জলবায়ু তহবিল ও পরিবেশ প্রকল্পে ভয়াবহ দুর্নীতি: বিপন্ন বাংলাদেশ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জলবায়ু তহবিল ও পরিবেশ প্রকল্পে ভয়াবহ দুর্নীতি: বিপন্ন বাংলাদেশ

ওয়াসিফ ইকবাল  avatar   
ওয়াসিফ ইকবাল
জলবায়ু তহবিল ও পরিবেশ প্রকল্পে ভয়াবহ দুর্নীতি: বিপন্ন বাংলাদেশ
জলবায়ু তহবিল ও পরিবেশ প্রকল্পে ভয়াবহ দুর্নীতি: বিপন্ন বাংলাদেশ
ছবি: সংগৃহীত
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশ দূষণের মতো বহুমুখী চ্যালেঞ...

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশ দূষণের মতো বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশি-বিদেশি তহবিলের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। কিন্তু সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, জলবায়ু তহবিল এবং পরিবেশ প্রকল্পগুলোতে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে, যা দেশের পরিবেশ সুরক্ষাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। বৈশ্বিক পরিবেশ সূচকে বাংলাদেশের তলানিতে অবস্থান (১৭৭টি দেশের মধ্যে ১৭৫তম) এই ভয়াবহ চিত্রকেই তুলে ধরে।

বিশেষ করে, বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড (বিসিসিটিএফ)-এর অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলোতে দুর্নীতির চিত্র উদ্বেগজনক। টিআইবি-র ২০২৫ সালের নভেম্বরের এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিসিসিটিএফ-এর অধীনে অনুমোদিত ৮৯১টি প্রকল্পে মোট ৩ হাজার ৮৯৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল, যার মধ্যে প্রায় ২ হাজার ১১০ কোটি টাকা (মোট বরাদ্দের ৫৪.১৮ শতাংশ) অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ বা অপচয় করা হয়েছে। এই দুর্নীতির ক্ষেত্রগুলো ছিল প্রকল্প অনুমোদনে ঘুষ ও অবৈধ লেনদেন (১৭৫ কোটি টাকা), ঠিকাদার নিয়োগে অনিয়ম (৬০০ কোটি টাকা) এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ে অর্থ আত্মসাৎ (১ হাজার ২৮০ কোটি টাকা)। এমনকি তদারকি পর্যায়েও ৫৪ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। টিআইবি আরও উল্লেখ করেছে যে, এই দুর্নীতি রাজনৈতিক যোগসাজশে একটি বিশেষ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে বোর্ডের সদস্য, প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল এবং বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তারা জড়িত। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই এমন অনেক প্রকল্পেও (যেমন: সড়কবাতি স্থাপন, পার্ক তৈরি, পুকুরের ঘাট বাঁধানো) এই তহবিলের অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। এমনকি পরিবেশ সচেতনতার জন্য কেনা বাসও অব্যবহৃত অবস্থায় নষ্ট হচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরও দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে মুক্ত নয়। টিআইবি-র ২০২২ সালের জানুয়ারির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবেশ অধিদপ্তরে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদান ও নবায়নের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়। জরিপে দেখা গেছে, ৬৬ শতাংশ শিল্পকারখানাকে পরিবেশগত ছাড়পত্র পেতে ৩৬ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৮ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত অবৈধ আর্থিক লেনদেন করতে হয়। ৫৭ শতাংশ শিল্পকারখানা কোনো প্রকার পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা ছাড়াই ছাড়পত্র পেয়েছে, যা বাধ্যতামূলক। দূষণকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে অধিদপ্তরের একশ্রেণির কর্মকর্তার যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে, যার ফলে অকার্যকর বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) থাকা সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। 'নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ' প্রকল্পের অধীনে কর্মকর্তাদের অযৌক্তিক বিদেশ ভ্রমণ বাবদ অর্থ অপচয়ের ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে একই কর্মকর্তা ১০ বছরে ১০ বার পর্যন্ত বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। দুদকও পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মিত আর্থিক লেনদেন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে গরমিলের সুনির্দিষ্ট উৎস চিহ্নিত করেছে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে ২০০৯ সালে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট তহবিল গঠন করে এবং ২০১০ সালে 'জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট আইন' প্রণয়ন করে। এছাড়াও, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এবং এর সংশোধনীগুলো (যেমন ২০১০) পরিবেশ সুরক্ষায় আইনি কাঠামো প্রদান করে। তবে, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং তদারকির অভাবে এই আইনগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা 'বাংলাদেশ জলবায়ু ও উন্নয়ন প্ল্যাটফর্ম' (বিসিডিপি) নামে প্রায় ৮০০ কোটি মার্কিন ডলারের একটি নতুন তহবিল গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থায়ন যখন আসছে, তখন এর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা আরও জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়ন এখন এক ধরনের ঋণফাঁদে পরিণত হচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশ 'উচ্চ ঝুঁকির' তালিকায় রয়েছে।

এই সামগ্রিক পরিস্থিতি দেশের পরিবেশগত সুরক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গৃহীত পদক্ষেপগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশ ক্রমাগত পরিবেশগত ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের লাখ লাখ মানুষ বাস্তুহারা হচ্ছে এবং আগামী কয়েক বছরে তিন থেকে চার কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকিতে রয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে দেশের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

সুপারিশ: জলবায়ু তহবিল ও পরিবেশ প্রকল্পগুলোতে সুশাসন নিশ্চিত করতে অবিলম্বে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী অডিট কমিটি গঠন করা উচিত, যার সদস্যরা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকবেন এবং তাদের প্রতিবেদন নিয়মিত জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে। বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড (বিসিসিটিএফ) এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের সকল প্রকল্পের আর্থিক ও বাস্তবায়নগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হোক। দুর্নীতিতে জড়িত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা এবং আইনি কাঠামোর দুর্বলতা দূর করে কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা আবশ্যক। এছাড়া, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের প্রকল্প পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত করে জবাবদিহিতা বাড়ানো প্রয়োজন।


🔎 অনুসন্ধানে: ওয়াসিফ ইকবাল

ওয়াসিফ ইকবাল, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: জলবায়ু তহবিল ও পরিবেশ প্রকল্প অডিট।

कोई टिप्पणी नहीं मिली


News Card Generator