অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন

সুমাইয়া পারভীন  avatar   
সুমাইয়া পারভীন
অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন
অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জৈব কৃষি পদ্ধতির আওতাধীন জমির পরিমাণ প্রায় ৩০% বৃদ্ধি পেয...

সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জৈব কৃষি পদ্ধতির আওতাধীন জমির পরিমাণ প্রায় ৩০% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় এক নীরব বিপ্লবের ইঙ্গিত দেয়। একই সময়ে, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে কয়েকটি পাইলট প্রকল্পে জৈব সার ব্যবহারের ইতিবাচক ফল লক্ষ্য করা গেছে, যা রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরশীলতা কমানোর ক্ষেত্রে আশার আলো দেখাচ্ছে। এই অগ্রগতি একদিকে যেমন কৃষকদের মধ্যে পরিবেশ-সচেতনতা বৃদ্ধি করছে, তেমনই অন্যদিকে ভোক্তাদের মধ্যে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যের চাহিদা বাড়িয়ে তুলছে। তবে, এই আপাত সাফল্যের আড়ালে অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশনের এমন কিছু অজানা দিক রয়েছে, যা গভীরতর গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানের দাবি রাখে, বিশেষ করে যখন আমরা খাদ্য নিরাপত্তা এবং জনস্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করছি।

জৈব কৃষির প্রসারে প্রাথমিক ধাপগুলো পার হলেও, এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি এবং মাঠ পর্যায়ের প্রয়োগে বেশ কিছু জটিলতা এখনো অনাবিষ্কৃত। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) বিভিন্ন ফসলের জৈব চাষ পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে, যেখানে জৈব বালাইনাশক ও জৈব সারের কার্যকারিতা মূল্যায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বারি উদ্ভাবিত কিছু সবজি ও ফল উৎপাদন পদ্ধতিতে জৈব সার এবং প্রাকৃতিক বালাই দমন পদ্ধতি ব্যবহার করে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার ৮০% পর্যন্ত কমানো সম্ভব হয়েছে। তবে, এই পদ্ধতিগুলো সকল অঞ্চলের মাটি ও জলবায়ুর জন্য কতটা কার্যকর, তা নিয়ে আরও বিস্তারিত আঞ্চলিক গবেষণা প্রয়োজন। বিশেষ করে, জৈব পদ্ধতিতে উচ্চ ফলনশীল জাতের অভাব এবং কীটপতঙ্গ ও রোগ দমনের চ্যালেঞ্জ এখনও অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকের জন্য একটি বড় বাধা। অনেক ক্ষেত্রে, প্রচলিত রাসায়নিক পদ্ধতির তুলনায় জৈব পদ্ধতিতে ফলন সামান্য কম হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে এর প্রতি অনীহা দেখা যায়, যদিও দীর্ঘমেয়াদে মাটির স্বাস্থ্য ও পরিবেশের উপর এর ইতিবাচক প্রভাব অনস্বীকার্য। এই ফলন ঘাটতি পূরণের জন্য BARI-কে আরও কার্যকর ও উচ্চফলনশীল জৈব-বান্ধব জাত উদ্ভাবনে জোর দিতে হবে এবং DAE-কে মাঠ পর্যায়ে এই প্রযুক্তি হস্তান্তরে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

পুষ্টির দৃষ্টিকোণ থেকে অর্গানিক খাবারের প্রভাব নিয়েও বিতর্ক ও গবেষণার অবকাশ রয়েছে। অনেক ভোক্তা মনে করেন, জৈব খাদ্য রাসায়নিকভাবে উৎপাদিত খাদ্যের চেয়ে বেশি পুষ্টিকর, তবে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সবসময় এই ধারণাকে সমর্থন করে না। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) কিছু জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত ধানের জাত নিয়ে গবেষণা করেছে, যেখানে দেখা গেছে কিছু মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের (যেমন জিঙ্ক, আয়রন) মাত্রা প্রচলিত পদ্ধতির ধানের চেয়ে সামান্য বেশি হতে পারে, যা মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণ এবং ব্যবহৃত সারের ধরনের উপর নির্ভরশীল। তবে, এই পার্থক্যগুলো মানুষের স্বাস্থ্যের উপর কতটা তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে আরও সুনির্দিষ্ট ক্লিনিক্যাল গবেষণা প্রয়োজন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এই বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে সমন্বয় করছে, কিন্তু পুষ্টিগত মানের একটি সর্বজনীন মানদণ্ড ও সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া এখনও অনুপস্থিত। ভোক্তাদের মধ্যে অর্গানিক পণ্যের প্রতি উচ্চমূল্য প্রদানে আগ্রহ থাকলেও, এর প্রকৃত পুষ্টিগত মূল্য এবং রাসায়নিক অবশেষমুক্ত থাকার নিশ্চয়তা নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। এই শূন্যতা পূরণের জন্য BARC-কে একটি সমন্বিত গবেষণা কাঠামো তৈরি করতে হবে, যা অর্গানিক পণ্যের পুষ্টিগত মান এবং রাসায়নিক অবশেষের উপস্থিতি নিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহ করবে, যা ভোক্তাদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। এই গবেষণাগুলো শুধুমাত্র পুষ্টির পার্থক্য নয়, বরং রাসায়নিক কীটনাশক ও সারের দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব থেকে মুক্তির যে সুবিধা, সেদিকেও আলোকপাত করবে।

জৈব কৃষি পদ্ধতির প্রসারে সরকারি নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশ মন্ত্রণালয় যদিও জৈব কৃষি সম্প্রসারণে নীতিগত সমর্থন দিচ্ছে, তবে এর বাস্তবায়ন ও তদারকিতে এখনও অনেক ঘাটতি রয়েছে। জৈব সারের সহজলভ্যতা এবং এর গুণগত মান নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক কৃষক প্রচলিত রাসায়নিক সার থেকে জৈব সারে স্থানান্তরে দ্বিধাগ্রস্ত হন কারণ জৈব সারের কার্যকারিতা নিয়ে তাদের মধ্যে সঠিক জ্ঞানের অভাব রয়েছে। এছাড়াও, জৈব পণ্যের সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ, যা ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য প্রায়শই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। একটি কার্যকর সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা না থাকায়, অনেক সময় সাধারণ পণ্যকে জৈব পণ্য বলে উচ্চমূল্যে বিক্রি করার প্রবণতা দেখা যায়, যা পুরো খাতের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। DAE-এর সম্প্রসারণ কর্মীরা মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের জৈব কৃষি পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিলেও, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং একটি শক্তিশালী সাপ্লাই চেইন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সঙ্গতি রেখে একটি দেশীয় জৈব সার্টিফিকেশন কাঠামো তৈরি করা অপরিহার্য, যা স্থানীয় কৃষকদের জন্য সাশ্রয়ী এবং ভোক্তাদের জন্য নির্ভরযোগ্য হবে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে না পারলে, জৈব কৃষির পূর্ণ সম্ভাবনা উপলব্ধি করা কঠিন হবে এবং এর সুফল সমাজের সকল স্তরে পৌঁছানো সম্ভব হবে না।

প্রতিষ্ঠানের নাম জৈব কৃষি সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম উল্লেখযোগ্য তথ্য (২০২২-২৩)
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) জৈব কৃষি পদ্ধতির সম্প্রসারণ ও কৃষকদের প্রশিক্ষণ। ৩,৪৫০ হেক্টর জমিতে জৈব চাষের আওতা বৃদ্ধি; ১৫,০০০ কৃষককে প্রশিক্ষণ প্রদান।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) জৈব সার ও বালাইনাশক উদ্ভাবন, জৈব-বান্ধব ফসলের জাত উন্নয়ন। ৫টি নতুন জৈব সার ও বালাইনাশক ফর্মুলেশন উদ্ভাবন; ২টি জৈব-বান্ধব সবজি জাতের মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষা।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) জৈব পদ্ধতিতে ধান চাষের কৌশল ও পুষ্টিগুণ নিয়ে গবেষণা। ৩টি জৈব ধান চাষ পদ্ধতি উন্নয়ন; জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত ধানে জিঙ্ক ও আয়রনের মাত্রা বৃদ্ধি (গড়ে ৫-১০%)।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) জৈব কৃষি গবেষণা সমন্বয় ও নীতি প্রণয়নে সহায়তা। জৈব কৃষি গবেষণা প্রকল্পে ৪.৫ কোটি টাকা বরাদ্দ; জাতীয় জৈব কৃষি নীতি পর্যালোচনার জন্য কমিটি গঠন।
পরিবেশ মন্ত্রণালয় জৈব কৃষি নীতি ও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন। জাতীয় জৈব কৃষি নীতি খসড়া চূড়ান্তকরণে সক্রিয় অংশগ্রহণ; জৈব সার ব্যবহারে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নে ২টি পাইলট প্রকল্প শুরু।

উৎস: DAE, BARI, BRRI, BARC এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২২-২৩)

সুপারিশ

  • পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC)-এর তত্ত্বাবধানে একটি সুনির্দিষ্ট 'জাতীয় জৈব কৃষি নীতি ২০২৫' প্রণয়ন ও দ্রুত বাস্তবায়ন করা হোক, যেখানে ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য সহজলভ্য সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া এবং জৈব সারের উৎপাদন ও বিতরণে ভর্তুকি অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
  • বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) যৌথভাবে জৈব পদ্ধতিতে অধিক ফলনশীল ও পুষ্টিসমৃদ্ধ ফসলের জাত উদ্ভাবনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গবেষণা পরিচালনা করুক এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এই প্রযুক্তিগুলো মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিতে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনী কর্মসূচির আয়োজন করুক।
  • BARC-এর নেতৃত্বে একটি স্বাধীন 'জৈব পণ্য সার্টিফিকেশন কর্তৃপক্ষ' গঠন করা হোক, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সঙ্গতি রেখে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত জৈব পণ্যের গুণগত মান, পুষ্টি উপাদান এবং রাসায়নিক অবশেষের উপস্থিতি পরীক্ষা ও প্রত্যয়িত করবে, যা ভোক্তাদের আস্থা বৃদ্ধি করবে এবং কৃষকদের সঠিক মূল্য পেতে সহায়তা করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সুমাইয়া পারভীন

সুমাইয়া পারভীন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator