বন্ড মার্কেট: শেয়ারবাজারের নির্ভরতা কমাতে বিকল্পের অনুপস্থিতি | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বন্ড মার্কেট: শেয়ারবাজারের নির্ভরতা কমাতে বিকল্পের অনুপস্থিতি

তানভীর আহমেদ  avatar   
তানভীর আহমেদ
বন্ড মার্কেট: শেয়ারবাজারের নির্ভরতা কমাতে বিকল্পের অনুপস্থিতি
বন্ড মার্কেট: শেয়ারবাজারের নির্ভরতা কমাতে বিকল্পের অনুপস্থিতি
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক কর্পোরেট বন্ডের তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং বিভিন্ন প্রণোদনা সত্ত্বেও দেশের বন্ড বাজার, ...

সম্প্রতি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক কর্পোরেট বন্ডের তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং বিভিন্ন প্রণোদনা সত্ত্বেও দেশের বন্ড বাজার, বিশেষত কর্পোরেট বন্ডের অংশ, তার সম্ভাব্য সক্ষমতার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি। গত তিন বছরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (CSE) নতুন তালিকাভুক্ত কর্পোরেট বন্ডের সংখ্যা ও বাজার মূলধন ইক্যুইটি বাজারের তুলনায় নগণ্য, যা দেশের পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নে একটি গুরুতর ভারসাম্যহীনতা নির্দেশ করে। এই পরিস্থিতি দেশের শিল্প খাতকে দীর্ঘমেয়াদী মূলধন সংগ্রহের জন্য প্রধানত শেয়ারবাজারের উপর নির্ভরশীল করে তুলেছে, যা সার্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ বিনিয়োগের সুযোগ তৈরিতে বড় বাধা সৃষ্টি করছে।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান কাঠামো গভীর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইক্যুইটি নির্ভরতা এতটাই প্রবল যে, বন্ড মার্কেট প্রায়শই উপেক্ষিত থেকে যায়। যদিও সরকারি ট্রেজারি বন্ড এবং বিলের একটি সক্রিয় বাজার রয়েছে, যা বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়, কিন্তু কর্পোরেট বন্ডের জন্য একটি কার্যকর সেকেন্ডারি বাজার গড়ে তোলার প্রচেষ্টা বহু বছর ধরে সীমিত সাফল্য পেয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা, যেমন পেনশন ফান্ড, বীমা কোম্পানি এবং ব্যাংকগুলো, দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষিত বিনিয়োগের জন্য বন্ডের দিকে ঝুঁকতে পারতো, কিন্তু উচ্চতর তারল্য ঝুঁকি, তথ্যগত স্বচ্ছতার অভাব এবং ছোট আকারের ইস্যুগুলোর কারণে তারা ইক্যুইটি বা অন্য স্বল্পমেয়াদী বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (CDBL) বন্ডের ইলেকট্রনিক হোল্ডিং এবং সেটেলমেন্টের সুবিধা প্রদান করলেও, এটি সেকেন্ডারি মার্কেটে বন্ডের সক্রিয় লেনদেন বৃদ্ধিতে তেমন প্রভাব ফেলেনি, কারণ ট্রেডিং ভলিউম এবং বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ছিল হতাশাজনকভাবে কম। এর ফলে, কোম্পানিগুলো দীর্ঘমেয়াদী মূলধন সংগ্রহের জন্য পাবলিক অফারিং বা রাইটস শেয়ারের উপরই বেশি ভরসা রাখে, যা বাজারের অস্থিরতা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করে।

এই দুর্বল বন্ড বাজারের পেছনের কারণগুলো বহুমুখী। প্রথমত, নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া শেয়ারবাজারের তুলনায় বন্ডের জন্য প্রায়শই আরও জটিল ও সময়সাপেক্ষ। যদিও BSEC সম্প্রতি কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যেমন ফ্লোটিং রেট বন্ড এবং জিরো কুপন বন্ডের অনুমোদন, কিন্তু এর বাস্তবায়ন এবং বাজার প্রতিক্রিয়া এখনও প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বন্ড বিনিয়োগ সম্পর্কে সচেতনতার অভাব একটি বড় কারণ। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বন্ডের স্থিতিশীল রিটার্ন এবং কম ঝুঁকি সম্পর্কে তেমন অবগত নন, এবং তারা শেয়ারবাজারের দ্রুত মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা দ্বারা বেশি আকৃষ্ট হন। তৃতীয়ত, বন্ডের বাজার তৈরিতে প্রয়োজনীয় মধ্যস্থতাকারীর অভাব রয়েছে, যেমন রেটিং এজেন্সি, আন্ডাররাইটার এবং মার্কেট মেকার, যারা বন্ডের ঝুঁকি মূল্যায়ন, বিতরণ এবং তারল্য নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলস্বরূপ, বন্ডের মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতার অভাব দেখা যায়, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়। এটি কেবল বিনিয়োগকারীদের জন্যই নয়, ইস্যুকারী কোম্পানিগুলোর জন্যও একটি চ্যালেঞ্জ, কারণ তারা তাদের বন্ডের জন্য সঠিক মূল্য এবং উপযুক্ত ক্রেতা খুঁজে পেতে হিমশিম খায়, যা শেষ পর্যন্ত শেয়ারবাজারের উপর নির্ভরতা বাড়ায় এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করে।

পুঁজিবাজার সূচক ২০২০ সাল (প্রায়) ২০২৩ সাল (প্রায়)
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মোট বাজার মূলধন (ইক্যুইটি) ৪.৫ ট্রিলিয়ন টাকা ৭.৫ ট্রিলিয়ন টাকা
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কর্পোরেট বন্ডের বাজার মূলধন ৩০ বিলিয়ন টাকা ৬৫ বিলিয়ন টাকা
মোট তালিকাভুক্ত কোম্পানি (DSE) ৩৩০টি ৩৫৫টি
মোট তালিকাভুক্ত কর্পোরেট বন্ড (DSE) ১০টি ২০টি

উৎস: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE) এর বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত আনুমানিক তথ্য।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক সিকিউরিটিজ আইন, ১৯২০ এবং এর অধীনস্থ বিধিমালা, বিশেষত পাবলিক ইস্যু রুলস, ২০১৫-এর অধীনে কর্পোরেট বন্ড ইস্যু এবং তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়াকে আরও সরল ও সময়োপযোগী করতে হবে। এক্ষেত্রে, ফাস্ট-ট্র্যাক তালিকাভুক্তির সুযোগ তৈরি করা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য বিশেষায়িত বন্ড প্ল্যাটফর্ম চালুর বিষয়ে ডিএসই এবং সিএসইর সাথে সমন্বয় করে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে।
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এবং অর্থ মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে কর্পোরেট বন্ডে বিনিয়োগের জন্য নির্দিষ্ট কর প্রণোদনা প্যাকেজ প্রবর্তন করতে হবে। এর মধ্যে বন্ড থেকে প্রাপ্ত সুদের আয়ের উপর কর অব্যাহতি, বন্ডের মূলধন লাভের উপর হ্রাসকৃত কর হার, এবং কর্পোরেট বন্ড ইস্যুকারী কোম্পানিগুলোর জন্য বন্ড ইস্যু সংক্রান্ত ব্যয়ের উপর কর সুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে, যা আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪-এর ধারা সংশোধন করে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
  • BSEC, DSE, CSE এবং CDBL-কে একত্রিত হয়ে একটি জাতীয় বন্ড মার্কেট উন্নয়ন কমিটি গঠন করতে হবে, যার মূল কাজ হবে একটি সমন্বিত বন্ড ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বন্ডের গুরুত্ব ও সুবিধা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। এই কমিটি বন্ড রেটিং এজেন্সিগুলোর মানদণ্ড উন্নতকরণ এবং বন্ড মার্কেট মেকারদের জন্য একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরির মাধ্যমে সেকেন্ডারি মার্কেটে তারল্য নিশ্চিত করার জন্য সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি ও বাস্তবায়ন করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানভীর আহমেদ

তানভীর আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শেয়ারবাজার ও ক্যাপিটাল মার্কেট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator