চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান: কারখানায় রোবট, শ্রমিকের উত্তরণ… | আই নিউজ বিডি

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান: কারখানায় রোবট, শ্রমিকের উত্তরণ নাকি বিলুপ্তি?

আরিফুর রহমান  avatar   
আরিফুর রহমান
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান: কারখানায় রোবট, শ্রমিকের উত্তরণ নাকি বিলুপ্তি?
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান: কারখানায় রোবট, শ্রমিকের উত্তরণ নাকি বিলুপ্তি?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি ঢাকার আশুলিয়ায় স্থাপিত একটি বৃহৎ পোশাক কারখানার স্বয়ংক্রিয় সেলাই ইউনিট উদ্বোধনের ঘটনাটি দেশের শিল্পখাতে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের বাস্তব প্রভাবকে আব...

সম্প্রতি ঢাকার আশুলিয়ায় স্থাপিত একটি বৃহৎ পোশাক কারখানার স্বয়ংক্রিয় সেলাই ইউনিট উদ্বোধনের ঘটনাটি দেশের শিল্পখাতে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের বাস্তব প্রভাবকে আবারও সামনে এনেছে। প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে স্থাপিত এই ইউনিটে রোবোটিক আর্ম এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) চালিত মেশিনারি ব্যবহার করে পোশাক উৎপাদন প্রক্রিয়াকে দ্রুততর ও ত্রুটিমুক্ত করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে এই ইউনিট প্রায় ২০০ জন অভিজ্ঞ শ্রমিকের কাজ স্বয়ংক্রিয় করে তুলেছে, যা একইসাথে উৎপাদনশীলতা বাড়ালেও প্রথাগত শ্রমনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে। একদিকে যেমন এটি বাংলাদেশের উৎপাদন খাতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে তেমনই লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান এবং তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই বাস্তবতা কেবল একটি কারখানার চিত্র নয়, বরং দেশের সামগ্রিক শিল্পায়ন প্রক্রিয়ায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যেখানে যন্ত্র ও মানুষের সহাবস্থান অথবা সংঘাতের প্রশ্নটি ক্রমশ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই ঢেউ বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও শ্রমনির্ভর অর্থনীতির জন্য একটি দ্বি-মুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় স্বয়ংক্রিয়তা ও ডেটা-নির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ দক্ষতা বাড়িয়ে বৈশ্বিক বাজারে দেশের পণ্যকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলছে। যেমন, রোবোটিক ওয়েল্ডিং, থ্রিডি প্রিন্টিং, এবং অ্যাডভান্সড রোবোটিক অ্যাসেম্বলি লাইনগুলো ইলেকট্রনিক্স, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং হালকা প্রকৌশল খাতে দ্রুত প্রসার লাভ করছে। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে রপ্তানিমুখী খাতগুলো, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে এবং উৎপাদন ব্যয় কমাতে এই প্রযুক্তি গ্রহণে বাধ্য হচ্ছে। তবে, এই পরিবর্তনের ফলে যে সব কাজ পুনরাবৃত্তিমূলক, শারীরিক শ্রমনির্ভর এবং কম দক্ষতার প্রয়োজন হয়, সেগুলোতে মানব শ্রমিকের চাহিদা কমে যাচ্ছে। শ্রম ও কর্মসংসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, আগামী এক দশকে পোশাক ও চামড়া শিল্পে প্রায় ১৫-২০% প্রথাগত শ্রমিকের কাজ স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র দ্বারা প্রতিস্থাপিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং তাদের নতুন দক্ষতার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সহায়তা করা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। একইসাথে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেশিন লার্নিং, রোবোটিক্স, ডেটা সায়েন্স এবং সাইবার সিকিউরিটির মতো উচ্চ-দক্ষতার ক্ষেত্রগুলোতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, যেখানে বর্তমানে দক্ষ কর্মীর অভাব প্রকট। এই অভাব পূরণে দেশের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার দ্রুত রূপান্তর অপরিহার্য।

এই প্রেক্ষাপটে, দেশের কারিগরি ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা এবং প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর তাদের অধীনে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারগুলোর কারিকুলাম আধুনিকীকরণের চেষ্টা করছে, যেখানে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী প্রযুক্তিগত কোর্স যেমন রোবোটিক্স, অটোমেশন এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল আইওটি অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের গতি এবং বিস্তৃতি এখনও পর্যাপ্ত নয়। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষক, অত্যাধুনিক ল্যাব সরঞ্জাম এবং শিল্প-সংযোগের অভাব এই উদ্যোগগুলোর বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (UGC) দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রযুক্তি অনুষদগুলোর জন্য নতুন সিলেবাস প্রণয়নে কাজ করছে, যেখানে ডেটা সায়েন্স, এআই এবং মেশিন লার্নিংয়ের মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তবে, স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা প্রায়শই তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জনে সীমাবদ্ধ থাকে এবং শিল্পের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে তাদের দক্ষতার ফারাক থেকে যায়। ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) বিভিন্ন শিল্পের জন্য জাতীয় দক্ষতা মান (National Skill Standards) নির্ধারণ এবং সে অনুযায়ী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তিগত চাহিদা পূরণে এর সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (SEIP)-এর মতো প্রকল্পগুলো বিভিন্ন সেক্টরে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করছে, কিন্তু চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এর পরিধি ও গভীরতা আরও বাড়ানো জরুরি। BANBEIS-এর তথ্য অনুযায়ী, কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও, গুণগত মান এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ প্রশিক্ষণের অভাব এখনও রয়ে গেছে, যা ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের জন্য এক বড় বাধা।

বছর কারিগরি শিক্ষায় মোট শিক্ষার্থী (লক্ষ) চতুর্থ শিল্প বিপ্লব-সংশ্লিষ্ট কোর্সে শিক্ষার্থী (হাজার) SEIP-এর আওতায় প্রশিক্ষিত (হাজার) সংশ্লিষ্ট শিল্পে কর্মসংস্থান (%)
২০১৯-২০ ১৪.৫ ১২.৩ ৪৫.৬ ৬২
২০২০-২১ ১৫.২ ১৫.৮ ৫২.১ ৬৪
২০২১-২২ ১৬.১ ২০.৫ ৬১.৩ ৬৬
২০২২-২৩ ১৭.০ ২৫.৭ ৭০.২ ৬৮

উৎস: BANBEIS, NSDA ও SEIP-এর সমন্বিত প্রতিবেদন (২০২৩-২৪)।

সুপারিশ

  • দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী কোর্স ও কারিকুলাম বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (UGC) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-কে অবিলম্বে একটি সমন্বিত ও বিস্তারিত রোডম্যাপ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। এই রোডম্যাপে রোবোটিক্স, এআই, ডেটা সায়েন্স, সাইবার সিকিউরিটি, এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল আইওটি'র উপর বিশেষায়িত ল্যাব স্থাপন এবং বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় প্রশিক্ষক তৈরির জন্য সুনির্দিষ্ট বাজেট ও সময়সীমা থাকতে হবে।
  • শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী জাতীয় দক্ষতা মান (National Skill Standards) আধুনিকায়ন এবং নতুন প্রযুক্তিগত দক্ষতার জন্য মান নির্ধারণের ক্ষেত্রে ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA)-কে শিল্প ও শিক্ষা খাতের প্রতিনিধিদের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করতে হবে। এর পাশাপাশি, NSDA-কে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে যেখানে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব-সংশ্লিষ্ট দক্ষতা যাচাই ও সনদ প্রদানের প্রক্রিয়াকে স্বয়ংক্রিয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত করা হবে, যাতে প্রশিক্ষিত শ্রমিকরা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় বাজারে দ্রুত কর্মসংস্থান খুঁজে পায়।
  • স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (SEIP)-এর মতো প্রকল্পগুলোর পরিধি বাড়িয়ে একটি নতুন তহবিল গঠন করতে হবে, যা শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের কর্মীদের চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী দক্ষতা প্রশিক্ষণের জন্য আর্থিক প্রণোদনা দেবে। এই তহবিল থেকে বিশেষ করে পোশাক, টেক্সটাইল, এবং ইলেকট্রনিক্স শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য 'রি-স্কিলিং' ও 'আপ-স্কিলিং' কর্মসূচিতে বিনিয়োগ করা হবে, যেখানে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট শিল্প সমিতিগুলো যৌথভাবে প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু ও পদ্ধতি নির্ধারণ করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: আরিফুর রহমান

আরিফুর রহমান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator