ব্লকচেইন, ক্রিপ্টো ও ওয়েব৩-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ | আই নিউজ বিডি

ব্লকচেইন, ক্রিপ্টো ও ওয়েব৩-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ

সাজিদ মাহমুদ  avatar   
সাজিদ মাহমুদ
ব্লকচেইন, ক্রিপ্টো ও ওয়েব৩-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ
ব্লকচেইন, ক্রিপ্টো ও ওয়েব৩-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ
ছবি: সংগৃহীত
ব্লকচেইন, ক্রিপ্টো ও ওয়েব৩-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ

ব্লকচেইন, ক্রিপ্টো ও ওয়েব৩-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) কর্তৃক অবৈধ ক্রিপ্টোকারেন্সি ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের বিরুদ্ধে জারি করা সতর্কতা দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে ব্লকচেইন, ক্রিপ্টো এবং ওয়েব৩ প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং একই সাথে এর নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তাকে পুনরায় সামনে এনেছে। বিশ্বজুড়ে যখন এই উদীয়মান প্রযুক্তিগুলো অর্থায়ন, ডেটা ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল পরিচয়ের ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে, তখন বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এর সম্ভাবনা এবং ঝুঁকি উভয়ই গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। শুধু বিটিআরসি-র সতর্কতা নয়, বরং বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারের দ্রুত পরিবর্তন এবং নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরির প্রেক্ষাপটে আমাদের একটি সুসংহত কৌশল নির্ধারণ করা অপরিহার্য।

ব্লকচেইন প্রযুক্তির অন্তর্নিহিত বিকেন্দ্রীকরণ এবং অপরিবর্তনীয়তা ডিজিটাল লেনদেন এবং ডেটা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল পরিচয় প্রমাণীকরণ, স্বাস্থ্যসেবা এবং জমি নিবন্ধন সহ বিভিন্ন খাতে ব্লকচেইনের ব্যবহার পরীক্ষা করছে। উদাহরণস্বরূপ, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনায় ব্লকচেইনের ব্যবহার ৩০% বৃদ্ধি পেতে পারে, যা দক্ষতা বৃদ্ধি এবং জালিয়াতি রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এই প্রবণতার বিপরীতে, বাংলাদেশে এই প্রযুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক গ্রহণ এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)-এর কিছু সদস্য প্রতিষ্ঠান সীমিত পরিসরে ব্লকচেইনভিত্তিক সমাধান নিয়ে কাজ করলেও, জাতীয় পর্যায়ে এর ব্যাপক প্রয়োগের জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপের অভাব পরিলক্ষিত হয়। এই প্রযুক্তিকে কেবল ক্রিপ্টোকারেন্সির সাথে সম্পর্কিত একটি ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে না দেখে, এর বহুমুখী সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা জরুরি।

ওয়েব৩, যা ব্লকচেইন প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে তৈরি, ইন্টারনেটের পরবর্তী প্রজন্ম হিসেবে ব্যক্তিগত ডেটা নিয়ন্ত্রণ, বিকেন্দ্রীভূত অ্যাপ্লিকেশন (dApps) এবং ডিজিটাল মালিকানার ধারণা নিয়ে এসেছে। এই প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহারকারীদের ডেটার উপর অধিক নিয়ন্ত্রণ প্রদান করে এবং মধ্যস্থতাকারীদের উপর নির্ভরতা কমায়, যা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের একচেটিয়া আধিপত্যের বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বর্তমানে, বৈশ্বিক ওয়েব৩ ইকোসিস্টেমে বিকেন্দ্রীভূত ফিনান্স (DeFi) এবং নন-ফাঞ্জিবল টোকেন (NFTs) বাজার ট্রিলিয়ন ডলারের লেনদেন প্রত্যক্ষ করছে। তবে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপাপটে ওয়েব৩-এর সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য দক্ষ জনবল তৈরি এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়ন অপরিহার্য। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (আইসিটি ডিভিশন) এবং এটুআই (a2i) যৌথভাবে ডিজিটাল স্বাক্ষর এবং ডেটা নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে ব্লকচেইনের প্রাথমিক প্রয়োগ নিয়ে গবেষণা করছে, যা সরকারি সেবা সহজীকরণে সহায়ক হতে পারে। বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (বিএইচটিপিএ)-এর অধীনে স্থাপিত হাই-টেক পার্কগুলোতে ব্লকচেইন ও ওয়েব৩ স্টার্টআপদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা গেলে এটি দেশের প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে, যা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

সূচক ২০২২ সালের তথ্য/অনুমান ২০২৭ সালের সম্ভাব্য লক্ষ্যমাত্রা/প্রক্ষেপণ
বৈশ্বিক ব্লকচেইন বাজার আকার (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ১১.৮৪ ১৬৩.৮৩
চেইনঅ্যানালাইসিস গ্লোবাল ক্রিপ্টো অ্যাডাপশন ইনডেক্স-এ বাংলাদেশের অবস্থান ২৬তম শীর্ষ ২০-এ উন্নীতকরণ
আইসিটি ডিভিশন কর্তৃক পরিচালিত ব্লকচেইন/ওয়েব৩ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পেশাজীবীর সংখ্যা প্রায় ১,৫০০ ১০,০০০ (পরিকল্পিত)
বিএইচটিপিএ-এর আওতাধীন হাই-টেক পার্কসমূহে ব্লকচেইন/ওয়েব৩ স্টার্টআপের সংখ্যা ১২টি ৫০টি (লক্ষ্যমাত্রা)
বেসিস-এর সদস্য প্রতিষ্ঠানসমূহে ব্লকচেইনভিত্তিক সমাধান প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৫টি ১০০টি (লক্ষ্যমাত্রা)

উৎস: মার্কেটসঅ্যান্ডমার্কেটস, চেইনঅ্যানালাইসিস, আইসিটি ডিভিশন, বিএইচটিপিএ, বেসিস (প্রক্ষেপণ ও আনুমানিক তথ্য)।

সুপারিশ

  • আইসিটি ডিভিশন, বিটিআরসি এবং বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সমন্বয়ে একটি আন্তঃসংস্থা কমিটি গঠন করে 'ডিজিটাল অ্যাসেট রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক' প্রণয়ন করতে হবে। এই ফ্রেমওয়ার্কে ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন, লাইসেন্সিং এবং ব্লকচেইনভিত্তিক উদ্ভাবনের জন্য একটি নিয়ন্ত্রিত স্যান্ডবক্স পরিবেশ অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যা বিএইচটিপিএ-এর আওতাধীন হাই-টেক পার্কগুলোতে পাইলট প্রকল্প হিসেবে শুরু হতে পারে।
  • এটুআই এবং বেসিস যৌথভাবে 'জাতীয় ব্লকচেইন ও ওয়েব৩ দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি' চালু করবে, যার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ্যক্রমে ব্লকচেইন প্রযুক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং প্রযুক্তি পেশাজীবীদের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা আয়োজন করা হবে। এই কর্মসূচির লক্ষ্য থাকবে আগামী পাঁচ বছরে ১০,০০০ ব্লকচেইন ডেভেলপার ও বিশেষজ্ঞ তৈরি করা, যা দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
  • আইসিটি ডিভিশনের নেতৃত্বে, এটুআই এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সহযোগিতায় সরকারি সেবাগুলিতে ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করতে হবে। প্রাথমিকভাবে, ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থার ডিজিটাইজেশন এবং সরকারি সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় (e-GP) স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে ব্লকচেইনভিত্তিক সমাধান প্রয়োগ করা যেতে পারে, যা 'স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১' রূপকল্পের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সাজিদ মাহমুদ

সাজিদ মাহমুদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ব্লকচেইন, ক্রিপ্টো ও ওয়েব৩। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No comments found


News Card Generator