দখল ও দূষণে বিপন্ন ডাকাতিয়া নদী: সাত শতাধিক স্থাপনায় অস্তিত্ব সংকটের মুখে নৌপথ.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

দখল ও দূষণে বিপন্ন ডাকাতিয়া নদী: সাত শতাধিক স্থাপনায় অস্তিত্ব সংকটের মুখে নৌপথ..

Akhter Hossain avatar   
Akhter Hossain
দখল ও দূষণে বিপন্ন ডাকাতিয়া নদী: সাত শতাধিক স্থাপনায় অস্তিত্ব সংকটের মুখে নৌপথ..
দখল ও দূষণে বিপন্ন ডাকাতিয়া নদী: সাত শতাধিক স্থাপনায় অস্তিত্ব সংকটের মুখে নৌপথ..
ছবি: সংগৃহীত
চাঁদপুরের ডাকাতিয়া নদী দখল করে সাত শতাধিক অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ ও বালু উত্তোলনের ফলে নদীটি তার স্বাভাবিক নাব্যতা হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে, যা স্থানীয় জনজীবন ও অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।..

চাঁদপুরের প্রাণপ্রবাহ হিসেবে পরিচিত ডাকাতিয়া নদী বর্তমানে চরম অস্তিত্ব সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে চলা দখল, মাটি-বালু উত্তোলন এবং কচুরিপানার ব্যাপক বিস্তারের ফলে নদীটি একদিকে যেমন সরু হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে এর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ডাকাতিয়ার দুই তীরে সাত শতাধিক অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে, যা নদী রক্ষার সরকারি উদ্যোগ ও প্রশাসনিক নজরদারি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে। চাঁদপুর শহর থেকে শুরু করে সদর, ফরিদগঞ্জ, হাজীগঞ্জ ও শাহরাস্তির বিভিন্ন অংশে নদীর বুক দখল করে ডকইয়ার্ড, বালুর ব্যবসা এবং স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের হিড়িক পড়েছে। বিশেষ করে ঢালীঘাট, বাগাদী নিজগাছতলা, রামপুর ও হাজীগঞ্জ বাজারের আশপাশে দখলদারদের দৌরাত্ম্য চরমে পৌঁছেছে, যার ফলে খরস্রোতা নদীটি এখন নৌযান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে এবং এর জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে।

নদীর এই করুণ দশায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন স্থানীয় জেলে, ব্যবসায়ী এবং নদীকেন্দ্রিক পেশাজীবীরা। অবৈধ দখলদারদের কবলে পড়ে নদী সংকুচিত হওয়ায় বড় নৌযান চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে পণ্য পরিবহন ও স্থানীয় বাজারে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নদীর সীমানা দখল করে গড়ে তোলা স্থাপনাগুলো শুধু নৌপথই সরু করছে না, বরং বালু ও বর্জ্য নদীতে ফেলার ফলে নাব্যতা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। ফরিদগঞ্জের স্থানীয় জেলেরা জানান, কচুরিপানার স্তূপ ও অবৈধ জালের প্রভাবে মাছের প্রজনন ক্ষেত্রগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে, যা তাদের আয়ের উৎসকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। নদী তীরবর্তী বাসিন্দাদের মতে, দখলমুক্ত করার নামে মাঝে মধ্যে লোক দেখানো অভিযান চললেও স্থায়ী কোনো সমাধান আসছে না, ফলে দখলদাররা পুনরায় সরকারি জায়গা দখল করতে সাহস পাচ্ছে।

নদী রক্ষার দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন পরিবেশ সচেতন মহল। বিআইডব্লিউটিএ, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ের অভাবকে এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। যদিও অতীতে অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরির কথা জানানো হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে উচ্ছেদ অভিযানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। এছাড়া চলতি বছরের আগস্ট মাসে বাঘড়া বাজার এলাকায় নদী থেকে মাটি উত্তোলন ও খাল ভরাটের অভিযোগে দায়ের করা মামলা প্রমাণ করে যে, প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দখল প্রক্রিয়া এখনো চলমান। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, নিয়মিত নজরদারি ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তবে মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে, কার্যকর মনিটরিং ও সীমানা নির্ধারণের অভাবই দখলবাজদের উৎসাহিত করছে।

ডাকাতিয়া নদীর এই সংকট কেবল স্থানীয় পরিবেশের সমস্যা নয়, বরং এটি একটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নদীপথ সংকুচিত হওয়ায় সড়কপথের ওপর চাপ বাড়ছে, যা পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে ব্যয়বহুল করে তুলছে। অবিলম্বে নদীর সীমানা নির্ধারণ, ডিজিটাল জরিপ এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পর পুনরায় দখল ঠেকানোর জন্য স্থায়ী নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। কেবল কমিটি গঠন বা দায়সারা উচ্ছেদ অভিযান নয়, বরং ডাকাতিয়াকে বাঁচাতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ড্রেজিং এবং নদী দখল ও দূষণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। অন্যথায়, নদীটি তার স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়ে অদূর ভবিষ্যতে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে, যা চাঁদপুরের ইতিহাস ও অর্থনীতির ওপর অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনবে।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator