লাখ বার স্ট্রিম হলেও, প্রতিটি স্ট্রিমের জন্য প্রাপ্ত পারিশ্রমিক এতটাই নগণ্য যে তা তাদের জীবন ধারণের জন্য যথেষ্ট নয়, যা ডিজিটাল যুগে এসেও তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর আয়ের মডেল এবং রয়্যালটি বিতরণের জটিল পদ্ধতিই এই বঞ্চনার মূল কারণ। সাধারণত, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো প্র-রাটা (pro-rata) মডেল ব্যবহার করে থাকে, যেখানে প্ল্যাটফর্মের মোট আয় থেকে একটি নির্দিষ্ট শতাংশ (সাধারণত ৭০-৮০%) অধিকারধারীদের জন্য বরাদ্দ করা হয়। এরপর এই বরাদ্দকৃত অর্থ মোট স্ট্রিমের অনুপাতে সমস্ত গান এবং অধিকারধারীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। এর অর্থ হলো, যদি কোনো মাসে একটি প্ল্যাটফর্মে মোট ১ বিলিয়ন স্ট্রিম হয় এবং আপনার গান ১ মিলিয়ন বার স্ট্রিম হয়, তবে আপনি মোট স্ট্রিমের ০.১% এর জন্য যোগ্য হবেন। এই ০.১% হিস্যা আবার সরাসরি শিল্পী পান না; বরং এটি প্রথমে রেকর্ড লেবেল, প্রকাশক এবং বিভিন্ন মধ্যস্বত্বভোগীর (যেমন – এগ্রিগেটর) কাছে যায়। এরপর, এই মধ্যস্বত্বভোগীরা তাদের চুক্তি অনুযায়ী শিল্পীকে একটি ক্ষুদ্র অংশ প্রদান করে। উদাহরণস্বরূপ, একটি গানের জন্য প্রতি স্ট্রিমের মূল্য (payout per stream) ০.০০৩ ডলার থেকে ০.০০৫ ডলার পর্যন্ত হতে পারে, যা বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ও চুক্তির ওপর নির্ভর করে। এই ক্ষুদ্র অঙ্কের অর্থ যখন আবার একাধিক স্তরে বিভক্ত হয়, তখন একজন শিল্পীর হাতে পৌঁছানো অর্থের পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য হয়ে দাঁড়ায়। উপরন্তু, চুক্তির দুর্বলতা, অস্পষ্ট শর্তাবলী এবং তথ্যের অভাবের কারণে অনেক শিল্পী তাদের গানের প্রকৃত স্ট্রিম সংখ্যা বা তাদের ন্যায্য হিস্যা সম্পর্কে জানতে পারেন না, যা তাদের অধিকার আদায়ের পথকে আরও কঠিন করে তোলে। এই প্র-রাটা মডেলের পরিবর্তে ‘ইউজার-সেন্ট্রিক’ মডেলের (যেখানে ব্যবহারকারী যে গানটি শুনবে, তার সাবস্ক্রিপশন ফি থেকে সরাসরি সেই শিল্পীকে অর্থ দেওয়া হয়) দাবি উঠলেও, বৃহৎ স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের নিজস্ব ব্যবসায়িক মডেলের কারণে তা গ্রহণ করতে নারাজ। এই জটিল এবং অস্বচ্ছ কাঠামো বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের শিল্পীদের জন্য আরও বেশি প্রতিকূল, যেখানে তাদের দর কষাকষির ক্ষমতা আন্তর্জাতিক লেবেল বা প্রভাবশালী মধ্যস্বত্বভোগীদের তুলনায় অত্যন্ত দুর্বল।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। একদিকে যেমন কপিরাইট আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং ডিজিটাল রাইটস ম্যানেজমেন্টের অভাব রয়েছে, অন্যদিকে তেমনি শিল্পীদের মধ্যে এই বিষয়ে সচেতনতার অভাব ও সম্মিলিত প্লাটফর্মের দুর্বলতা তাদের বঞ্চনার কারণ। দেশের অধিকাংশ শিল্পী এককভাবে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম বা রেকর্ড লেবেলগুলোর সাথে চুক্তিবদ্ধ হন, যেখানে তাদের পক্ষে ন্যায্য চুক্তি আদায় করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় তারা চুক্তিপত্র না পড়েই বা এর জটিল শর্তাবলী না বুঝেই স্বাক্ষর করেন, যার ফলস্বরূপ তাদের মেধা ও শ্রমের মূল্য যথাযথভাবে পরিশোধ করা হয় না। World Bank এবং ADB-এর বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার ডিজিটাল অর্থনীতিতে মেধাস্বত্বের সুরক্ষা এবং ন্যায্য রয়্যালটি নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশেও এই চ্যালেঞ্জের প্রতিফলন দেখা যায়, যেখানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রসারের সাথে সাথে রয়্যালটি বিতরণের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। এছাড়া, অবৈধ উপায়ে গান ডাউনলোড বা শেয়ার করার প্রবণতাও শিল্পীদের রয়্যালটি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। স্থানীয় স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোর তুলনায় কম রয়্যালটি প্রদান করে বলে অভিযোগ রয়েছে, যা শিল্পীদের জন্য আরও বড় উদ্বেগের কারণ। এই সামগ্রিক পরিস্থিতি কেবল শিল্পীদের অর্থনৈতিক সুরক্ষাই নয়, বরং নতুন প্রতিভাবানদের সঙ্গীত জগতে আসার আগ্রহকেও নিরুৎসাহিত করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সঙ্গীত শিল্পের সৃজনশীলতা ও গুণগত মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

এই সমস্যা কেবল বাংলাদেশের নয়, এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। আন্তর্জাতিকভাবেও শিল্পীরা স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর বিরুদ্ধে ন্যায্য রয়্যালটি না দেওয়ার অভিযোগ করছেন। বড় বড় রেকর্ড লেবেলগুলো তাদের প্রভাবশালী অবস্থান ব্যবহার করে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে তুলনামূলকভাবে ভালো চুক্তি আদায় করতে সক্ষম হলেও, স্বাধীন শিল্পী বা ছোট লেবেলগুলো এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের আর্থিক তথ্য এবং রয়্যালটি হিসাবের পদ্ধতিকে অত্যন্ত গোপনীয় রাখে, যা শিল্পী ও তাদের প্রতিনিধিদের পক্ষে নিরীক্ষা করা অসম্ভব করে তোলে। এই অস্বচ্ছতা রয়্যালটি বিতরণের ক্ষেত্রে কারচুপির সুযোগ তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু প্ল্যাটফর্ম ‘ফ্রড স্ট্রিম’ বা বট ব্যবহার করে স্ট্রিম সংখ্যা কৃত্রিমভাবে বৃদ্ধি করার অভিযোগও উঠেছে, যার ফলে প্রকৃত শিল্পীদের হিস্যা আরও কমে যায়। ADB-এর 'এশিয়া প্যাসিফিক ডিজিটাল ইকোনমি আউটলুক' প্রতিবেদনে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মেধাস্বত্ব সুরক্ষার গুরুত্ব এবং ন্যায্য আয়ের মডেলের প্রয়োজনীয়তা বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, ডিজিটাল ইকোনমির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে, সৃজনশীল খাতের কর্মীদের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে একটি সমন্বিত ও কার্যকর কৌশল প্রণয়ন করতে হবে, যা একদিকে যেমন শিল্পীদের অধিকার রক্ষা করবে, অন্যদিকে তেমনি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর সুস্থ বিকাশও নিশ্চিত করবে।

সূচক ২০২০ (বিলিয়ন USD) ২০২৩ (বিলিয়ন USD) বৃদ্ধি (%) শিল্পীর গড় রয়্যালটি (%)
বৈশ্বিক ডিজিটাল মিউজিক স্ট্রিমিং বাজার ১৩.৪ ২০.৬ ৫৩.৭% ১২-১৫%
রেকর্ড লেবেল/প্রকাশকদের অংশ - - - ৫০-৬০%
স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের অংশ - - - ১৫-২০%
বাংলাদেশের ডিজিটাল মিউজিক মার্কেটের অনুমিত বার্ষিক বৃদ্ধি ০.০৪ ০.০৭ ৭৫% ৮-১০%

উৎস: World Bank 'Digital Economy Report 2023', IFPI Global Music Report, বিভিন্ন শিল্প গবেষণা প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার-এর সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে ২০০০ সালের কপিরাইট আইন সংশোধন করে ডিজিটাল মেধাস্বত্বের জন্য সুনির্দিষ্ট বিধান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং একটি স্বাধীন 'ডিজিটাল রয়্যালটি বোর্ড' গঠন করতে হবে। এই বোর্ড স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর রয়্যালটি হিসাব নিরীক্ষা করবে, রয়্যালটি বিতরণের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে এবং শিল্পীদের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একটি কার্যকর প্রক্রিয়া স্থাপন করবে।
  • World Bank এবং ADB-এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় একটি 'স্বাধীন অডিট মেকানিজম' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা নিয়মিতভাবে সকল স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের আর্থিক লেনদেন এবং রয়্যালটি বন্টন প্রক্রিয়া নিরীক্ষা করবে। এই মেকানিজমের মাধ্যমে প্ল্যাটফর্মগুলোকে তাদের ডেটা ও রয়্যালটি হিসাবের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশে বাধ্য করা হবে, যাতে শিল্পীরা তাদের ন্যায্য হিস্যা সম্পর্কে অবগত হতে পারেন এবং প্রয়োজনে আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন।
  • শিল্পীদের সম্মিলিত দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ সরকার-এর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়কে একটি শক্তিশালী 'জাতীয় শিল্পী ইউনিয়ন/অ্যাসোসিয়েশন' গঠনে পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে। এই অ্যাসোসিয়েশনকে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে যৌথ চুক্তি সম্পাদনের আইনি ক্ষমতা প্রদান করতে হবে, যেখানে রয়্যালটি বন্টন, চুক্তির শর্তাবলী এবং স্বচ্ছতার বিষয়গুলো সম্মিলিতভাবে আলোচনা ও নির্ধারণ করা হবে, যাতে একক শিল্পীর বঞ্চনার সুযোগ কমে আসে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রকিবুল ইসলাম

রকিবুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি ও রয়্যালটি রাইটস। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nema komentara


News Card Generator