ডেটা ও বাস্তবতা: জলবায়ু পরিবর্তন ও কার্বন ক্রেডিট খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ডেটা ও বাস্তবতা: জলবায়ু পরিবর্তন ও কার্বন ক্রেডিট খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন

শারমিন আক্তার  avatar   
শারমিন আক্তার
ডেটা ও বাস্তবতা: জলবায়ু পরিবর্তন ও কার্বন ক্রেডিট খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন
ডেটা ও বাস্তবতা: জলবায়ু পরিবর্তন ও কার্বন ক্রেডিট খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত 'ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন প্ল্যান (NAP) ২০২২-২০৫০' বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এক...

সম্প্রতি, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত 'ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন প্ল্যান (NAP) ২০২২-২০৫০' বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় একটি সুদূরপ্রসারী রোডম্যাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই পরিকল্পনায় কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পরিবেশ সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে অভিযোজন কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং কার্বন সঞ্চয় বাড়ানোর উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। তবে, এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কার্বন ক্রেডিট খাতের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জগুলো কতটা বাস্তবসম্মতভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে, তা নিয়ে নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ জরুরি। বিশেষ করে, কৃষি খাতে কার্বন সঞ্চয় এবং টেকসই উৎপাদন পদ্ধতি প্রচলনের মাধ্যমে কার্বন ক্রেডিট অর্জনের সুযোগ এখনো অনেকটাই অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, যেমন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়নে কাজ করলেও, সেগুলোকে কার্বন ক্রেডিট বাজারের সাথে কার্যকরভাবে সংযুক্ত করার জন্য একটি সুসংহত এবং স্বচ্ছ কাঠামোর অভাব স্পষ্ট। বর্তমানে, বৈশ্বিক কার্বন বাজারগুলোর জটিলতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে যাচাইকরণ পদ্ধতির দুর্বলতা এই খাতের বিকাশে প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ।

বাংলাদেশের কৃষি খাত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা সত্ত্বেও, কার্বন ক্রেডিট প্রকল্পগুলোতে এর অংশগ্রহণ এখনো সীমিত। যদিও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) কৃষকদের মধ্যে জলবায়ু সহনশীল ফসলের জাত এবং উন্নত কৃষি পদ্ধতি প্রচলনে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে, কিন্তু এই কার্যক্রমগুলো থেকে সৃষ্ট কার্বন সঞ্চয় বা নিঃসরণ হ্রাসকে একটি পরিমাপযোগ্য ও যাচাইযোগ্য কার্বন ক্রেডিটে রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি এখনো অস্পষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, জৈব সারের ব্যবহার বৃদ্ধি, উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা কৌশল অবলম্বন, বা শস্য আবর্তনের মাধ্যমে মাটির কার্বন ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি — এসবই কার্বন ক্রেডিট অর্জনের সম্ভাব্য উৎস। তবে, এই পদ্ধতিগুলো থেকে ঠিক কতটুকু কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাচ্ছে বা সঞ্চিত হচ্ছে, তা পরিমাপের জন্য একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন 'পরিমাপ, প্রতিবেদন ও যাচাইকরণ (MRV)' পদ্ধতির অভাব রয়েছে। এর ফলে, ছোট ও মাঝারি আকারের কৃষকরা যারা কার্বন-বান্ধব কৃষি পদ্ধতি গ্রহণে আগ্রহী, তারা বৈশ্বিক কার্বন বাজারে প্রবেশাধিকার পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, কার্বন ক্রেডিট প্রকল্পগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞানও তাদের নাগালের বাইরে থেকে যাচ্ছে, যা এই খাতের সম্প্রসারণে বড় বাধা সৃষ্টি করছে।

জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়নে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এর অবদান অনস্বীকার্য। BARI লবণাক্ততা, খরা এবং জলমগ্নতা সহনশীল বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবন করেছে, যা প্রতিকূল পরিবেশে কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করছে। একইভাবে, BRRI উচ্চ ফলনশীল এবং জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করে খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এসব উদ্ভাবন একদিকে যেমন কৃষকদের ক্ষতি কমিয়ে আনছে, অন্যদিকে কার্বন নিঃসরণ কমাতেও পরোক্ষভাবে সাহায্য করছে, কারণ টেকসই কৃষি পদ্ধতি মাটির স্বাস্থ্য উন্নত করে এবং রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমায়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এই গবেষণা কার্যক্রমগুলোর সমন্বয় সাধন করলেও, এই গবেষণাগুলোকে সরাসরি কার্বন ক্রেডিট প্রকল্পের সাথে যুক্ত করার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রযুক্তিকে কিভাবে কার্বন ক্রেডিট প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তার একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে এই বিষয়ে BARC, BARI এবং BRRI-এর সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করতে হবে যাতে উদ্ভাবিত প্রযুক্তিগুলো কার্বন বাজার থেকে আর্থিক সুবিধা পেতে পারে এবং কৃষকদের মধ্যে এর ব্যবহার আরও উৎসাহিত হয়।

কার্বন ক্রেডিট বাজারের কার্যকারিতা নির্ভর করে একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং স্বচ্ছ নীতির উপর। বর্তমানে, বাংলাদেশের কার্বন ক্রেডিট খাত মূলত স্বেচ্ছাসেবী বাজার দ্বারা চালিত, যেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়। তবে, স্থানীয় পর্যায়ে এই মানদণ্ডগুলো বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণ করার জন্য পর্যাপ্ত সক্ষমতা বা নির্দিষ্ট আইনের অভাব পরিলক্ষিত হয়। পরিবেশ মন্ত্রণালয় যদিও কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং পরিবেশগত প্রকল্পগুলোর অনুমোদন প্রদান করে, কিন্তু কার্বন ক্রেডিট প্রকল্পের যাচাইকরণ, নিবন্ধন এবং ট্রেডিংয়ের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখনো অনুপস্থিত। এর ফলে, বিনিয়োগকারীরা কার্বন ক্রেডিট প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে দ্বিধা বোধ করেন এবং স্থানীয় উদ্যোক্তারাও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে বাধার সম্মুখীন হন। এই পরিস্থিতিতে, একটি জাতীয় কার্বন ক্রেডিট নীতিমালা প্রণয়ন এবং 'ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার' এর মতো উদ্যোগগুলোকে কার্বন ক্রেডিট মেকানিজমের আওতায় আনার জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি করা অপরিহার্য। এটি শুধু কার্বন নিঃসরণ কমাতেই সাহায্য করবে না, বরং কৃষকদের জন্য একটি নতুন আয়ের উৎস তৈরি করে তাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত করবে।

সূচক তথ্য সাল/ইউনিট উৎস প্রতিষ্ঠান
জলবায়ু সহনশীল ধানের জাত (বিআরআরআই) ২৫+ জাত উদ্ভাবিত ২০২২ পর্যন্ত বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)
লবণ সহনশীল গমের জাত (বারি) ৫+ জাত উদ্ভাবিত ২০২১ পর্যন্ত বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI)
কৃষি খাতে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ৪৩.৩ মেগাটন CO2e (মোট জাতীয় ১৭.৪%) ২০১৯ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় (NDC রিপোর্ট)
জলবায়ু সহনশীল ফসল প্রদর্শনী প্লট ৫,০০০+ প্লট ২০২১-২২ অর্থবছর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE)
কৃষি ও বনায়ন খাতে কার্বন সঞ্চয়ের লক্ষ্য ১.৫ মিলিয়ন টন CO2e ২০৩০ (NDC-এর অংশ) পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়

উৎস: পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের বার্ষিক প্রতিবেদন ও NDC নথি।

সুপারিশ

  • পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি স্বতন্ত্র 'বাংলাদেশ কার্বন ক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি' প্রতিষ্ঠা করা এবং 'বাংলাদেশ কার্বন ক্রেডিট আইন, ২০২৫' প্রণয়ন করা। এই অথরিটি কার্বন ক্রেডিট প্রকল্পগুলোর নিবন্ধন, যাচাইকরণ এবং ট্রেডিংয়ের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করবে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ নিশ্চিত করবে।
  • কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI)/বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)-এর যৌথ উদ্যোগে একটি 'জলবায়ু সহনশীল কৃষি কার্বন তহবিল' গঠন করা। এই তহবিলের মাধ্যমে কৃষকদের জলবায়ু-বান্ধব কৃষি পদ্ধতি গ্রহণে সরাসরি আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করা হবে, যা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের কার্বন ক্রেডিট প্রকল্পে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করবে।
  • বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এবং পরিবেশ অধিদপ্তর (DoE) এর নেতৃত্বে একটি সমন্বিত 'কার্বন পরিমাপ, প্রতিবেদন ও যাচাইকরণ (MRV) পদ্ধতি' তৈরি ও বাস্তবায়ন করা। এই পদ্ধতিটি কৃষি ও বনায়ন খাতের কার্বন সঞ্চয় ও নিঃসরণ হ্রাসের সঠিক পরিমাপ নিশ্চিত করবে এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করা, যাতে আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে বাংলাদেশের কার্বন ক্রেডিটগুলো গ্রহণযোগ্যতা পায়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শারমিন আক্তার

শারমিন আক্তার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জলবায়ু পরিবর্তন ও কার্বন ক্রেডিট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator