৫জি স্বপ্ন ও বাস্তবতা: অব্যবহৃত স্পেকট্রাম ও বিনিয়োগের ধাঁধা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

৫জি স্বপ্ন ও বাস্তবতা: অব্যবহৃত স্পেকট্রাম ও বিনিয়োগের ধাঁধা

কামরুল হাসান  avatar   
কামরুল হাসান
৫জি স্বপ্ন ও বাস্তবতা: অব্যবহৃত স্পেকট্রাম ও বিনিয়োগের ধাঁধা
৫জি স্বপ্ন ও বাস্তবতা: অব্যবহৃত স্পেকট্রাম ও বিনিয়োগের ধাঁধা
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) কর্তৃক ২০২২ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত ৫জি স্পেকট্রাম নিলামের দিকে তাকালে একটি স্পষ্ট চিত্র ভেসে ওঠে: উচ্চাশা এবং...

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) কর্তৃক ২০২২ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত ৫জি স্পেকট্রাম নিলামের দিকে তাকালে একটি স্পষ্ট চিত্র ভেসে ওঠে: উচ্চাশা এবং বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর ফারাক। সেই নিলামে, ২.৩ গিগাহার্টজ (Ghz) ব্যান্ডের ১২০ মেগাহার্টজ (MHz) এবং ২.৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ডের ১০০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম বিক্রি হলেও, উল্লেখযোগ্য অংশ অব্যবহৃতই থেকে যায়। বিশেষত, ২৬০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের অধিকাংশ স্পেকট্রাম, যা ৫জি সেবার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, টেলিযোগাযোগ অপারেটরদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেনি। এই অব্যবহৃত স্পেকট্রাম কেবল একটি প্রযুক্তিগত শূন্যতা নয়, বরং এটি দেশের ডিজিটাল রূপান্তরের পথে একটি বড় বিনিয়োগের ধাঁধা এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির ইঙ্গিত বহন করে। যখন 'স্মার্ট বাংলাদেশ' গড়ার লক্ষ্য নিয়ে দেশ এগিয়ে চলেছে, তখন এমন একটি মৌলিক অবকাঠামো, যা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের মেরুদণ্ড, তার পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো না গেলে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে বাধ্য।

অব্যবহৃত স্পেকট্রামের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ বিদ্যমান। প্রথমত, স্পেকট্রামের উচ্চ রিজার্ভ মূল্য একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করেছে। অপারেটররা মনে করছেন, এই দামে স্পেকট্রাম কিনে তা থেকে দ্রুত বিনিয়োগ ফেরত আনা কঠিন। ৫জি নেটওয়ার্ক স্থাপন একটি বিশাল পুঁজি বিনিয়োগের ব্যাপার, যেখানে শুধু স্পেকট্রাম কেনাই শেষ নয়, এর সঙ্গে রয়েছে নতুন রেডিও বেজ স্টেশন স্থাপন, ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ এবং কোর নেটওয়ার্ক আপগ্রেডেশন। দ্বিতীয়ত, ৫জি সেবার জন্য একটি স্পষ্ট এবং টেকসই ব্যবসায়িক মডেলের অভাব রয়েছে। সাধারণ গ্রাহক পর্যায়ে ৫জি-এর চাহিদা এখনও সীমিত, কারণ বিদ্যমান ৪জি নেটওয়ার্ক দৈনন্দিন ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকাংশ চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। শিল্প-কারখানা, স্মার্ট সিটি, বা স্বায়ত্তশাসিত যানবাহনের মতো উচ্চ ব্যান্ডউইথ ও লো-ল্যাটেন্সির অ্যাপ্লিকেশনগুলো এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, যা অপারেটরদের ৫জি-তে ব্যাপক বিনিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত প্রেরণা যোগাতে পারছে না। উপরন্তু, দেশের ফাইবার অপটিক অবকাঠামো এখনও ৫জি-এর পূর্ণ সম্ভাবনাকে সমর্থন করার জন্য যথেষ্ট মজবুত নয়, যা অপারেটরদের জন্য অতিরিক্ত ব্যয় ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

৫জি-তে বিনিয়োগের এই ধাঁধা কেবলমাত্র স্পেকট্রামের দাম বা ব্যবসায়িক মডেলের অভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে সামগ্রিক নিয়ন্ত্রক পরিবেশ এবং নীতি সহায়তা। টেলিকম সরঞ্জাম আমদানিতে উচ্চ শুল্ক ও কর, এবং ফাইবার অপটিক কেবল স্থাপনের জন্য 'রাইট-অব-ওয়ে' (Right-of-Way) প্রাপ্তির জটিলতা বিনিয়োগের পথকে আরও বন্ধুর করে তুলেছে। যখন অন্যান্য দেশ তাদের ৫জি ইকোসিস্টেমকে শক্তিশালী করতে নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনা দিচ্ছে, তখন বাংলাদেশে এই ধরনের সমন্বিত উদ্যোগের অভাব লক্ষণীয়। উদাহরণস্বরূপ, বিটিআরসি-এর মাধ্যমে স্পেকট্রাম বরাদ্দ প্রক্রিয়া আরও সহজ করা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) 'স্মার্ট বাংলাদেশ' ভিশন বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিলেও, ৫জি-এর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ এবং শিল্প-ভিত্তিক ব্যবহারের ক্ষেত্র চিহ্নিতকরণে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) এর মতো সংস্থাগুলো স্থানীয় অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্টে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারলেও, তাদের জন্য ৫জি সক্ষমতার অ্যাক্সেস নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

৫জি-এর পূর্ণ সুফল পেতে হলে কেবল অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না, এর ব্যবহারিক ক্ষেত্রগুলোকেও বিকশিত করতে হবে। এটুআই (a2i) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি সেবায় উদ্ভাবনী সমাধান নিয়ে কাজ করছে, যা ৫জি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আরও কার্যকর হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, রিয়েল-টাইম ডেটা অ্যানালিটিক্স, দূরবর্তী স্বাস্থ্যসেবা, স্মার্ট কৃষি এবং শিক্ষা খাতে ৫জি-এর ব্যবহারিক প্রয়োগের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) তাদের হাই-টেক পার্কগুলোতে ৫জি-ভিত্তিক উদ্ভাবনী স্টার্টআপ এবং গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত কৌশল, যেখানে টেলিকম অপারেটর, প্রযুক্তি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সরকার সম্মিলিতভাবে কাজ করবে। অব্যবহৃত স্পেকট্রামকে শুধু আর্থিক উৎস হিসেবে না দেখে, বরং দেশের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ গড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে এর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক।

স্পেকট্রাম ব্যান্ড (MHz) মোট স্পেকট্রাম (MHz) অপারেটরদের কাছে বিক্রি (MHz) অব্যবহৃত/অবিক্রিত স্পেকট্রাম (MHz) মন্তব্য
2300 (2.3 GHz) 120 120 0 সম্পূর্ণ বিক্রি হয়েছে
2600 (2.6 GHz) 100 60 40 উল্লেখযোগ্য অংশ অব্যবহৃত
3500 (3.5 GHz) 200 0 200 কোনো অপারেটর কেনেনি

উৎস: বিটিআরসি, ৫জি স্পেকট্রাম নিলাম ২০২২ এর ফলাফল

সুপারিশ

  • বিটিআরসি-কে ৫জি স্পেকট্রামের রিজার্ভ মূল্য পুনর্বিবেচনা করে অপারেটরদের জন্য আরও আকর্ষণীয় এবং নমনীয় মূল্যের প্রস্তাব দিতে হবে, প্রয়োজনে দীর্ঘমেয়াদী কিস্তি সুবিধা বা আঞ্চলিক লাইসেন্সিংয়ের মতো মডেল বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সাথে, শিল্প-ভিত্তিক 'প্রাইভেট ৫জি নেটওয়ার্ক' স্থাপনের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করে অব্যবহৃত স্পেকট্রামের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে।
  • তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) এবং এটুআই (a2i) কে যৌথভাবে একটি জাতীয় ৫জি অ্যাপ্লিকেশন ইনোভেশন হাব প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে স্থানীয় স্টার্টআপ এবং ডেভেলপারদের জন্য ৫জি টেস্টিং ল্যাব এবং ডেটা সেন্টার সুবিধা থাকবে। BASIS এর সহযোগিতায়, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষি খাতে ৫জি-ভিত্তিক পাইলট প্রকল্প চালু করে নির্দিষ্ট ব্যবহারের ক্ষেত্র তৈরি এবং স্থানীয় উদ্ভাবকদের উৎসাহিত করতে হবে।
  • বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) কে তাদের হাই-টেক পার্কগুলোতে ৫জি ইকোসিস্টেম বিকাশের জন্য বিশেষ তহবিল বরাদ্দ এবং ফাইবার অপটিক অবকাঠামো স্থাপনে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় করে ৫জি সরঞ্জাম আমদানি এবং ৫জি-সংশ্লিষ্ট গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) কার্যক্রমে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট কর রেয়াত এবং শুল্ক ছাড়ের মতো প্রণোদনা ঘোষণা করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: কামরুল হাসান

কামরুল হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: টেলিকম, ৫জি ও ইন্টারনেট অবকাঠামো। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Inga kommentarer hittades


News Card Generator