ভূমি খাতে দুর্নীতির জাল: জনভোগান্তি ও প্রতিকারের পথ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ভূমি খাতে দুর্নীতির জাল: জনভোগান্তি ও প্রতিকারের পথ

সাজিদুল ইসলাম  avatar   
সাজিদুল ইসলাম
ভূমি খাতে দুর্নীতির জাল: জনভোগান্তি ও প্রতিকারের পথ
ভূমি খাতে দুর্নীতির জাল: জনভোগান্তি ও প্রতিকারের পথ
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের ভূমি রেজিস্ট্রেশন, নামজারি ও জরিপ খাত দীর্ঘকাল ধরে দুর্নীতির আখড়া হিসেবে পরিচিত। সাধারণ মানুষের জন্য জমি সংক্রান্ত যেকোনো কাজই যেন এক বিভীষিকাময় অ...

বাংলাদেশের ভূমি রেজিস্ট্রেশন, নামজারি ও জরিপ খাত দীর্ঘকাল ধরে দুর্নীতির আখড়া হিসেবে পরিচিত। সাধারণ মানুষের জন্য জমি সংক্রান্ত যেকোনো কাজই যেন এক বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা। ঘুষ, হয়রানি, দীর্ঘসূত্রিতা এবং দালালের দৌরাত্ম্য এই খাতের নিত্যনৈমিত্তিক চিত্র। সাম্প্রতিক সময়েও দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, যা জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। সরকারের ডিজিটাল ভূমি সেবা চালুর উদ্যোগ সত্ত্বেও মাঠ পর্যায়ে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা কঠিন হয়ে পড়েছে, যার ফলে জমির প্রকৃত মালিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির ঘটনা সামনে এসেছে। ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার মুন্সি মোখলেছুর রহমান এবং গুলশান ও মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল কাদের ও আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য, অবৈধ কার্যক্রম এবং ২১টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নকলনবিশ আওলাদ হোসেন দেড় বছর ধরে বালাম বইয়ে কোনো তথ্য সংরক্ষণ করেননি বলেও অভিযোগ রয়েছে। সাভারের সাব-রেজিস্ট্রার জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে দলিল নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগ স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। শ্রীমঙ্গলে সাব-রেজিস্ট্রার শংকর কুমার ধরের বিরুদ্ধে জমির মূল্য অস্বাভাবিকভাবে কমিয়ে প্রায় দেড় কোটি টাকা সরকারি রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে দলিল লেখকরা কর্মবিরতি পালন করেছেন। ফরিদপুরের সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার মো. ইউসুফ আলী মিয়া জাল দলিল তৈরির মাধ্যমে জমি আত্মসাতের চেষ্টার অভিযোগে দুদকের মামলায় কারাগারে গেছেন। টাঙ্গাইলের সাব-রেজিস্ট্রার নূরুল আমিন জাল সনদ ব্যবহার করে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন, যার মধ্যে ১১ কোটি টাকা ব্যাংক হিসাব এবং একাধিক বহুতল ভবন দুদক কর্তৃক ক্রোকের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কক্সবাজারে মেগা প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণে ৭৮ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, যেখানে সাবেক জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় রাজনীতিকদের নামও জড়িত। এই দুর্নীতির তদন্ত করতে গিয়ে দুদকের এক কর্মকর্তা বিপদে পড়েন এবং তার তদন্ত বাতিল করে পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। পিরোজপুরের নাজিরপুরে একজন সহকারী কমিশনার (ভূমি) নামজারির জন্য নির্ধারিত ১,১৭০ টাকার পরিবর্তে ৬,০০০ টাকা ঘুষ নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। চরম অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের কাশিমপুর ভূমি অফিসের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে একযোগে বরখাস্ত করা হয়েছে। মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ের খিদিরপাড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে নামজারির জন্য ঘুষ চাওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, যেখানে একজন কর্মকর্তা বলেন, “অফিস কি মানবো? এসিল্যান্ড কি মানবো? খরচা আছে না?” এছাড়া, ফরিদপুরের বোয়ালমারীর চতুল ইউনিয়ন ভূমি অফিস এবং সাতক্ষীরার তালা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসেও নামজারি, দাখিলা ও অন্যান্য ভূমি সংক্রান্ত কাজে ব্যাপক ঘুষ ও দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের ঢাকা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সেও জমি রেজিস্ট্রেশন, নকল উত্তোলন ও রেকর্ড সংশোধনে ঘুষ ও হয়রানির বিস্তর অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক অভিযান চালিয়েছে।

ভূমি প্রশাসনের মাঠপর্যায়ে, বিশেষ করে জরিপ বিভাগে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব প্রতিবেদনেও ৩০ বছরের জরিপ কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, কাজের সিস্টেমের ফাঁকে ফাঁকে দুর্নীতি ঢুকে পড়েছে এবং উচ্চপর্যায় থেকে নিম্নস্তর পর্যন্ত সব কর্মকর্তা-কর্মচারী এতে জড়িত। ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ পেতেও ভুক্তভোগীদের বছরের পর বছর হয়রানির শিকার হতে হয় এবং এক্ষেত্রেও ব্যাপক দুর্নীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ বিদ্যমান। দালাল চক্র ভূমি অফিসের সেবাকে জিম্মি করে রেখেছে, যেখানে নিয়মের চেয়ে ‘লেনদেন’ই বড় হয়ে উঠেছে। জমির শ্রেণি পরিবর্তন, মৌজা ম্যাপ ও খতিয়ানে কারচুপি করে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া একটি সাধারণ প্রবণতা। এসব কারণে জমির প্রকৃত মালিকরা চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে এবং ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিচ্ছে। ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু এবং ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন ভূমি খাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছেন। ই-নামজারি বাধ্যতামূলক করা, অনলাইন ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থা চালু করা এবং ১৬১২২ নম্বরে হটলাইন সেবা চালু করার মাধ্যমে দালালদের হস্তক্ষেপ কমানো ও স্বচ্ছতা আনার চেষ্টা চলছে। ভূমিমন্ত্রী জানিয়েছেন যে, অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে আবেদনকারীকে এসএমএস-এর মাধ্যমে জানানো হয়, যাতে কেউ অবৈধ সুবিধা নিতে না পারে। ড্রোন ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিজিটাল জরিপ পরিচালনার পাইলটিং চলছে, যা ম্যাপ জালিয়াতি ও রেকর্ড সংশোধনের ভুল কমাবে। ভূমি মন্ত্রণালয় অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থাপনা সিস্টেম এবং ভূমি অধিগ্রহণ ও লিজ অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেমকেও সফটওয়্যারের আওতায় আনার কাজ করছে। কর্মকর্তাদের কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে আকস্মিক পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং দায়িত্ব অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের দুই কর্মচারীকে দুর্নীতির দায়ে বরখাস্ত ও বেতন গ্রেড অবনমিত করা হয়েছে। তবে, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ডিজিটাল দক্ষতা ও সচেতনতার অভাব, সার্ভার ও ইন্টারনেট সুবিধার দুর্বলতা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত তদারকির অভাব ডিজিটাল সেবার বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

ভূমি খাতে দুর্নীতি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য একটি বড় বাধা। এই দুর্নীতি সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করে এবং রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আস্থাকে ক্ষুণ্ণ করে। ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রিতা বিনিয়োগ পরিবেশকেও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে দুর্নীতি কমানোর প্রচেষ্টা প্রশংসনীয় হলেও, মাঠ পর্যায়ে এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এবং দালাল চক্রকে নির্মূল করতে না পারলে এই খাতের চিত্র পরিবর্তন করা কঠিন হবে।

সুপারিশ: ভূমি রেজিস্ট্রেশন, নামজারি ও জরিপ খাতে দুর্নীতির মূলোৎপাটনে ভূমি মন্ত্রণালয়কে একটি সমন্বিত ও কঠোর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, প্রতিটি ভূমি অফিসে দালাল চক্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও কঠোর অভিযান পরিচালনা করে তাদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে হবে এবং দালালদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল ভূমি সেবাগুলোকে আরও সহজ, ব্যবহারকারী-বান্ধব এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে সহজলভ্য করতে ব্যাপক প্রচার ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে একটি স্বাধীন কমিটি গঠন করে ক্ষতিপূরণ বিতরণে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিটি অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। চতুর্থত, ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত আকস্মিক পরিদর্শন, পারফরম্যান্স মনিটরিং এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন কর্তৃপক্ষ গঠন করা অপরিহার্য। সর্বশেষ, ভূমি সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালাগুলোকে আধুনিকায়ন করে সকল প্রকার ফাঁকফোকর বন্ধ করতে হবে, যা দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি করে।


🔎 অনুসন্ধানে: সাজিদুল ইসলাম

সাজিদুল ইসলাম, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: ভূমি রেজিস্ট্রেশন, নামজারি ও জরিপ দুর্নীতি।

Tidak ada komentar yang ditemukan


News Card Generator