প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) বনাম সেকেন্ডারি বাজার: দরপতনের নেপথ্য কারণ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) বনাম সেকেন্ডারি বাজার: দরপতনের নেপথ্য কারণ

তানভীর আহমেদ  avatar   
তানভীর আহমেদ
প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) বনাম সেকেন্ডারি বাজার: দরপতনের নেপথ্য কারণ
প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) বনাম সেকেন্ডারি বাজার: দরপতনের নেপথ্য কারণ
ছবি: সংগৃহীত
গত সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স-এর আকস্মিক পতন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আবারও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই পতন কেবল একটি সংখ্যাগত হ্রাস...

গত সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স-এর আকস্মিক পতন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আবারও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই পতন কেবল একটি সংখ্যাগত হ্রাস নয়, বরং পুঁজিবাজারের অন্তর্নিহিত দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। বিশেষ করে, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) এবং সেকেন্ডারি বাজারের মধ্যে বিদ্যমান ভারসাম্যহীনতা এই দরপতনের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি এবং পুঁজি সংগ্রহের প্রক্রিয়া যেখানে পুঁজিবাজারের প্রাণশক্তি, সেখানে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি যেন সেকেন্ডারি বাজারের রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে। বাজারের এই সংবেদনশীল মুহূর্তে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং একটি টেকসই পুঁজিবাজার গড়ে তোলার জন্য আইপিও এবং সেকেন্ডারি বাজারের সম্পর্ক গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পুঁজিবাজারে নতুন পুঁজি সংগ্রহের অন্যতম আকর্ষণীয় মাধ্যম হলো আইপিও। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রবণতা লক্ষ্য করলে দেখা যায়, বহু আইপিও অত্যধিক উচ্চমূল্যে বাজারে আসে, যা সেকেন্ডারি বাজারের বিদ্যমান শেয়ারগুলোর মূল্যায়নের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। যখন একটি নতুন কোম্পানি, বিশেষত তুলনামূলকভাবে দুর্বল ভিত্তির, উচ্চ প্রিমিয়ামে শেয়ার ইস্যু করে, তখন বিনিয়োগকারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সেকেন্ডারি বাজার থেকে অর্থ তুলে আইপিওতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়। এর ফলে সেকেন্ডারি বাজারে তারল্য সংকট দেখা দেয় এবং বিদ্যমান ভালো মৌল ভিত্তির শেয়ারগুলোও দর হারাতে শুরু করে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) আইপিও অনুমোদনের ক্ষেত্রে কোম্পানির আর্থিক স্বচ্ছতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর জোর দিলেও, অনেক সময় প্রিমিয়াম নির্ধারণ এবং বাজার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আরও কঠোর নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন বাজার বিশ্লেষকরা। এই অসামঞ্জস্যের কারণে আইপিও পরবর্তী সময়ে অনেক শেয়ারের দাম দ্রুত কমে যায়, যা নতুন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করে এবং সামগ্রিকভাবে বাজারকে নেতিবাচক বার্তা দেয়।

আইপিওতে বিনিয়োগকারীদের অতি-আগ্রহের আরেকটি কারণ হলো স্বল্প সময়ে উচ্চ মুনাফার প্রত্যাশা, যা প্রায়শই বাস্তবসম্মত হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, আইপিও আবেদনকারীরা লটারির মাধ্যমে শেয়ার পেলেও, তালিকাভুক্তির পর সেই শেয়ারের দাম দ্রুত কমে যাওয়ায় তারা ক্ষতির সম্মুখীন হন। এই পরিস্থিতি সেকেন্ডারি বাজারে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে, সেকেন্ডারি বাজারে তারল্য প্রবাহ কমে যাওয়ায় এবং নতুন বিনিয়োগ না আসায়, ভালো মৌল ভিত্তির কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দামও চাহিদা অভাবে বৃদ্ধি পায় না। এটি এক ধরনের দুষ্টচক্র তৈরি করে, যেখানে আইপিওতে অতিরিক্ত মনোযোগ সেকেন্ডারি বাজারকে দুর্বল করে এবং দুর্বল সেকেন্ডারি বাজার নতুন আইপিওগুলোর সফলতার সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) উভয়েই এই তারল্য সংকটের প্রভাব অনুভব করছে। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) এর তথ্য অনুযায়ী, বিও অ্যাকাউন্টগুলোতে নিষ্ক্রিয়তার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকছেন বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য একটি সুসংহত বাজার কৌশল এবং কঠোর নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি, যা আইপিও এবং সেকেন্ডারি বাজারের মধ্যে একটি স্বাস্থ্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা এবং তালিকাভুক্তির পর শেয়ারের দামের অস্থিরতা বাজারের সামগ্রিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অনেক সময় দেখা যায়, আইপিওতে আবেদন করার পর শেয়ার বরাদ্দ পেতে দীর্ঘ সময় লাগে, এবং তালিকাভুক্তির পরও শেয়ারের দাম প্রত্যাশিত বৃদ্ধি না পেয়ে বরং কমে যায়। এর ফলে, বিনিয়োগকারীদের পুঁজি দীর্ঘ সময়ের জন্য আটকে থাকে এবং কাঙ্ক্ষিত মুনাফা অর্জিত হয় না। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে এবং ফটকাবাজারিদের জন্য সুযোগ তৈরি করে, যারা তালিকাভুক্তির প্রথম দিনেই শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা তোলার চেষ্টা করেন। বিএসইসিকে অবশ্যই আইপিও মূল্যায়নে আরও স্বচ্ছতা আনতে হবে এবং কোম্পানির প্রকৃত মূল্য, তার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং সেকেন্ডারি বাজারের বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রিমিয়াম নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় আইপিওতে অতিরিক্ত প্রিমিয়াম আরোপের প্রবণতা রোধ করতে হবে। আইপিও প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত এবং দক্ষ করতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে, যাতে আবেদন থেকে শুরু করে শেয়ার বরাদ্দ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয় এবং বিনিয়োগকারীদের পুঁজি অযথা আটকে না থাকে।

সাল মোট আইপিও সংখ্যা (প্রাইভেট প্লেসমেন্ট ব্যতীত) আইপিওতে সংগৃহীত মোট পুঁজি (কোটি টাকা) ডিএসইএক্স সূচকের বার্ষিক পরিবর্তন (%) আইপিও তালিকাভুক্তির পর গড় প্রথম দিনের লাভ/ক্ষতি (%)
২০২০ ১০ ১,১০০ +১২.৫০% +২০%
২০২১ ১২ ১,৫৫০ +২৫.৭০% +১৫%
২০২২ ৭ ৯৫০ -৩.২০% +৫%
২০২৩ ৫ ৭০০ -৬.৮০% -২%
২০২৪ (প্রথমার্ধ) ৩ ৪০০ -৪.৫০% -৫%

উৎস: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE) এর প্রকাশিত তথ্য ও বিভিন্ন বাজার গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী সংকলিত (আনুমানিক তথ্য)।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কে অবশ্যই আইপিও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি (Book Building Method) আরও কঠোরভাবে পর্যালোচনা করতে হবে এবং একটি গতিশীল মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া (Dynamic Pricing Mechanism) চালু করতে হবে, যা সেকেন্ডারি বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি এবং বিদ্যমান একই খাতের কোম্পানির মূল্যায়নের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হবে। এর মাধ্যমে উচ্চ প্রিমিয়ামের প্রবণতা হ্রাস পাবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে।
  • ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE) কে বাজারের কারসাজি রোধে তাদের নজরদারি ব্যবস্থা (Surveillance System) শক্তিশালী করতে হবে। বিশেষ করে, আইপিও তালিকাভুক্তির প্রথম কয়েক দিন এবং সেকেন্ডারি বাজারে অস্বাভাবিক লেনদেন প্যাটার্ন চিহ্নিত করে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এর সঙ্গে সমন্বয় করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
  • সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (CDBL) কে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এর নির্দেশনা অনুযায়ী বেনিফিশিয়ারি ওনার (BO) অ্যাকাউন্ট খোলার এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছতা ও কঠোরতা আনতে হবে। একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে একাধিক বেনামি বিও অ্যাকাউন্ট খোলা বা অস্বাভাবিক পরিমাণে শেয়ার ধারণের প্রবণতা রোধ করতে হবে, যা বাজারকে অস্থিতিশীল করতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানভীর আহমেদ

তানভীর আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শেয়ারবাজার ও ক্যাপিটাল মার্কেট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

לא נמצאו הערות


News Card Generator