রাজস্ব খাতে দুর্নীতির কালো ছায়া: শত কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি ও অর্থ পাচার | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

রাজস্ব খাতে দুর্নীতির কালো ছায়া: শত কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি ও অর্থ পাচার

তৌহিদ তানভীর  avatar   
তৌহিদ তানভীর
রাজস্ব খাতে দুর্নীতির কালো ছায়া: শত কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি ও অর্থ পাচার
রাজস্ব খাতে দুর্নীতির কালো ছায়া: শত কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি ও অর্থ পাচার
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের রাজস্ব খাত এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং কর ফাঁকির ঘটনা প্রতিনিয়ত সরকারের রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে। ...

বাংলাদেশের রাজস্ব খাত এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং কর ফাঁকির ঘটনা প্রতিনিয়ত সরকারের রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বিভিন্ন তদন্তে এই খাতের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। একদিকে যেমন শত শত কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি ও অর্থ পাচারের মতো সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত চলছে, তেমনি অন্যদিকে রাজস্ব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ ও হয়রানির অভিযোগও ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। এসব অনিয়মের ফলে দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং সরকারের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ব্যাটারি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান জিউঝু ইন্ডা‌স্ট্রি লি‌মি‌টে‌ডের প্রায় ৩১৭ কোটি ৯২ লাখ ৫১ হাজার ৩৭৮ টাকার মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ফাঁকি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর, মূল্য সংযোজন করের ঢাকা অফিস, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে এই বিপুল পরিমাণ ভ্যাট ফাঁকি উন্মোচন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত মাত্র ২১ মাসে এই বিশাল অঙ্কের ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অবস্থিত শতভাগ চীনা মালিকানাধীন এই কোম্পানি ব্যাটারি উৎপাদন ও বিক্রয়ের বিপরীতে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রকৃত তথ্য গোপন করে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। এই ঘটনায় আইনগত ও বিচারিক কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। একই সময়ে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার করে বিদেশে গড়ে তোলা প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান পেয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত পাঁচটি দেশের সাতটি শহরে অনুসন্ধান চালিয়ে এই তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া, টাকার বিনিময়ে অর্জিত ৩৫২টি পাসপোর্টের সন্ধান পাওয়া গেছে নয়টি দেশে। এসব ঘটনা দেশের রাজস্ব খাতের দুর্বলতা এবং অনিয়মের ব্যাপকতা স্পষ্ট করে তোলে।

রাজস্ব খাতের এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন কিছু অসাধু কর্মকর্তা। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ১১ জন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, কর ফাঁকির সুযোগ দেওয়া এবং করদাতাদের হয়রানির অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করেছে। এসব কর্মকর্তার মধ্যে এনবিআর সদস্য, ভ্যাটের বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) অতিরিক্ত কমিশনার, কর গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক, উপকর কমিশনার এবং যুগ্ম কমিশনার পদমর্যাদার কর্মকর্তারা রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে কর ও শুল্ক ফাঁকির সুযোগ করে দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে। এমনকি, ৭৫ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতির ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও একজন এনবিআর কর্মকর্তাকে লঘুদণ্ড দিয়ে পার করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে, যা রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাবকে প্রকট করে তোলে। একটি জরিপে দেখা গেছে, ৭২% ব্যবসায়ী মনে করেন রাজস্ব কর্মকর্তারা দুর্নীতিগ্রস্ত এবং ৬৫% ব্যবসায়ী শুল্ক-কর বসানোর হিসাব-নিকাশ নিয়ে অবিশ্বাস পোষণ করেন। এই চিত্র রাজস্ব প্রশাসনের প্রতি জনআস্থার সংকট নির্দেশ করে।

এই সামগ্রিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ও এনবিআর কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বিলুপ্ত করে এর পরিবর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে দুটি স্বতন্ত্র সংস্থা—রাজস্ব নীতি বিভাগ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ—গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। এর লক্ষ্য হলো রাজস্ব নীতি নির্ধারণ এবং প্রশাসনের কাজ পৃথক করা, দক্ষতা বৃদ্ধি করা, স্বার্থের সংঘাত কমানো এবং দেশের করভিত্তি সম্প্রসারিত করা। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৭.৪ শতাংশ, যা এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। এই অনুপাত অন্তত ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়াও, ২০২৪ সালের ৬ জুন থেকে নতুন কাস্টমস আইন, ২০২৩ কার্যকর হয়েছে, যা শুল্ক ফাঁকি বা আইনের লঙ্ঘন উদ্ঘাটনের জন্য কর্মকর্তাদের পুরস্কার এবং রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করলে আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা রেখেছে। এই আইনে মিথ্যা তথ্য দিলে বা ঘোষণা বহির্ভূত পণ্য আনলে যাত্রীদের জরিমানার বিধানও রাখা হয়েছে। এনবিআর অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করতে বিশেষ সফটওয়্যার চালু করেছে এবং কর ফাঁকি ধরতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের দুর্বলতা অনুসন্ধানের উদ্যোগ নিয়েছে। করদাতার রিটার্ন তৈরিতে সিস্টেমের ব্যবহার, প্রি-ফিলড ট্যাক্স রিটার্ন চালু এবং ব্যাংক হিসাব, জমি-বাড়ি, গাড়ির মালিকানা ও লেনদেনের তথ্য ব্যবহার করে কর ফাঁকি শনাক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

তবে, এসব উদ্যোগ সত্ত্বেও চ্যালেঞ্জগুলো রয়ে গেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক প্রকাশিত দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান আরও একধাপ অবনতি হয়েছে। রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তাদের মধ্যে বড় ধরনের রদবদল এবং বিভাজন ইস্যুতে আন্দোলনের কারণে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ২৪ কর্মকর্তার শাস্তি মওকুফের আবেদন রাজস্ব প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা নির্দেশ করে। রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে শুধু আইন পরিবর্তন বা ডিজিটাল ব্যবস্থা প্রবর্তন করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। করছাড়ের মতো বিষয়গুলোতেও স্বচ্ছতার অভাব এবং বিশেষ গোষ্ঠীর সুবিধা পাওয়ার প্রবণতা সংস্কার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। একটি কার্যকর ও দুর্নীতিমুক্ত রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে কাঠামোগত সংস্কারের পাশাপাশি কঠোর জবাবদিহিতা এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার আপস না করার নীতি গ্রহণ করতে হবে।

সুপারিশ: বাংলাদেশের রাজস্ব খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী রাজস্ব গোয়েন্দা ইউনিট গঠন করা অপরিহার্য, যার সরাসরি তদারকি থাকবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে, এনবিআরের অভ্যন্তরীণ প্রভাবমুক্ত থেকে। এই ইউনিটকে আধুনিক প্রযুক্তি ও ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহারের পূর্ণ ক্ষমতা দিতে হবে, যাতে কর ফাঁকি, শুল্ক অনিয়ম এবং অর্থ পাচারের ঘটনাগুলো দ্রুত ও কার্যকরভাবে শনাক্ত এবং তদন্ত করা যায়। একইসাথে, রাজস্ব কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা ও সততার উপর ভিত্তি করে পদোন্নতি ও পুরস্কারের একটি সুনির্দিষ্ট ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া চালু করতে হবে এবং দুর্নীতির প্রমাণিত ঘটনায় কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে, যেন কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাবে শাস্তির লঘুকরণ না হয়।


🔎 অনুসন্ধানে: তৌহিদ তানভীর

তৌহিদ তানভীর, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: রাজস্ব, কাস্টমস, শুল্ক ও এনবিআর অনিয়ম।

コメントがありません


News Card Generator