অলিম্পিক ও আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্স-এ আগামীর চ্যালেঞ্জ: প্রস্তুত কি বাংলাদেশ? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অলিম্পিক ও আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্স-এ আগামীর চ্যালেঞ্জ: প্রস্তুত কি বাংলাদেশ?

রায়হান রশীদ  avatar   
রায়হান রশীদ
অলিম্পিক ও আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্স-এ আগামীর চ্যালেঞ্জ: প্রস্তুত কি বাংলাদেশ?
অলিম্পিক ও আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্স-এ আগামীর চ্যালেঞ্জ: প্রস্তুত কি বাংলাদেশ?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি ফ্রান্সের প্যারিসে আসন্ন অলিম্পিক গেমসের উন্মাদনা যখন বিশ্বজুড়ে, তখন বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে একটি প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে: বৈশ্বিক ক্রীড়া মঞ্চ...

সম্প্রতি ফ্রান্সের প্যারিসে আসন্ন অলিম্পিক গেমসের উন্মাদনা যখন বিশ্বজুড়ে, তখন বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে একটি প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে: বৈশ্বিক ক্রীড়া মঞ্চে দেশের অবস্থান আসলে কোথায়? ১৯৭৯ সালে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির সদস্যপদ লাভের পর থেকে বাংলাদেশ আটটি গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করলেও, একটিও পদক জিততে পারেনি। সর্বশেষ টোকিও অলিম্পিকে বাংলাদেশের ছয়জন ক্রীড়াবিদ অংশ নিয়েছিলেন, যাদের কেউই চূড়ান্ত পর্বে পৌঁছাতে পারেননি। এই ধারাবাহিক ব্যর্থতা কেবল ক্রীড়াবিদদের ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা নয়, বরং দেশের সামগ্রিক ক্রীড়া অবকাঠামো, নীতি ও ব্যবস্থাপনার এক গভীর চ্যালেঞ্জের প্রতিচ্ছবি।

বাংলাদেশের ক্রীড়া উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব প্রকট। দেশের তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভাবান অ্যাথলেট খুঁজে বের করার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দুর্বল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণ কার্যক্রম পর্যাপ্ত বাজেট, প্রশিক্ষক এবং আধুনিক সরঞ্জামের অভাবে ধুঁকছে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ এবং সংশ্লিষ্ট ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতাও একটি বড় সমস্যা। একটি সুনির্দিষ্ট 'জাতীয় ক্রীড়া নীতি' থাকলেও, এর বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত হালনাগাদ প্রায়শই উপেক্ষিত থাকে। ফলে, প্রতিভাবান তরুণরা সঠিক পরিচর্যা ও নির্দেশনার অভাবে ঝরে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, সাঁতার, অ্যাথলেটিক্স এবং শুটিংয়ের মতো ব্যক্তিগত ইভেন্টগুলোতে বাংলাদেশের কিছু সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় থাকলেও, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের অভাব তাদের সম্ভাবনাকে বিকশিত হতে দেয় না। পার্শ্ববর্তী অনেক উন্নয়নশীল দেশ যখন তাদের ক্রীড়া উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া বিজ্ঞানীদের সহায়তা নিচ্ছে, তখন বাংলাদেশ এখনো সনাতনী পদ্ধতির উপর নির্ভরশীল।

আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সাফল্যের জন্য অত্যাধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা, ক্রীড়া বিজ্ঞান কেন্দ্র এবং দক্ষ প্রশিক্ষক অপরিহার্য। বাংলাদেশে এই তিনটি ক্ষেত্রেই ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। বিশ্বমানের স্টেডিয়াম ও অনুশীলন কেন্দ্রের সংখ্যা হাতেগোনা, যা জাতীয় দলের চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়, তৃণমূল পর্যায়ের কথা তো বলাই বাহুল্য। ক্রীড়া মনোবিজ্ঞান, পুষ্টিবিজ্ঞান এবং ফিজিওথেরাপি নিয়ে কাজ করার মতো প্রতিষ্ঠান বা বিশেষজ্ঞের সংখ্যাও নগণ্য। ফলস্বরূপ, অ্যাথলেটরা পর্যাপ্ত শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি ছাড়াই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে বাধ্য হয়। পর্যাপ্ত পুষ্টি ও বিজ্ঞানসম্মত অনুশীলনের অভাবে অ্যাথলেটদের কর্মক্ষমতা এবং চোট থেকে সেরে ওঠার ক্ষমতাও ব্যাহত হয়। এর পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক মানের কোচ নিয়োগ এবং স্থানীয় কোচদের উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও, তা দেশের বিশাল চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। উদাহরণস্বরূপ, অনেক উন্নয়নশীল দেশ তাদের ক্রীড়াবিদদের জন্য উচ্চ-উচ্চতার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং অত্যাধুনিক বায়োমেকানিক্স ল্যাবরেটরি স্থাপন করেছে, যা বাংলাদেশের জন্য এখনো স্বপ্ন।

ক্রীড়া উন্নয়নে বিনিয়োগের অপর্যাপ্ততা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। 'বাংলাদেশ সরকার' প্রতি বছর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ করলেও, তা আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া অবকাঠামো নির্মাণ, মানসম্মত প্রশিক্ষণ এবং ক্রীড়াবিদদের দীর্ঘমেয়াদী সহায়তা প্রদানের জন্য যথেষ্ট নয়। অনেক সময় বরাদ্দকৃত তহবিলের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং জবাবদিহিতার অভাবও লক্ষ্য করা যায়। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা যেমন 'World Bank' বা 'ADB' সাধারণত সরাসরি ক্রীড়া খাতে বড় ধরনের অর্থায়ন করে না, তবে তাদের অবকাঠামো উন্নয়ন বা মানবসম্পদ উন্নয়ন সংক্রান্ত প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে ক্রীড়া খাতের উন্নয়নে সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু এই সুযোগগুলোকে কাজে লাগানোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা ও অগ্রাধিকার প্রদানের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) তহবিল থেকে ক্রীড়া খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে। একটি শক্তিশালী ক্রীড়া অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতের সম্মিলিত বিনিয়োগ এবং স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই।

অর্থবছর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বাজেট (কোটি টাকা) জাতীয় বাজেটের শতাংশ অলিম্পিক পদক অর্জন
২০২২-২৩ ১,২২৮ ০.১৯% ০
২০২৩-২৪ ১,৩২৮ ০.২০% ০
২০২৪-২৫ (প্রস্তাবিত) ১,৪২৫ ০.২১% ০

উৎস: যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় বাজেট নথি

সুপারিশ

  • 'যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়' কর্তৃক একটি নতুন 'জাতীয় ক্রীড়া নীতি ২০২৫' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে তৃণমূল থেকে প্রতিভা অন্বেষণ, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতি, দীর্ঘমেয়াদী অ্যাথলেট উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং ক্রীড়া ফেডারেশনগুলির জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য সুনির্দিষ্ট আইন ও বিধিমালা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
  • 'বাংলাদেশ সরকার'কে বার্ষিক জাতীয় বাজেটের ন্যূনতম ০.৫% ক্রীড়া উন্নয়নে বরাদ্দ করতে হবে এবং এই তহবিল সরাসরি 'জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ' এবং নির্বাচিত ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর মাধ্যমে নির্দিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণ, প্রশিক্ষক উন্নয়ন এবং অ্যাথলেট বৃত্তি কর্মসূচিতে ব্যয় করার জন্য একটি 'জাতীয় ক্রীড়া উন্নয়ন তহবিল' গঠন করতে হবে। প্রয়োজনে 'ADB' বা 'World Bank' এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে যুব উন্নয়ন বা অবকাঠামো ঋণের আওতায় ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট প্রকল্প অন্তর্ভুক্তির জন্য আলোচনা শুরু করতে হবে।
  • 'যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়' এর অধীনে একটি আধুনিক 'জাতীয় ক্রীড়া বিজ্ঞান ও চিকিৎসা ইনস্টিটিউট' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা ক্রীড়া মনোবিজ্ঞান, পুষ্টিবিজ্ঞান, বায়োমেকানিক্স এবং ফিজিওথেরাপির উপর গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রদান করবে। এই ইনস্টিটিউট দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে অংশীদারিত্ব স্থাপন করে ক্রীড়া বিজ্ঞানীদের একটি নতুন প্রজন্ম তৈরি করবে এবং জাতীয় দলের জন্য বিজ্ঞানসম্মত প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তা করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রায়হান রশীদ

রায়হান রশীদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: অলিম্পিক ও আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্স। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

コメントがありません


News Card Generator