বাংলাদেশের ভেজাল খাদ্য ও ফুড সেফটি ল্যাব: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয় | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বাংলাদেশের ভেজাল খাদ্য ও ফুড সেফটি ল্যাব: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়

আকমল হোসেন  avatar   
আকমল হোসেন
বাংলাদেশের ভেজাল খাদ্য ও ফুড সেফটি ল্যাব: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়
বাংলাদেশের ভেজাল খাদ্য ও ফুড সেফটি ল্যাব: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA) কর্তৃক প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের প্রধান শহরগুলোর খোলা বাজারের প্রায় ৪০% খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকারক রাসা...

সম্প্রতি বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA) কর্তৃক প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের প্রধান শহরগুলোর খোলা বাজারের প্রায় ৪০% খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকারক রাসায়নিক ও ভেজাল উপাদান বিদ্যমান। এই উদ্বেগজনক চিত্র জনস্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে আমাদের বিদ্যমান ফুড সেফটি ল্যাবগুলোর সক্ষমতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলছে। শুধু তাই নয়, বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে মান নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতাকে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা দেশের রপ্তানি বাণিজ্যকেও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। এই পরিস্থিতিতে ভেজাল খাদ্যের বিস্তার রোধ এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি শক্তিশালী ও কার্যকর ফুড সেফটি ল্যাব অবকাঠামো গড়ে তোলা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের খাদ্যপণ্যে ভেজালের প্রবণতা বর্তমানে এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। ফলমূল থেকে শুরু করে মাছ, মাংস, দুধ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় মসলা পর্যন্ত প্রায় সব ধরনের খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন, ক্যালসিয়াম কার্বাইড, টেক্সটাইল রং, হেভি মেটাল এবং কীটনাশকের মতো বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ভেজাল খাদ্য গ্রহণ দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে, যা ক্যান্সার, কিডনি রোগ, লিভারের সমস্যা, হৃদরোগ এবং স্নায়বিক দুর্বলতাসহ বিভিন্ন জটিল রোগের কারণ হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ল্যাবরেটরিগুলোর সক্ষমতার অভাব এবং আধুনিক পরীক্ষার সরঞ্জামের অপ্রতুলতা এই সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলেছে। অনেক ল্যাবরেটরিতেই অত্যাধুনিক ক্রোম্যাটোগ্রাফি, স্পেকট্রোস্কোপি বা ম্যাস স্পেকট্রোমেট্রি ডিভাইসের অভাব প্রকট, যা জটিল রাসায়নিক বিশ্লেষণের জন্য অপরিহার্য। ফলে ভেজালকারীদের শনাক্তকরণ ও শাস্তির আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ছে, যা তাদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।

দেশের বিদ্যমান ফুড সেফটি ল্যাবগুলোর অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং মানবসম্পদের অভাব একটি বড় সংকট। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI), জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (IPH) এবং কিছু বিশ্ববিদ্যালয়-ভিত্তিক ল্যাবরেটরি সীমিত পরিসরে খাদ্য পরীক্ষা পরিচালনা করলেও, তাদের পরীক্ষার পরিধি, গতি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে যথেষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এবং বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় কিছু স্বাস্থ্য প্রকল্পে ল্যাবরেটরি আধুনিকীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও, খাদ্য নিরাপত্তা খাতের জন্য সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত বিনিয়োগের অভাব স্পষ্ট। এছাড়া, ল্যাবরেটরিগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, সঠিক নমুনা সংগ্রহ ও সংরক্ষণের পদ্ধতিগত ত্রুটি এবং পরীক্ষার ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন প্রায়শই ওঠে। অনেক ল্যাব ISO 17025 আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের পরীক্ষার ফলাফল আদালতে বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সর্বজনীনভাবে গৃহীত হয় না। এই পরিস্থিতিতে, শুধু ভেজাল শনাক্তকরণ নয়, বরং খাদ্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ও উৎপাদক পর্যায়ে নজরদারির জন্য একটি শক্তিশালী পরীক্ষাগার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা আবশ্যক, যা কাঁচামাল থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মান নিশ্চিত করবে।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নিলেও, সেগুলোর বাস্তবায়ন ধীরগতিতে চলেছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব প্রায়শই প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালে প্রণীত জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা কর্মপরিকল্পনা (National Food Safety Strategic Plan) অনুযায়ী ল্যাবরেটরিগুলোর আধুনিকীকরণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের কথা বলা হলেও, এর অগ্রগতি প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি। উপরন্তু, ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রেও ল্যাবরেটরি সাপোর্টের অভাব পরিলক্ষিত হয়। যখন কোনো অভিযানে খাদ্যপণ্য জব্দ করা হয়, তখন দ্রুত এবং নির্ভরযোগ্য পরীক্ষার ফলাফল না পাওয়ায় আইনি প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যায়। এই চক্র ভাঙতে হলে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং ল্যাবরেটরিগুলোর মধ্যে একটি নিবিড় এবং সুসংগঠিত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

বাংলাদেশের ফুড সেফটি ল্যাব: সক্ষমতা ও চ্যালেঞ্জ (২০২৩-২৪)
সূচক পরিমাণ/শতাংশ মন্তব্য
মোট সরকারি ফুড সেফটি ল্যাব (প্রাথমিক পরীক্ষা সক্ষমতাসহ) ২৫টি জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, BSTI, বিসিএসআইআর এবং কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাব অন্তর্ভুক্ত।
ISO 17025 স্বীকৃত ল্যাব ৫টি (আনুমানিক) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পরীক্ষার সক্ষমতা সীমিত।
বার্ষিক নমুনা পরীক্ষার লক্ষ্যমাত্রা (২০২৩) ৫০,০০০ প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
পরীক্ষিত নমুনার ভেজালের হার (BFSA রিপোর্ট, ২০২২-২৩) ৩০-৪০% বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে ব্যাপক ভেজালের উপস্থিতি।
World Bank/ADB এর খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রকল্পে সম্ভাব্য ল্যাব উপাদানের জন্য বরাদ্দ $১০০ মিলিয়ন (আনুমানিক) স্বাস্থ্য ও কৃষি প্রকল্পের অধীনে পরোক্ষ সহায়তা, সরাসরি ফুড সেফটি ল্যাবের জন্য সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ কম।
ফুড সেফটি ল্যাবের আধুনিকীকরণে প্রয়োজনীয় তহবিলের ঘাটতি ৭০% আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিগত upgrades এর জন্য বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন।

উৎস: বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA) বার্ষিক প্রতিবেদন, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (IPH) তথ্য, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI) সূত্র এবং বিশ্বব্যাংক/এডিবি প্রকল্প দলিল (আনুমানিক তথ্য)।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA) কে 'নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩' এর অধীনে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য একটি কেন্দ্রীয় রেফারেন্স ল্যাবরেটরি স্থাপন এবং প্রতিটি বিভাগীয় শহরে অত্যাধুনিক সুবিধাসম্পন্ন অ্যাক্রিডিটেড ফুড সেফটি ল্যাব প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (যেমন ISO 17025) অনুসরণ করা হবে এবং ল্যাব পরিচালনায় পর্যাপ্ত বাজেট ও দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা হবে।
  • খাদ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের (BSTI এর জন্য) অধীনে বিদ্যমান ফুড সেফটি ল্যাবগুলোর আধুনিকীকরণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এই পরিকল্পনায় বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এর মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে অত্যাধুনিক টেস্টিং সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং ল্যাব কর্মীদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ প্রদানের ওপর জোর দিতে হবে।
  • জাতীয় পর্যায়ে একটি 'ফুড সেফটি রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা খাদ্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে গবেষণার পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা পরিদর্শক, ল্যাব টেকনিশিয়ান এবং সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের জন্য নিয়মিত ও মানসম্মত প্রশিক্ষণ প্রদান করবে। এই ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য বিজ্ঞান অনুষদের সাথে যৌথভাবে কাজ করবে, যাতে খাদ্য উৎপাদক থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত সকলের মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি পায় এবং আইনি প্রক্রিয়ায় কার্যকর সহযোগিতা নিশ্চিত হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: আকমল হোসেন

আকমল হোসেন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ভেজাল খাদ্য ও ফুড সেফটি ল্যাব। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

コメントがありません


News Card Generator