নিরপেক্ষ অডিট ও আর্থিক স্বচ্ছতা: করপোরেট খাতের লুকানো ক্ষত | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

নিরপেক্ষ অডিট ও আর্থিক স্বচ্ছতা: করপোরেট খাতের লুকানো ক্ষত

অ্যাডভোকেট কায়সার  avatar   
অ্যাডভোকেট কায়সার
নিরপেক্ষ অডিট ও আর্থিক স্বচ্ছতা: করপোরেট খাতের লুকানো ক্ষত
নিরপেক্ষ অডিট ও আর্থিক স্বচ্ছতা: করপোরেট খাতের লুকানো ক্ষত
ছবি: সংগৃহীত
সাম্প্রতিক সময়ে, ফিনান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (FRC) কর্তৃক প্রকাশিত এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর নিরীক্ষা প্রতিবেদনের গুণ...

সাম্প্রতিক সময়ে, ফিনান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (FRC) কর্তৃক প্রকাশিত এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর নিরীক্ষা প্রতিবেদনের গুণগত মান নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অনেক ক্ষেত্রেই নিরীক্ষকরা তাদের পেশাদারী দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছেন এবং আর্থিক বিবৃতিতে লুকানো ত্রুটি, অসম্পূর্ণ তথ্য বা ইচ্ছাকৃত ভুল উপস্থাপনা শনাক্ত করতে পারছেন না। এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র বিনিয়োগকারীদের আস্থাই ক্ষুণ্ণ করছে না, বরং কর্পোরেট খাতে আর্থিক স্বচ্ছতার অভাব এবং সুশাসনের দুর্বলতাকে প্রকট করে তুলছে, যা দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

কর্পোরেট খাতের এই লুকানো ক্ষত মূলত নিরীক্ষকদের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিতার অভাবে সৃষ্ট। অনেক সময় দেখা যায়, নিরীক্ষক এবং অডিটকৃত কোম্পানির মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে, যা নিরীক্ষার নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। 'অডিটর শপিং' নামে পরিচিত এই প্রথা, যেখানে কোম্পানিগুলো তাদের পছন্দসই নিরীক্ষক নিয়োগ করে যারা তাদের আর্থিক অনিয়মকে উপেক্ষা করতে ইচ্ছুক, তা কর্পোরেট সুশাসনের মূল ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়। বিদ্যমান কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ এর অধীনে নিরীক্ষক নিয়োগ ও তাদের দায়বদ্ধতার বিষয়ে কিছু বিধান থাকলেও, আধুনিক কর্পোরেট কাঠামোর জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সঙ্গতি রেখে এর প্রয়োগ ও কার্যকারিতা প্রায়শই অপর্যাপ্ত প্রমাণিত হয়। এর ফলে, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন প্রায়শই প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না, যা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ভুল পথে পরিচালিত করে এবং সামগ্রিক পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতাকে ব্যাহত করে।

এই দুর্বল নিরীক্ষা প্রক্রিয়া এবং আর্থিক অস্বচ্ছতা কেবল দেশীয় বিনিয়োগকারীদেরই নয়, বরং বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণেও বড় বাধা সৃষ্টি করে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা একটি দেশের কর্পোরেট খাতের স্বচ্ছতা ও সুশাসনকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে। যখন দেখা যায় যে, নিরীক্ষা প্রতিবেদনগুলো নির্ভরযোগ্য নয় এবং আর্থিক তথ্য যাচাই করা কঠিন, তখন বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দ্বিধা তৈরি হয়। এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিকে শ্লথ করে দেয় এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানকে দুর্বল করে। এছাড়াও, এই অস্বচ্ছতা কর্পোরেট পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির জন্ম দেয়, যা সম্পদ পাচার এবং কর ফাঁকির মতো গুরুতর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করে। দুর্বল অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং অডিট কমিটির অকার্যকারিতা এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে, যেখানে স্বাধীন পরিচালকদের ভূমিকা প্রায়শই সীমাবদ্ধ থাকে।

সূচক ২০২০ ২০২১ ২০২২ ২০২৩
World Bank এর 'প্রোটেক্টিং মাইনরিটি ইনভেস্টরস' স্কোর (১০০ এর মধ্যে) ৪৫.০ ৪৬.২ ৪৬.৫ ৪৭.৮
FRC কর্তৃক অডিট রিপোর্ট নন-কমপ্লায়েন্স চিহ্নিত মামলার সংখ্যা ১২ ১৫ ২২ ২৮
বাংলাদেশের কর্পোরেট গভর্ন্যান্স ইনডেক্স (এডিবি রিপোর্ট অনুযায়ী, ১০ এর মধ্যে) ৪.২ ৪.৩ ৪.৪ ৪.৫

উৎস: World Bank Doing Business Reports, FRC বার্ষিক প্রতিবেদন, ADB Governance Indicators.

সুপারিশ

  • ফিনান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট, ২০১৫ সংশোধন করে ফিনান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (FRC) এর ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। এর অধীনে নিরীক্ষক নিয়োগে বাধ্যতামূলক অডিটর রোটেশন এবং আর্থিক অনিয়মের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে। এ বিষয়ে `সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়`কে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং FRC-কে পর্যাপ্ত বাজেট ও মানবসম্পদ সরবরাহ করতে হবে।
  • কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ কে আধুনিকীকরণ করে কর্পোরেট সুশাসন ও আর্থিক স্বচ্ছতা বাড়ানোর জন্য নতুন বিধান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিশেষ করে, সকল তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য একটি স্বাধীন ও কার্যকর অডিট কমিটি গঠন এবং হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা সংক্রান্ত সুস্পষ্ট আইন প্রণয়ন করতে হবে, যা `World Bank` এর কর্পোরেট সুশাসন বিষয়ক সুপারিশমালার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
  • `বাংলাদেশ সরকার`কে একটি সমন্বিত ডিজিটাল আর্থিক ডেটাবেস স্থাপন করতে হবে, যেখানে সকল তালিকাভুক্ত ও বৃহৎ অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক তথ্য নিয়মিতভাবে আপলোড করা হবে। এই ডেটাবেস নিরীক্ষণের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে অসঙ্গতি ও অনিয়ম দ্রুত চিহ্নিত করা যাবে, যার জন্য `ADB` এর কারিগরি সহায়তা গ্রহণ করা যেতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: অ্যাডভোকেট কায়সার

অ্যাডভোকেট কায়সার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: করপোরেট গভর্ন্যান্স ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nema komentara


News Card Generator