কেলেঙ্কারি ও দায়মুক্তি: করপোরেট সুশাসনে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীরবতার আখ্যান | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কেলেঙ্কারি ও দায়মুক্তি: করপোরেট সুশাসনে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীরবতার আখ্যান

অ্যাডভোকেট কায়সার  avatar   
অ্যাডভোকেট কায়সার
কেলেঙ্কারি ও দায়মুক্তি: করপোরেট সুশাসনে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীরবতার আখ্যান
কেলেঙ্কারি ও দায়মুক্তি: করপোরেট সুশাসনে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীরবতার আখ্যান
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত 'মেঘনা সিমেন্ট লিমিটেড'-এর (একটি কাল্পনিক নাম, কিন্তু পরিস্থিতি বাস্তবসম্মত) আর্থিক হিসাবে ব্যাপক অনিয়ম এবং জালিয়াতির অভ...

সম্প্রতি, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত 'মেঘনা সিমেন্ট লিমিটেড'-এর (একটি কাল্পনিক নাম, কিন্তু পরিস্থিতি বাস্তবসম্মত) আর্থিক হিসাবে ব্যাপক অনিয়ম এবং জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে, যা প্রায় ৩০০ কোটি টাকার পাবলিক ফান্ডের অপব্যবহারের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই ঘটনায় কোম্পানির অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিটি ও স্বাধীন পরিচালকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কারণ অভিযোগ ওঠার আগে তাদের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এর চাইতেও উদ্বেগজনক হলো, ঘটনাটি জনসমক্ষে আসার পরও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এবং জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস (RJSC)-এর মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর প্রাথমিক নীরবতা। এই নীরবতা কেবল 'মেঘনা সিমেন্ট'-এর বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, বরং সামগ্রিকভাবে করপোরেট সুশাসন এবং জবাবদিহিতার প্রতি জনগণের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বাংলাদেশের করপোরেট অঙ্গনে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা ও দায়মুক্তির এক দীর্ঘ আখ্যানের সাম্প্রতিকতম সংযোজন, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর এই নীরবতার মূলে রয়েছে বহুবিধ প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং আইনি সীমাবদ্ধতা। অনেক সময় দেখা যায়, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কাছে পর্যাপ্ত জনবল, কারিগরি দক্ষতা এবং বিশেষায়িত তদন্তের ক্ষমতা নেই। উদাহরণস্বরূপ, জটিল আর্থিক জালিয়াতি বা করপোরেট অনিয়ম তদন্তের জন্য ফরেনসিক অডিটর ও আর্থিক বিশ্লেষকদের মতো বিশেষজ্ঞ জনবলের অভাব প্রকট। উপরন্তু, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর স্বাধীনতায় প্রায়শই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা প্রভাবশালী মহলের চাপ পরিলক্ষিত হয়, যা তাদের নিরপেক্ষভাবে কাজ করার ক্ষমতাকে খর্ব করে। কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর মতো আইনগুলো আধুনিক করপোরেট অপরাধ দমনের জন্য অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়, এবং আইন প্রয়োগে দীর্ঘসূত্রিতা ও বিচার প্রক্রিয়ায় জটিলতা অপরাধীদের দায়মুক্তির সুযোগ করে দেয়। এর ফলে, যখন কোনো কোম্পানি গুরুতর অনিয়মে জড়িত হয়, তখন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কেবল নোটিশ প্রদান বা ছোটখাটো জরিমানা আরোপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, যা অপরাধের মাত্রার তুলনায় নগণ্য এবং কার্যত কোনো প্রতিরোধমূলক প্রভাব ফেলে না। এই পরিস্থিতি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এই বার্তা দেয় যে, করপোরেট অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, যা দীর্ঘমেয়াদে বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা এবং স্বচ্ছতাকে বাধাগ্রস্ত করে।

এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ পরিবেশকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করছে। বিশ্ব ব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে করপোরেট সুশাসন এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর উন্নতির উপর জোর দিয়ে আসছে। তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দুর্বল করপোরেট সুশাসন দেশের বিনিয়োগযোগ্যতা এবং বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণে অন্যতম প্রধান বাধা। যখন একটি দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তখন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সেই বাজারে বিনিয়োগ করতে দ্বিধা বোধ করে, কারণ তারা তাদের বিনিয়োগের নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার প্রাপ্তির বিষয়ে সন্দিহান থাকে। এটি কেবল পুঁজি প্রবাহকেই নয়, বরং প্রযুক্তি হস্তান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকেও সীমিত করে। বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বেসরকারি খাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য, কিন্তু এই খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে অবশ্যই একটি শক্তিশালী, স্বাধীন এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো অপরিহার্য, যা জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতাকে অগ্রাধিকার দেবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তাদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি, যাতে করপোরেট অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়।

বছর প্রতিবেদিত করপোরেট সুশাসন লঙ্ঘন নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত শুরু জরিমানা/শাস্তি আরোপ জরিমানার মোট পরিমাণ (কোটি টাকা)
২০২০ ১১২ ৬৩ ১৮ ১২.৫
২০২১ ১৪৫ ৭৮ ২২ ১৪.৮
২০২২ ১৭৮ ৯৫ ২৭ ১৮.২
২০২৩ ২০৫ ১১০ ৩২ ২১.৫

উৎস: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) বার্ষিক প্রতিবেদন, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB) গবেষণা। (কাল্পনিক তথ্য, কিন্তু পরিস্থিতি বাস্তবসম্মত)

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC)-এর কার্যকারিতা বাড়াতে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে কমিশনকে ফরেনসিক অডিট ও ডিজিটাল ডেটা বিশ্লেষণের জন্য পর্যাপ্ত ক্ষমতা ও বাজেট প্রদান করতে হবে। এর পাশাপাশি, BSEC-এ কমপক্ষে ৩০ জন বিশেষায়িত ফরেনসিক অডিটর এবং আর্থিক বিশ্লেষক নিয়োগের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
  • কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ এবং বিএসইসি করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড, ২০১৮-এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষত স্বাধীন পরিচালক এবং নিরীক্ষকদের জবাবদিহিতা জোরদার করার ক্ষেত্রে। অনিয়মের ক্ষেত্রে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স বাতিলের বিধান সংযোজন এবং স্বাধীন পরিচালকদের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ ও দায়বদ্ধতা কাঠামো তৈরি করতে হবে, যার বাস্তবায়ন তদারকির দায়িত্ব RJSC-এর উপর অর্পণ করতে হবে।
  • করপোরেট জালিয়াতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (ACC), বাংলাদেশ ব্যাংক, RJSC এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। এই টাস্কফোর্সকে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক একটি নির্দিষ্ট গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আইনি ভিত্তি প্রদান করতে হবে, যাতে তারা জটিল করপোরেট অপরাধের তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় দ্রুত ও কার্যকর সমন্বয় সাধন করতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: অ্যাডভোকেট কায়সার

অ্যাডভোকেট কায়সার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: করপোরেট গভর্ন্যান্স ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No comments found


News Card Generator