সংক্রামক ও অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ খাতে পরিবর্তনের ঢেউ: কারণ, প্রভাব ও প্রতিকার | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

সংক্রামক ও অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ খাতে পরিবর্তনের ঢেউ: কারণ, প্রভাব ও প্রতিকার

ডা. তৌহিদ হাসান  avatar   
ডা. তৌহিদ হাসান
সংক্রামক ও অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ খাতে পরিবর্তনের ঢেউ: কারণ, প্রভাব ও প্রতিকার
সংক্রামক ও অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ খাতে পরিবর্তনের ঢেউ: কারণ, প্রভাব ও প্রতিকার
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত জাতীয় অসংক্রামক রোগ (NCD) জরিপের প্রাথমিক ফলাফল জনস্বাস্থ্য...

সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত জাতীয় অসংক্রামক রোগ (NCD) জরিপের প্রাথমিক ফলাফল জনস্বাস্থ্যের এক নতুন চিত্র তুলে ধরেছে। এই জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা এবং অন্যান্য অসংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত, যা গত এক দশকে ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে, মশাবাহিত রোগ যেমন ডেঙ্গু এবং চিকুনগুনিয়ার বারবার প্রাদুর্ভাব সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান দুর্বলতাগুলোকে স্পষ্ট করেছে। এই দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ, একদিকে অসংক্রামক ব্যাধির ক্রমবর্ধমান বোঝা এবং অন্যদিকে সংক্রামক ব্যাধির পুনরাবৃত্তি, দেশের স্বাস্থ্য খাতে এক গভীর পরিবর্তনের ঢেউ নিয়ে এসেছে, যার কারণ, প্রভাব এবং প্রতিকার নিয়ে একটি সুচিন্তিত বিশ্লেষণ এখন সময়ের দাবি।

এই পরিবর্তনের মূলে রয়েছে বেশ কয়েকটি কারণ। প্রথমত, দ্রুত নগরায়ন এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন। গ্রামীণ জীবন ছেড়ে শহরের দিকে মানুষের ধাবিত হওয়া, ফাস্ট ফুডের সহজলভ্যতা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং মানসিক চাপ বৃদ্ধি অসংক্রামক ব্যাধির বিস্তারে সরাসরি অবদান রাখছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বারবার সতর্ক করেছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এই জীবনযাত্রার পরিবর্তন NCD-এর প্রকোপ বাড়াচ্ছে। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সংক্রামক ব্যাধির জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের ফলে মশার প্রজনন ক্ষেত্র বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া এবং অন্যান্য ভেক্টর-বাহিত রোগের বিস্তারকে ত্বরান্বিত করছে। তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা একটি বড় কারণ। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা স্তরে রোগ নির্ণয়, প্রতিরোধ এবং রেফারেল ব্যবস্থার অপ্রতুলতা উভয় প্রকার ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে বাধা সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MoHFW) এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সমন্বিত কৌশল প্রণয়নে এখনও অনেক কাজ বাকি। চতুর্থত, জনসচেতনতার অভাব এবং স্বাস্থ্য শিক্ষায় বিনিয়োগের অপ্রতুলতা রোগের বিস্তারকে আরও জটিল করে তুলছে। মানুষ প্রায়শই রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলোকে উপেক্ষা করে, যার ফলে রোগ গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়, যা চিকিৎসার খরচ এবং জটিলতা উভয়ই বৃদ্ধি করে।

এই পরিবর্তনের প্রভাব সুদূরপ্রসারী এবং বহুমাত্রিক। জনস্বাস্থ্য খাতে এর চাপ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অসংক্রামক ব্যাধিগুলির দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ব্যয় যেমন ব্যক্তির আর্থিক সামর্থ্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তেমনি দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য বাজেটকেও প্রভাবিত করে। বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB)-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয়ের অপ্রতুলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা মাথাপিছু স্বাস্থ্যসেবার মানকে প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে, NCD-এর কারণে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে, সংক্রামক ব্যাধির প্রাদুর্ভাব জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে, পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্যকে ব্যাহত করে এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলির ওপর অপ্রত্যাশিত চাপ সৃষ্টি করে। উদাহরণস্বরূপ, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের সময় হাসপাতালগুলিতে রোগীর ভিড় এবং শয্যা সংকটের বিষয়টি প্রতি বছরই দেখা যায়। এই পরিস্থিতি স্বাস্থ্য খাতের কর্মীদের ওপর মানসিক চাপও বৃদ্ধি করে এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত করে। এছাড়া, রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থার অভাব জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অপ্রতুলতা, এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, যেমন Fourth Health, Population and Nutrition Sector Program (HPNSP), এই সমস্যাগুলি মোকাবেলায় কাজ করলেও, এর সুফল এখনও পুরোপুরি তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

এই সংকট নিরসনে কার্যকর প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যাবশ্যক। এর জন্য একটি সমন্বিত এবং বহু-খাতভিত্তিক পদ্ধতির প্রয়োজন। কেবল চিকিৎসা সেবার ওপর নির্ভর না করে, রোগ প্রতিরোধ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে (MoHFW) অন্যান্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় যেমন স্থানীয় সরকার, কৃষি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, নগরায়ন পরিকল্পনা এবং খাদ্য নীতি প্রণয়নে জনস্বাস্থ্য বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার জন্য অত্যাধুনিক বায়োটেকনোলজি এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করা জরুরি। টেলিকনসালটেশন এবং মোবাইল হেলথ অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। জনস্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে সহযোগিতা জোরদার করাও প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংক এবং এডিবি'র মতো উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা যেতে পারে। সর্বোপরি, একটি শক্তিশালী জনস্বাস্থ্য কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে রোগের পূর্বাভাস, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং কার্যকর হস্তক্ষেপের ব্যবস্থা থাকবে, তা বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অপরিহার্য।

রোগের প্রকার সূচক ২০১১ সাল (%) ২০১৭ সাল (%) ২০২২ সাল (প্রাথমিক তথ্য) (%)
অসংক্রামক ব্যাধি (NCD) উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ (১৮+ বছর) ২২.৮ ২৭.৭ ৩০.১
অসংক্রামক ব্যাধি (NCD) ডায়াবেটিসের প্রকোপ (১৮+ বছর) ৬.৯ ৭.৮ ৮.২
অসংক্রামক ব্যাধি (NCD) স্থূলতার প্রকোপ (BMI ≥ ২৫ কেজি/মি²) ১৮.৫ ২২.৮ ২৪.৫
সংক্রামক ব্যাধি যক্ষ্মা (টিবি) ঘটনার হার (প্রতি ১ লক্ষ জনসংখ্যায়) ২২৫ (২০১০) ১৮৮ (২০১৬) ১৬৯ (২০২১)
স্বাস্থ্য ব্যয় সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় (জিডিপি'র %) ০.৯ ০.৭ ০.৬ (২০২১)

উৎস: বাংলাদেশ জাতীয় অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ জরিপ (STEP Survey) ২০১১, ২০১৭, ২০২২ (প্রাথমিক), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) গ্লোবাল টিবি রিপোর্ট, বিশ্বব্যাংক ডেটা।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে (MoHFW) একটি সমন্বিত 'জাতীয় অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ আইন' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যা তামাক, অস্বাস্থ্যকর খাদ্য, অতিরিক্ত চিনি ও লবণ ব্যবহার এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা নিয়ন্ত্রণের জন্য সুনির্দিষ্ট বিধিমালা, যেমন- খাদ্যপণ্যে পুষ্টি বিষয়ক সুস্পষ্ট লেবেলিং এবং তামাকজাত দ্রব্যের ওপর উচ্চ কর আরোপ, অন্তর্ভুক্ত করবে।
  • বাংলাদেশ সরকার, বিশ্বব্যাংক ও এডিবি'র যৌথ অর্থায়নে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা স্তরে সংক্রামক ও অসংক্রামক উভয় রোগের স্ক্রিনিং, রেফারেল এবং ফলো-আপ প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করার জন্য একটি দেশব্যাপী 'সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ প্রকল্প' (Integrated Healthcare Expansion Project) চালু করতে হবে। এই প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে NCD ক্লিনিক এবং সংক্রামক রোগ নির্ণয়ের জন্য অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপন এবং পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
  • স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা (CDC) কে একত্রিত করে একটি শক্তিশালী 'জাতীয় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট' (National Public Health Institute) প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই ইনস্টিটিউট রোগের প্রাদুর্ভাব পর্যবেক্ষণ, ডেটা বিশ্লেষণ, মহামারী সংক্রান্ত গবেষণা পরিচালনা এবং জনস্বাস্থ্য কর্মীদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবে। এর সঙ্গে বায়োইনফরম্যাটিক্স এবং জিনোমিক্স প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে যাতে নতুন রোগের সংক্রমণ দ্রুত শনাক্ত করা যায়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ডা. তৌহিদ হাসান

ডা. তৌহিদ হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: সংক্রামক ও অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator