নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলায় নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিলের প্রস্তুতিকালে ১৪ জনকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে একটি বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা নস্যাৎ করেছে পুলিশ। গত শুক্রবার ভোর ছয়টার দিকে উপজেলার খলিশাউড় ইউনিয়নের পাবই এলাকায় শ্যামগঞ্জ-জারিয়া সড়কের পাশে কমিউনিটি ক্লিনিকের সামনে এই ঘটনা ঘটে। স্থানীয় গ্রাম পুলিশের কাছ থেকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খবর পেয়ে পূর্বধলা থানা পুলিশ এবং শ্যামগঞ্জ তদন্ত কেন্দ্রের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে অভিযান পরিচালনা করেন। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে মিছিলের উদ্দেশ্যে জড়ো হওয়া ব্যক্তিরা মোটরসাইকেলযোগে বিভিন্ন দিকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ ধাওয়া করে তাদের আটক করে। প্রাথমিক অভিযানের পর তদন্তের সূত্র ধরে ময়মনসিংহের গৌরীপুর এলাকা থেকে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যার মাধ্যমে মোট ১৪ জন অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করা, সরকারি ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির ক্ষতিসাধন এবং সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। ঘটনাটি তাৎক্ষণিকভাবে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশি তৎপরতা জোরদার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে জেলা ছাত্রলীগের সদস্য মারুফ হোসেন মুন্নাসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ প্রশাসন। পুলিশের ভাষ্যমতে, সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষণার পর সংগঠনটির এমন তৎপরতা আইনশৃঙ্খলার প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জের শামিল। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় এসআই মোহাম্মদ তাইজুল ইসলাম বাদী হয়ে পূর্বধলা থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯-এর একাধিক ধারায় একটি মামলা দায়ের করেছেন, যেখানে ২৫ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২৫ থেকে ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
অভিযুক্তদের এই ঝটিকা মিছিলের পরিকল্পনা সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, ভোরে জনশূন্য রাস্তায় মোটরসাইকেলের মহড়া এবং মিছিলের আয়োজন মূলত জনমনে ভীতি সঞ্চার করার একটি পরিকল্পিত কৌশল ছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের নেতাকর্মীরা গোপনে সংগঠিত হয়ে পুনরায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির পাঁয়তারা করছে, যা জনজীবনের স্বাভাবিক ছন্দকে নষ্ট করছে। গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসছে যে, তারা সুপরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে চেয়েছিল। ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর অভিযোগ, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অতীতে যারা বিভিন্ন অপকর্মের সাথে জড়িত ছিল, তারাই এখন নাম পরিবর্তন করে বা ছদ্মবেশে নাশকতা চালিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে যে, অভিযুক্তরা মিছিলের নামে যানবাহন ভাঙচুর ও সরকারি সম্পত্তির ক্ষতিসাধনের পরিকল্পনা করেছিল, যা জননিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি। স্থানীয়দের দাবি, যারা এ ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে কেউ জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির সাহস না পায়।
এদিকে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন পূর্বধলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি জানান, ঝটিকা মিছিলের খবর পাওয়ার সাথে সাথে পুলিশ অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং গ্রেপ্তারকৃতদের ইতোমধ্যে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো সংগঠনের কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না এবং মাঠ পর্যায়ে নজরদারি আরও বৃদ্ধি করা হয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, গ্রেপ্তারকৃতদের প্রাথমিক জবানবন্দি ও তাদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোন জব্দ করে ঘটনার নেপথ্যে থাকা মূল পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে বিভিন্ন এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, সাধারণ জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ যেকোনো মূল্যে কঠোর অবস্থানে থাকবে এবং কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না।
এই ঘটনার প্রভাব স্থানীয় রাজনীতি ও জননিরাপত্তার ওপর দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীদের এমন প্রকাশ্য তৎপরতা প্রমাণ করে যে, তারা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জনমনে আতঙ্ক ছড়ানোর সুযোগ খুঁজছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের চলাফেরা ও স্বাভাবিক জনজীবন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে শ্যামগঞ্জ-জারিয়া সড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ রুটে এ ধরনের নাশকতামূলক তৎপরতা সাধারণ যাত্রী ও যানবাহনের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, প্রশাসনের এই ত্বরিত পদক্ষেপ জনমনে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে আনলেও, মূল হোতাদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় না আনা পর্যন্ত এই শঙ্কা থেকেই যাবে। পরিবহন খাতে অস্থিরতা রোধে এবং সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সতর্ক ও সক্রিয় থাকতে হবে, যাতে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের কোনো সদস্য কোনোভাবেই জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে না পারে।