সম্প্রতি শেষ হওয়া ১৯তম এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদদের পারফরম্যান্স আবারও দেশের ক্রীড়াঙ্গনের একটি গভীর সংকটের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছে। যেখানে কাবাডিতে রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ পদক এবং ক্রিকেট ও আরচারিতে কিছু সাফল্য এসেছে, সেখানে অধিকাংশ ডিসিপ্লিনে প্রত্যাশিত ফলাফলের অভাব চোখে পড়ার মতো। এই ফলাফল শুধু অ্যাথলিটদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং এর মূলে রয়েছে বাংলাদেশের স্পোর্টস সায়েন্স ও অ্যাথলিট পারফরম্যান্স ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অবহেলা ও কাঠামোগত দুর্বলতা। আধুনিক ক্রীড়াজগতে যেখানে প্রতিটি পদকের পেছনে নিবিড় বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা, পুষ্টি, মনস্তত্ত্ব ও বায়োমেকানিক্সের প্রয়োগ অপরিহার্য, সেখানে বাংলাদেশ এখনও অনেকটাই প্রথাগত পদ্ধতির উপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরতা আমাদের অ্যাথলিটদের আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের সেরাটা দিতে বাধা দিচ্ছে, যা একদিকে যেমন তাদের সম্ভাবনাকে সীমিত করছে, অন্যদিকে দেশের ক্রীড়া অর্থনীতির বিকাশকেও বাধাগ্রস্ত করছে।
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে স্পোর্টস সায়েন্সের অনুপস্থিতি একটি প্রকট সমস্যা। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ কর্তৃক পরিচালিত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে এখনও স্পোর্টস নিউট্রিশন, স্পোর্টস সাইকোলজি, বায়োমেকানিক্স বা অ্যাডভান্সড ফিজিওথেরাপির মতো বিষয়গুলো সেভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। দেশের হাতেগোনা কয়েকটি ক্রীড়া ফেডারেশন ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু কার্যক্রম চালালেও, তা সামগ্রিক ক্রীড়া উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট নয়। উদাহরণস্বরূপ, একজন আন্তর্জাতিক মানের অ্যাথলিটের জন্য প্রয়োজন একজন ডেডিকেটেড স্পোর্টস ফিজিশিয়ান, একজন স্পোর্টস নিউট্রিশনিস্ট, একজন স্পোর্টস সাইকোলজিস্ট এবং বায়োমেকানিক্স বিশেষজ্ঞ। বাংলাদেশে এসব ক্ষেত্রে পেশাদার জনবলের অভাব তীব্র। হাতেগোনা যে কজন স্পোর্টস সায়েন্স গ্র্যাজুয়েট রয়েছেন, তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত, ফলে অনেকেই এই পেশায় আসতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। প্রশিক্ষণ ক্যাম্পগুলোতেও আধুনিক ডাটা অ্যানালাইসিস বা পারফরম্যান্স মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা অপ্রতুল। অ্যাথলিটদের শারীরিক সক্ষমতা, দুর্বলতা এবং উন্নতির ক্ষেত্রগুলো বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে চিহ্নিত করার জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণাগার ও সরঞ্জামের অভাব দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে পিছিয়ে রাখছে। এটি শুধু শীর্ষস্থানীয় অ্যাথলিটদের ক্ষেত্রেই নয়, তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভা অন্বেষণ ও তাদের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নেও বড় বাধা সৃষ্টি করছে।
এই সংকট সত্ত্বেও বাংলাদেশের স্পোর্টস সায়েন্স ও অ্যাথলিট পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে বিপুল সম্ভাবনা বিদ্যমান। দেশের যুব সমাজের মধ্যে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ প্রবল এবং প্রাকৃতিক শারীরিক সক্ষমতাও যথেষ্ট। সঠিক পরিচর্যা ও বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব। উন্নত অবকাঠামো এবং দক্ষ জনবল তৈরি করা গেলে বাংলাদেশের অ্যাথলিটরা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আরও ভালো ফল করতে পারবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। World Bank এবং ADB-এর মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো সাধারণত সরাসরি ক্রীড়া বিজ্ঞানে বিনিয়োগ না করলেও, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে তাদের প্রকল্পগুলোর সাথে সমন্বয় করে ক্রীড়া বিজ্ঞানের প্রসার ঘটানো যেতে পারে। যেমন, তাদের কারিগরি সহায়তা কর্মসূচির আওতায় স্পোর্টস সায়েন্স ডিগ্রি ও ডিপ্লোমা কোর্স চালু করা, বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা বা গবেষণাগার স্থাপনে পরামর্শ গ্রহণ করা যেতে পারে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে অ্যাথলিটদের জন্য একটি বিজ্ঞানভিত্তিক পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব, যা কেবল তাদের পারফরম্যান্সকেই উন্নত করবে না, বরং দেশের ক্রীড়া অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে। অ্যাথলিটদের ব্র্যান্ড ভ্যালু বৃদ্ধি পাবে, ক্রীড়া পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হবে এবং ক্রীড়া পর্যটনেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আধুনিক ক্রীড়াঙ্গনে সাফল্যের জন্য শুধু আবেগ ও কঠোর পরিশ্রম যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক কৌশল ও সুসংগঠিত ব্যবস্থাপনা। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ক্রীড়া দেশগুলো তাদের অ্যাথলিটদের পারফরম্যান্সকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে স্পোর্টস সায়েন্সকে অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের জন্য এই পথ অনুসরণ করা জরুরি। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদকে তাদের বাজেট বরাদ্দ ও অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে স্পোর্টস সায়েন্সকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্পোর্টস সায়েন্স বিভাগ খোলা এবং সেখানে গবেষণা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদী অ্যাথলিট উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি ফেডারেশনকে বাধ্যতামূলকভাবে স্পোর্টস সায়েন্স ইউনিট গঠন করতে হবে। অ্যাথলিটদের ইনজুরি প্রতিরোধ, দ্রুত সুস্থতা এবং মানসিক প্রস্তুতিতে স্পোর্টস সায়েন্সের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এই বিনিয়োগের সুফল কেবল আন্তর্জাতিক পদকের মাধ্যমেই নয়, বরং একটি সুস্থ ও কর্মঠ জাতি গঠনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
| ক্ষেত্র | ২০২৩-২৪ অর্থবছর (আনুমানিক) | প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ/জনবল (আনুমানিক) | ঘাটতি (শতাংশ) |
|---|---|---|---|
| ক্রীড়া খাতে বাজেট (জিডিপি'র %) | ০.০১% | ০.০৫% | ৮০% |
| জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে স্পোর্টস সায়েন্স বিশেষজ্ঞ (জনবল) | ৫ জন | ৫০ জন | ৯০০% |
| আধুনিক স্পোর্টস সায়েন্স ল্যাব (সংখ্যা) | ১টি (আংশিক) | ১০টি | ৯০০% |
| বিশ্ববিদ্যালয়ে স্পোর্টস সায়েন্স/ফিজিও বিভাগ (সংখ্যা) | ৩টি (আংশিক) | ১৫টি | ৪০০% |
| জাতীয় দলগুলোর জন্য পূর্ণকালীন স্পোর্টস সাইকোলজিস্ট (জনবল) | ২ জন | ২০ জন | ৯০০% |
উৎস: যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় প্রকাশিত বাজেট সারসংক্ষেপ (২০২৩-২৪), জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন ক্রীড়া বিশেষজ্ঞের মতামত।
সুপারিশ
- যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় অবিলম্বে 'জাতীয় ক্রীড়া বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট' প্রতিষ্ঠা করে এটিকে একটি স্বায়ত্তশাসিত গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলুক। এই ইনস্টিটিউটকে একটি নির্দিষ্ট বার্ষিক বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হোক এবং এটি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ও বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সাথে সমন্বয় করে অ্যাথলিটদের বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও ডাটা অ্যানালাইসিসের কাজ করবে।
- বাংলাদেশ সরকার, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে স্পোর্টস সায়েন্স, স্পোর্টস মেডিসিন ও স্পোর্টস নিউট্রিশন বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ডিগ্রি ও ডিপ্লোমা কোর্স চালু করার জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করুক। World Bank ও ADB-এর কারিগরি সহায়তা কর্মসূচির আওতায় বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক, যাতে দক্ষ পেশাদার তৈরি করা যায়।
- জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ 'জাতীয় ক্রীড়া বিজ্ঞান নীতি ২০২৫' প্রণয়ন করুক, যেখানে প্রতিটি জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশনের জন্য অ্যাথলিট পারফরম্যান্স মনিটরিং, ইনজুরি ম্যানেজমেন্ট এবং পুষ্টি পরিকল্পনার জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ বাধ্যতামূলক করা হবে। এই নীতিতে প্রতিটি ফেডারেশনকে নির্দিষ্ট সংখ্যক স্পোর্টস সায়েন্স পেশাদার নিয়োগের বাধ্যবাধকতা অন্তর্ভুক্ত করা হোক এবং এর বাস্তবায়ন নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা রাখা হোক।