বিংশ শতাব্দীর নারী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান স্থপতি এবং প্রভাবশালী সাংবাদিক গ্লোরিয়া স্টাইনেম ৯২ বছর বয়সে নিউ ইয়র্ক সিটিতে নিজ বাসভবনে শান্তিপূর্ণভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন। তার প্রতিষ্ঠিত ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বিশ্বব্যাপী লিঙ্গবৈষম্য নিরসন, প্রজনন অধিকার এবং নারীদের সামাজিক অবস্থানের পরিবর্তনের লক্ষ্যে আপসহীন লড়াই চালিয়ে গেছেন। সত্তরের দশকে সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা স্টাইনেম কেবল একজন লেখক বা সম্পাদক হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নারীদের কণ্ঠস্বরকে মূলধারার আলোচনায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার মৃত্যুতে বিশ্বজুড়ে নারী অধিকার কর্মীদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং ইতিহাসবিদরা তাকে আধুনিক নারীবাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে অভিহিত করছেন।
স্টাইনেমের কর্মজীবনের অন্যতম মাইলফলক হলো ১৯৭২ সালে মিস ম্যাগাজিন প্রতিষ্ঠা, যা তৎকালীন রক্ষণশীল সংবাদপত্রের ভিড়ে নারীদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার প্রথম প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিতি পায়। এই ম্যাগাজিনের মাধ্যমে তিনি গৃহস্থালি গণ্ডি এবং সৌন্দর্য শিল্পের আরোপিত বাধ্যবাধকতার বাইরে নারীদের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার বিষয়গুলো জনসমক্ষে নিয়ে আসেন। ভুক্তভোগী নারীদের অধিকার আদায়ে তিনি সবসময় সোচ্চার ছিলেন এবং সত্তরের দশকে প্রজনন অধিকারের পক্ষে তার অবস্থান তৎকালীন মার্কিন সমাজব্যবস্থায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। বিশেষ করে রো বনাম ওয়েড মামলার রায়ের মাধ্যমে গর্ভপাতের সাংবিধানিক অধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি যে জোরালো জনমত তৈরি করেছিলেন, তা আজও মার্কিন রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে এই অধিকারের সুরক্ষা ভেঙে পড়তে দেখা তার জন্য ছিল একটি গভীর যন্ত্রণার বিষয়, যা তার শেষ জীবনের লেখায় এবং বক্তব্যে বারবার ফুটে উঠেছিল।
গ্লোরিয়া স্টাইনেমের প্রয়াণের পর বিশ্বজুড়ে নারী অধিকার সংগঠনগুলো তার অবদানের গভীর স্বীকৃতি প্রদান করছে। তার সহপ্রতিষ্ঠিত উইমেন'স অ্যাকশন অ্যালায়েন্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আজও লিঙ্গসমতার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যদিও তার মৃত্যুর পর রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাচ্ছে, তবে অধিকাংশ মানবাধিকার কর্মী এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন যে, স্টাইনেম যে পথে লড়াই শুরু করেছিলেন তা বর্তমান সময়ে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। প্রশাসনিক পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং আইনি বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে তার যে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ছিল, তা বাস্তবায়নের জন্য আজও বিশ্বব্যাপী কঠোর নজরদারি এবং আইনি সংস্কারের দাবি জোরালো হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের উচিত তার রেখে যাওয়া আদর্শের ওপর ভিত্তি করে নারীদের নিরাপত্তা এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আরও বেশি সচেষ্ট হওয়া।
গ্লোরিয়া স্টাইনেমের বিদায় কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়, বরং একটি যুগের অবসান। তার চিন্তাধারা এবং লিঙ্গসমতা বিষয়ক সাহসী অবস্থান আগামী প্রজন্মের নারী অধিকার কর্মীদের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করে দিয়ে গেছে। ভবিষ্যতে পরিবহন থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে নারীদের নিরাপত্তা এবং সমঅধিকারের লড়াইয়ে স্টাইনেমের দর্শন এক আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে। বর্তমান বিশ্ব যখন নারী অধিকারের প্রশ্নে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে, তখন তার প্রয়াণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সমতার পথে লড়াই এখনো অসম্পূর্ণ। তার এই শূন্যতা পূরণ করা কঠিন হলেও, তার দেখানো পথ ধরে এগিয়ে যাওয়াই হবে তার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন।