টেলিকম, ৫জি ও ইন্টারনেট অবকাঠামো: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

টেলিকম, ৫জি ও ইন্টারনেট অবকাঠামো: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ

কামরুল হাসান  avatar   
কামরুল হাসান
টেলিকম, ৫জি ও ইন্টারনেট অবকাঠামো: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
টেলিকম, ৫জি ও ইন্টারনেট অবকাঠামো: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে ফাইভ-জি (5G) মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহক সংখ্যা এখনো মোট মোবাইল ইন্টারনে...

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে ফাইভ-জি (5G) মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহক সংখ্যা এখনো মোট মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ১ শতাংশেরও নিচে, যা ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ প্রায় ১.৩ মিলিয়ন। অথচ, বিটিআরসি অপারেটরদের জন্য স্পেকট্রাম বরাদ্দ এবং ফাইভ-জি রোলআউটের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করেছে বেশ কয়েক বছর আগেই। এই স্থবিরতা কেবল ফাইভ-জি প্রযুক্তির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং দেশের সামগ্রিক টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘদিনের নীতিগত অদূরদর্শিতা, বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং সমন্বয়হীনতার এক স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। 'স্মার্ট বাংলাদেশ' গড়ার স্বপ্ন যখন একটি জাতীয় এজেন্ডা, তখন ইন্টারনেট অবকাঠামোতে এই দুর্বলতা দেশের ডিজিটাল রূপান্তর প্রক্রিয়ায় এক বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে, যা অবিলম্বে গভীর বিশ্লেষণ ও সুনির্দিষ্ট সমাধানের দাবি রাখে।

ফাইভ-জি সহ দেশের ইন্টারনেট অবকাঠামোর মূল ব্যর্থতার একটি প্রধান কারণ হলো উচ্চ স্পেকট্রাম মূল্য এবং ফাইবার অপটিক ব্যাকহল নেটওয়ার্কের অপর্যাপ্ততা। বিটিআরসি কর্তৃক নির্ধারিত স্পেকট্রাম মূল্য বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক বেশি, যা টেলিকম অপারেটরদের বিনিয়োগের উপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে। এই অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদের উপর চাপানো হয়, যার ফলে ইন্টারনেট সেবার ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং গ্রহণ হার কমে যায়। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ এবং ২০২২ সালের স্পেকট্রাম নিলামে অপারেটরদের উচ্চমূল্যে স্পেকট্রাম কিনতে হয়েছে, যা নতুন প্রযুক্তি যেমন ফাইভ-জি রোলআউটে তাদের আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে। একই সাথে, শহর ছাড়িয়ে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ফাইবার অপটিক ক্যাবল স্থাপন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। 'রাইট অব ওয়ে' (Right of Way - RoW) প্রাপ্তিতে দীর্ঘসূত্রিতা, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং বারবার রাস্তা খননের অনুমতি সংক্রান্ত জটিলতা ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করছে। পর্যাপ্ত ফাইবার ব্যাকহল ছাড়া ফাইভ-জি প্রযুক্তির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব নয়, কারণ এর জন্য উচ্চ ব্যান্ডউইথ এবং কম ল্যাটেন্সির প্রয়োজন হয় যা কেবল শক্তিশালী ফাইবার নেটওয়ার্ক দিয়েই সম্ভব। ফলে, কেবল স্পেকট্রাম বরাদ্দ দিলেই হবে না, বরং এর সাথে সংগতিপূর্ণ অবকাঠামো তৈরি না হলে তা কেবল সীমিত শহরাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

এই অবকাঠামোগত দুর্বলতা দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি এবং উদ্ভাবনী স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের উপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS)-এর সদস্যরা, যারা মূলত প্রযুক্তি নির্ভর ব্যবসা পরিচালনা করেন, তারা প্রায়শই উচ্চ ইন্টারনেট খরচ এবং ধীরগতির কারণে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। যখন প্রতিবেশী দেশগুলোতে প্রতি জিবি ইন্টারনেটের খরচ অনেক কম এবং গতি তুলনামূলকভাবে বেশি, তখন বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলো উদ্ভাবনী পণ্য ও সেবা তৈরিতে বাধার সম্মুখীন হয়। একইভাবে, আইসিটি ডিভিশন এবং এর আওতাধীন অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (a2i) প্রোগ্রামের মাধ্যমে ডিজিটাল সেবাগুলো প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছানোর প্রচেষ্টা চালানো হলেও, দুর্বল ইন্টারনেট অবকাঠামো এই সেবাগুলোর কার্যকারিতা সীমিত করছে। বিশেষ করে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কৃষি খাতে অনলাইন সেবাদানে নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেটের অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) কর্তৃক পরিচালিত হাই-টেক পার্কগুলোতে বিশ্বমানের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও উচ্চ গতির ইন্টারনেট অপরিহার্য। কিন্তু, বর্তমান প্রেক্ষাপটে, অনেক পার্কেই প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, যা দেশের প্রযুক্তি খাতের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে মন্থর করে দিচ্ছে। এই সংকট নিরসনে নীতিগত সংস্কার এবং কার্যকর বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।

সূচক ২০২০ ২০২১ ২০২২ ২০২৩ (প্রাক্কলিত) পর্যবেক্ষণ
মোট ইন্টারনেট গ্রাহক (মিলিয়ন) ১১৭.৩২ ১২৯.২৩ ১৩১.৯২ ১৩৯.৮১ বৃদ্ধির হার মন্থর
মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহক (মিলিয়ন) ১০৮.৭২ ১১৯.১১ ১২২.০৮ ১২৯.৩৮ মোট গ্রাহকের সিংহভাগ
ফিক্সড ব্রডব্যান্ড গ্রাহক (মিলিয়ন) ৮.৬০ ১০.১২ ৯.৮৪ ১০.৪৩ স্থির ও সামান্য বৃদ্ধি
ফাইভ-জি গ্রাহক (মিলিয়ন) ০০.০০ ০০.০০ ০.২ ১.৩ ধীর গ্রহণ হার
গড় মোবাইল ইন্টারনেট গতি (Mbps) ১০.৬ ১১.৪ ১৩.৮ ১৬.১ বিশ্ব গড়ের নিচে
প্রতি জিবি মোবাইল ইন্টারনেটের খরচ (BDT) ২৭-৩৫ ৩০-৪০ ৩২-৪৫ ৩৩-৪৬ তুলনামূলকভাবে উচ্চ

উৎস: বিটিআরসি (BTRC) মাসিক প্রতিবেদন, Ookla Speedtest Global Index ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান।

সুপারিশ

  • বিটিআরসি-কে 'টেলিকম স্পেকট্রাম মূল্য নির্ধারণ নীতি ২০১৯' (Telecom Spectrum Pricing Policy 2019) সংশোধন করে বাজার-সম্মত ও অপারেটর-বান্ধব স্পেকট্রাম মূল্য কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে, যা অপারেটরদের ফাইভ-জি সহ নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং গ্রাহকদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে সেবা প্রদানে উৎসাহিত করবে।
  • আইসিটি ডিভিশন-কে 'জাতীয় ডিজিটাল অবকাঠামো নীতি ২০২২' (National Digital Infrastructure Policy 2022) এর আওতায় একটি সমন্বিত 'রাইট অব ওয়ে' (RoW) নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে ফাইবার অপটিক ক্যাবল স্থাপনের জন্য একক উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স এবং বিদ্যমান ইউটিলিটি ডাক্ট ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকবে, যাতে সারাদেশে দ্রুত ও সাশ্রয়ী মূল্যে ফাইবার অপটিক ব্যাকহল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারিত হয়।
  • a2i এবং BHTPA-কে যৌথভাবে গ্রামীণ ও হাই-টেক পার্কসমূহে ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করতে হবে এবং BASIS-এর সঙ্গে অংশীদারিত্বে স্থানীয় উদ্ভাবকদের জন্য কম খরচে উচ্চ গতির ইন্টারনেট অ্যাক্সেস নিশ্চিত করতে হবে, যা ডিজিটাল সেবা এবং প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের বিকাশে সহায়ক হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: কামরুল হাসান

কামরুল হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: টেলিকম, ৫জি ও ইন্টারনেট অবকাঠামো। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Tidak ada komentar yang ditemukan


News Card Generator