লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক তৎপরতা এক নতুন ও উদ্বেগজনক মোড় নিয়েছে, যা গত কয়েক সপ্তাহে ইকুয়েডরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অত্যন্ত গোপনে পরিচালিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইকুয়েডরের জলসীমায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও মেরিন সেনার উপস্থিতি এবং গ্রিন বেরেট বাহিনীর মাধ্যমে স্থানীয় সেনাদের সাথে যৌথ অভিযানের ঘটনা এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে মার্কিন আগ্রাসনের নতুন সংকেত দিচ্ছে। গত বছর ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন পশ্চিমা গোলার্ধে সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার যে অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন, তা এখন মাদক কার্টেল দমনের নাম করে একটি সুশৃঙ্খল সামরিক নীতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিয়ে নীরব থাকলেও ইকুয়েডরীয় কর্মকর্তাদের তথ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এই অঞ্চলটিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর অভিযানের প্রাথমিক ধাপ মাত্র যা আগামী সপ্তাহগুলোতে আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভৌগোলিক নিরাপত্তা ও মাদক পাচার দমনের আড়ালে এই সামরিক তৎপরতা স্থানীয় জনগণের মধ্যে গভীর শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। কলম্বিয়া সীমান্তের এসমেরালদাস প্রদেশে গ্রিন বেরেটদের উপস্থিতি এবং মার্কিন ডেস্ট্রয়ারের মাধ্যমে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে পরিচালিত সামরিক মহড়া স্থানীয় সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভুক্তভোগী ও পর্যবেক্ষকদের মতে, মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে মার্কিন বাহিনী যেভাবে নির্বিচারে বিদেশি জলসীমায় প্রবেশ করছে এবং সন্দেহভাজনদের ওপর হামলা চালাচ্ছে, তাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে, ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক কার্টেলগুলোকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করার ফলে মার্কিন বাহিনীর জন্য এই অঞ্চলে সামরিক শক্তির পূর্ণ প্রয়োগ ও বিচারবহির্ভূত পদক্ষেপ নেওয়ার একটি আইনি ফাঁকফোকর তৈরি হয়েছে, যা স্থানীয় নাগরিকদের জন্য এক অনিরাপদ পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও প্রশাসনের গৃহীত পদক্ষেপ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ওয়াশিংটন এখন আর সরাসরি বড় ধরনের যুদ্ধের পরিবর্তে মিত্র সরকারগুলোর সাথে জোটবদ্ধ হয়ে সামরিক হস্তক্ষেপের কৌশল বেছে নিয়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ কর্তৃক ঘোষিত শিল্ড অফ দ্য আমেরিকাস বা আমেরিকাস কাউন্টার কার্টেল কোয়ালিশন মূলত মার্কিন স্বার্থ রক্ষার একটি নতুন হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। সাউথকমের মাধ্যমে পরিচালিত এই জোটটি এখন জয়েন্ট টাস্ক ফোর্স ওয়েস্টার্ন হেমিস্ফিয়ারের অধীনে কাজ করছে, যা ভেনিজুয়েলা ও ইকুয়েডরের মতো দেশগুলোতে মার্কিন প্রভাব বিস্তারের পথ সুগম করেছে। প্রশাসন দাবি করছে যে তারা নার্কো-সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কগুলো ধ্বংস করতেই এই পদক্ষেপ নিচ্ছে, তবে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সাথে চলমান অমিমাংসিত যুদ্ধে মার্কিন সামরিক শক্তির যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা পুষিয়ে নিতেই লাতিন আমেরিকায় এমন ছোট ও দ্রুততর সামরিক অভিযানের দিকে ঝুঁকছে ট্রাম্প প্রশাসন।
পরিশেষে, লাতিন আমেরিকায় ট্রাম্প প্রশাসনের এই বর্ধিত সামরিক পদক্ষেপ কেবল মাদকবিরোধী অভিযান নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ যা এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকিতে ফেলছে। একদিকে ইরান যুদ্ধের ব্যর্থতা থেকে মনোযোগ সরানোর চেষ্টা, অন্যদিকে নিজের নিয়ন্ত্রিত সামরিক টাস্ক ফোর্সের মাধ্যমে এই গোলার্ধে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উচ্চাকাঙ্ক্ষা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এক অস্থিরতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। যদি এই সামরিক দুঃসাহসিক অভিযান ইকুয়েডর থেকে শুরু করে অন্যান্য দেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা কেবল মাদক পাচার রোধে নয়, বরং পুরো লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক মানচিত্রকে একটি রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যার দায়ভার শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই বর্তাবে।