সম্প্রতি প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর একটি প্রাথমিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে মানসিক অস্থিরতা, উদ্বেগ ও বিষণ্ণতার হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার সাথে ডিজিটাল স্ক্রিনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি একটি সুস্পষ্ট সম্পর্ক স্থাপন করেছে। এই প্রতিবেদন শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি অদৃশ্য একাকিত্বের এক নতুন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যা আমাদের তরুণদের মনোজগৎকে নীরবে গ্রাস করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৪ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে যারা দৈনিক ৬ ঘণ্টার বেশি সময় ডিজিটাল স্ক্রিনে ব্যয় করে, তাদের মধ্যে সামাজিক বিচ্ছিন্নতাবোধ এবং একাকিত্বের অনুভূতি অন্যদের তুলনায় প্রায় ৪০% বেশি। এই পরিসংখ্যানগুলো প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে যে, ডিজিটাল যোগাযোগ বুঝি সামাজিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করে। বরং, এটি এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ তৈরি করছে, যেখানে ভার্চুয়াল সংযোগের প্রাচুর্য বাস্তব জীবনের গভীর সম্পর্কগুলোকে ম্লান করে দিচ্ছে।
এই অদৃশ্য একাকিত্বের মূল কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, ডিজিটাল স্ক্রিন-নির্ভর জীবনযাপন তরুণদের মধ্যে দুটি বিপরীতমুখী মানসিক প্রক্রিয়াকে উদ্দীপিত করে। প্রথমত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে যেখানে ব্যক্তিরা নিজেদের জীবনের 'সেরা সংস্করণ' উপস্থাপন করতে সচেষ্ট হয়। এই অবিরাম পারফেকশনিস্টিক প্রদর্শনী অন্যের মনে হীনম্মন্যতা ও অযোগ্যতার অনুভূতি তৈরি করে, যা তাদের নিজেদের বাস্তব জীবনের অপ্রতুলতা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তাভাবনা করতে বাধ্য করে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা এই প্রবণতাকে 'সামাজিক তুলনা তত্ত্ব' (Social Comparison Theory) এর একটি আধুনিক দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যেখানে ভার্চুয়াল জগতে অন্যের আপাত সাফল্যের সাথে নিজেদের তুলনা করে তরুণরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এই তুলনা শুধু মানসিক চাপই বাড়ায় না, বরং আত্মসম্মানবোধ কমিয়ে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত তাদের প্রকৃত সামাজিক মেলামেশা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, কারণ তারা মনে করে তাদের জীবন অন্যের মতো 'আকর্ষণীয়' নয়। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে উপলব্ধ তথ্যের অসীম প্রবাহ এবং বিনোদনমূলক কনটেন্টের সহজলভ্যতা তরুণদের মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণের একটি কৃত্রিম চক্র তৈরি করে। এই দ্রুত এবং সহজলভ্য আনন্দ বাস্তব জীবনের দীর্ঘমেয়াদী এবং অর্থপূর্ণ কার্যকলাপ থেকে প্রাপ্ত সন্তুষ্টিকে ম্লান করে দেয়। ফলস্বরূপ, খেলাধুলা, সৃজনশীল কাজ বা মুখোমুখি সামাজিক যোগাযোগের মতো যে সমস্ত কার্যকলাপ মস্তিষ্কের সুস্থ বিকাশে এবং সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক, সেগুলোর প্রতি তাদের আগ্রহ কমে যায়। এই আসক্তি শেষ পর্যন্ত মস্তিষ্কের পুরস্কার ব্যবস্থাকে (Reward System) ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা তাদের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা হ্রাস করে এবং দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য নির্ধারণে বাধা দেয়।
ডিজিটাল স্ক্রিনের এই ব্যাপক প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত মানসিক স্বাস্থ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও এটি একটি ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এর অধীনে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম ঘুম চক্রের ব্যাঘাত ঘটায়, যা মেজাজ পরিবর্তন, মনোযোগের অভাব এবং এমনকি দীর্ঘস্থায়ী মানসিক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। ইনস্টিটিউট অফ এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (IEDCR) এর তথ্য অনুযায়ী, স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিদ্রা ও নিদ্রাহীনতার হার গত পাঁচ বছরে প্রায় ২০% বৃদ্ধি পেয়েছে, যার একটি বড় কারণ হলো ঘুমানোর আগে স্মার্টফোন ও ট্যাব ব্যবহার। এই ঘুমের অভাব শুধু দিনের বেলায় তাদের কর্মক্ষমতা হ্রাস করে না, বরং মানসিক স্থিতিশীলতাকেও দুর্বল করে। এছাড়া, অনলাইন গেমিং আসক্তি এবং সাইবার বুলিং এর মতো সমস্যাগুলোও তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং চরম ক্ষেত্রে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়াচ্ছে। এই সমস্যাগুলোর মোকাবেলায় বিদ্যমান মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবাগুলো প্রায়শই অপ্রতুল প্রমাণিত হচ্ছে, কারণ তরুণদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা চাওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক কুসংস্কার এখনও একটি বড় বাধা। অন্যদিকে, মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবাতে ব্যবহৃত ওষুধের সহজলভ্যতা ও মান নিয়ন্ত্রণে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানসিক অসুস্থতা বৃদ্ধির সাথে সাথে, মনো-চিকিৎসকদের দ্বারা নির্ধারিত প্রয়োজনীয় ঔষধসমূহের মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারে এদের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা DGDA এর একটি প্রধান দায়িত্ব, যা পরোক্ষভাবে এই ক্রমবর্ধমান মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের ব্যবস্থাপনায় সহায়ক। তবে, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে কেবল চিকিৎসার মাধ্যমে এই ব্যাপক সমস্যা মোকাবেলা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
| বছর | তরুণদের মধ্যে দৈনিক স্ক্রিন ব্যবহারের গড় (ঘণ্টা) | আত্ম-প্রতিবেদিত বিষণ্ণতার লক্ষণ (শতাংশ) | মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা চাওয়ার হার (শতাংশ) | ডিজিটাল স্ক্রিন সম্পর্কিত ঘুমের ব্যাঘাতের হার (শতাংশ) |
|---|---|---|---|---|
| ২০১৯ | ৩.৫ | ১২% | ৫% | ১৫% |
| ২০২১ | ৫.২ | ১৮% | ৭% | ২২% |
| ২০২৩ | ৬.৮ | ২৫% | ১০% | ৩০% |
উৎস: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর যৌথ সমীক্ষা, ২০২৩
সুপারিশ
- স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) কর্তৃক একটি সুনির্দিষ্ট 'জাতীয় ডিজিটাল সুস্থতা নীতিমালা' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হোক, যা ১৪ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের জন্য দৈনিক স্ক্রিন ব্যবহারের সময়সীমা, ডিজিটাল শিষ্টাচার এবং অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করবে। এই নীতিমালায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে স্কুল ও কলেজের পাঠ্যক্রমে ডিজিটাল সুস্থতা বিষয়ক অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করার বিধান রাখা জরুরি।
- জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে দেশের প্রতিটি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে 'স্কুল-ভিত্তিক মনো-সামাজিক সহায়তা কেন্দ্র' স্থাপন করা হোক। এই কেন্দ্রগুলোতে প্রশিক্ষিত মনোবিজ্ঞানী ও কাউন্সিলর নিয়োগ দিয়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং, কাউন্সেলিং এবং অভিভাবকদের জন্য কর্মশালার আয়োজন করা হবে, যা ডিজিটাল স্ক্রিন-জনিত মানসিক চাপ ও একাকিত্ব প্রাথমিক পর্যায়ে সনাক্ত ও মোকাবেলা করতে সহায়ক হবে।
- ইনস্টিটিউট অফ এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (IEDCR) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর নেতৃত্বে একটি ব্যাপক ও দীর্ঘমেয়াদী 'জাতীয় সচেতনতা ও প্রতিরোধ অভিযান' শুরু করা হোক, যা প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল মিডিয়া ব্যবহার করে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ঝুঁকি এবং স্বাস্থ্যকর ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তোলার গুরুত্ব সম্পর্কে জনসাধারণকে, বিশেষ করে তরুণ ও তাদের অভিভাবকদের সচেতন করবে। এই অভিযান 'জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলপত্র' এর অধীনে পরিচালিত হবে এবং নিয়মিতভাবে এর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হবে।