সম্প্রতি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) ২০৪১ সালের মধ্যে একটি স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের রোডম্যাপের অংশ হিসেবে জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (National AI Strategy) কৌশলের খসড়া উন্মোচন করেছে, যেখানে জেনারেটিভ এআই ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তিকে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, কারণ এটি কেবল নীতিগত দিকনির্দেশনাই দিচ্ছে না, বরং জেনারেটিভ এআইয়ের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জগুলোকেও সামনে আনছে। বিশেষত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই শাখা, যা নতুন ডেটা, টেক্সট, চিত্র বা কোড তৈরি করতে সক্ষম, বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি শিল্পে বিপ্লব ঘটাচ্ছে এবং বাংলাদেশের জন্য এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উদ্ভাবনের এক বিশাল সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে, এই প্রযুক্তিকে সফলভাবে কাজে লাগাতে হলে ডেটা নিরাপত্তা, নৈতিক ব্যবহার, এবং অবকাঠামোগত প্রস্তুতির মতো বিষয়গুলো সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করা অত্যাবশ্যক।
জেনারেটিভ এআইয়ের উত্থান বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তির ল্যান্ডস্কেপকে আমূল পরিবর্তন করছে। সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট থেকে শুরু করে কন্টেন্ট ক্রিয়েশন, এমনকি স্বাস্থ্যসেবায় নতুন ওষুধ আবিষ্কারেও এর প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, BASIS (বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস) এর সদস্যভুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই জেনারেটিভ এআই টুলস ব্যবহার করে তাদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং নতুন সেবা প্রদানে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে, বিদেশি আউটসোর্সিং কার্যক্রমে কোড জেনারেশন, ডেটা অ্যানালাইসিস এবং গ্রাহক সেবা অটোমেশনে জেনারেটিভ এআইয়ের ব্যবহার দেশের আইটি শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করছে। তবে, এই প্রযুক্তির সুফল পেতে হলে প্রয়োজন অত্যাধুনিক ডেটা সেন্টার, উচ্চ গতির ইন্টারনেট সংযোগ এবং ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের পর্যাপ্ত সুবিধা। বিটিআরসি (বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন) এর ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং ডেটা ট্রান্সমিশন পলিসি এই খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, কারণ জেনারেটিভ এআই মডেলগুলো পরিচালনার জন্য বিশাল পরিমাণ ডেটা দ্রুত প্রক্রিয়াকরণের সক্ষমতা অপরিহার্য। ডেটা লোকালাইজেশন এবং ডেটা প্রাইভেসি সংক্রান্ত নীতিমালার অভাবে বিদেশি ক্লাউড প্ল্যাটফর্মের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ডেটা সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে, যা দেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
জেনারেটিভ এআই খাতের দ্রুত বিকাশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সঠিক মানবসম্পদ এবং উদ্ভাবনী ইকোসিস্টেম। a2i (অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন) প্রোগ্রাম ইতোমধ্যেই বিভিন্ন সরকারি সেবায় ডিজিটাল রূপান্তর নিয়ে কাজ করছে এবং জেনারেটিভ এআইয়ের মাধ্যমে সরকারি সেবা আরও সহজ ও নাগরিকবান্ধব করার অপার সম্ভাবনা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, এআই-চালিত চ্যাটবট ব্যবহার করে নাগরিকদের প্রশ্নের তাৎক্ষণিক উত্তর দেওয়া বা জটিল সরকারি প্রক্রিয়া সহজ করা যেতে পারে। তবে, এই প্রযুক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে ডেটার গুণগত মান এবং মডেলের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে পক্ষপাতদুষ্ট ফলাফল বা ভুল তথ্যের বিস্তার রোধ করা যায়। অন্যদিকে, BHTPA (বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক অথরিটি) এর অধীনে প্রতিষ্ঠিত হাই-টেক পার্কগুলো জেনারেটিভ এআই গবেষণা ও উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে। এই পার্কগুলোতে দেশি-বিদেশি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করে একটি উদ্ভাবনী পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব, যেখানে গবেষক, ডেভেলপার এবং স্টার্টআপগুলো জেনারেটিভ এআইয়ের নতুন অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করতে পারবে। এর জন্য প্রয়োজন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডের পর্যাপ্ত সরবরাহ, ট্যাক্স ইনসেনটিভ এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা সুবিধা। শুধু প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নয়, বরং এআই মডেলের প্রশিক্ষণ ডেটা সংগ্রহ, কিউরেশন এবং নিরাপদ স্টোরেজের জন্য একটি শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করা অপরিহার্য, যা বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ এর অধীনে স্মার্ট বাংলাদেশ বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই খাতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশীদারিত্বমূলক উদ্যোগ একটি টেকসই এবং উদ্ভাবনী জেনারেটিভ এআই ইকোসিস্টেম তৈরি করতে পারে, যা দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
| সূচক | ২০২২ (আনুমানিক) | ২০২৭ (প্রক্ষেপিত) | উৎস |
|---|---|---|---|
| জেনারেটিভ এআই বাজারে বিনিয়োগ (মিলিয়ন USD) | ১৫.৫ | ৭৮.৩ | ICT Division, BASIS |
| এআই/মেশিন লার্নিং পেশাদারদের সংখ্যা | ২৫,০০০ | ৮০,০০০ | a2i, BHTPA |
| এআই-চালিত স্টার্টআপের সংখ্যা (BASIS নিবন্ধিত) | ১২০ | ৩৫০ | BASIS |
| হাই-টেক পার্কে এআই গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্রের সংখ্যা | ৫ | ১৫ | BHTPA |
| ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক কভারেজ (শতাংশ) | ১০% | ৬০% | BTRC |
উৎস: বাংলাদেশ সরকার (ICT Division, a2i, BHTPA), BASIS, BTRC এর প্রকাশিত প্রতিবেদন ও বাজার বিশ্লেষণ থেকে প্রাপ্ত আনুমানিক ডেটা।
সুপারিশ
- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) কে জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৌশল (National AI Strategy) এর খসড়া দ্রুত চূড়ান্ত করে গেজেট আকারে প্রকাশ করতে হবে, যেখানে জেনারেটিভ এআইয়ের নৈতিক ব্যবহার, ডেটা গোপনীয়তা, এবং ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস (IPR) সংক্রান্ত সুস্পষ্ট বিধিবিধান অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
- বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (BTRC) কে বিটিএইচপিএ (BHTPA) এর হাই-টেক পার্কগুলোতে ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক এবং উচ্চ-গতির ডেটা সেন্টার স্থাপনে অগ্রাধিকারমূলক লাইসেন্স ও নীতি সহায়তা প্রদান করতে হবে, যাতে জেনারেটিভ এআই মডেলের দ্রুত প্রশিক্ষণ ও স্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত হয়।
- a2i (অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন) এবং BASIS যৌথভাবে একটি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করবে, যা জেনারেটিভ এআই মডেল ফাইন-টিউনিং, প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং, এবং এআই নৈতিকতার উপর গুরুত্ব দেবে, এবং এই কর্মসূচির অধীনে অন্তত ৫০,০০০ তরুণ-তরুণীকে আগামী তিন বছরের মধ্যে প্রশিক্ষিত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করবে।