গাজীপুরের টঙ্গী স্টেশন রোড এলাকায় অবস্থিত নিউ লাইফ হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশন চলাকালে তামান্না (২১) নামের এক প্রসূতি এবং তার নবজাতক সন্তানের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে। নিহত তামান্না গাজীপুর মহানগরীর পূবাইল থানাধীন বসুগাঁও-মীরের বাজার এলাকার বাসিন্দা এবং তুহিনের স্ত্রী ছিলেন। পরিবারের অভিযোগ, গত কয়েকদিন আগে প্রসবজনিত জটিলতার কারণে তাকে উক্ত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু অস্ত্রোপচারের সময় প্রয়োজনীয় সতর্কতার অভাব এবং ভুল চিকিৎসার কারণে মা ও শিশু উভয়ই প্রাণ হারান। ঘটনার পর থেকেই এলাকা জুড়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং স্থানীয়রা এই অবৈধ হাসপাতালের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। এই মৃত্যুর ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং চিকিৎসাসেবার নামে পরিচালিত একটি অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার চরম প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন সচেতন মহল। ঘটনার পরপরই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রহস্যজনকভাবে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে গোপনে মীমাংসার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগের তীর মতিউর রহমান নামের এক ব্যক্তির দিকে, যাকে স্থানীয়রা ‘মতিউর কসাই’ হিসেবে অভিহিত করছেন। অভিযোগ রয়েছে যে, মতিউর রহমান নিজে একজন অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ পরিচয় দিয়ে রোগীদের অপারেশন করেন, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের নীতি ও আইনের চরম লঙ্ঘন। তামান্নার স্বজনদের দাবি, অপারেশন থিয়েটারে অদক্ষতা এবং ভুল অ্যানেস্থেশিয়ার কারণেই তামান্না ও তার নবজাতক মৃত্যুবরণ করেছেন। শুধু নিউ লাইফ হাসপাতাল নয়, মতিউর রহমান একই এলাকায় মাইসা জেনারেল হাসপাতাল নামে আরেকটি বিতর্কিত চিকিৎসালয় পরিচালনা করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের মতে, প্রশাসনকে ম্যানেজ করার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে এসব অপচিকিৎসা কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। তামান্নার পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়ে অভিযোগ করেন যে, একটি সাধারণ সিজারিয়ান অপারেশন করতে গিয়ে ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে তাদের পরিবারের দুজন সদস্য অকালে প্রাণ হারালেন, যার দায় কোনোভাবেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, মতিউর রহমানের মালিকানাধীন এসব হাসপাতালে নিয়মিত বিরতিতে অঘটন ঘটলেও প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় তিনি বারবার পার পেয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এবং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এসব অবৈধ হাসপাতালগুলো কোনো ধরনের লাইসেন্স বা মানদণ্ড ছাড়াই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে ভুক্তভোগী পরিবারসহ স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা অবিলম্বে মতিউর রহমানের সকল হাসপাতাল সিলগালা করে তাকে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া না গেলেও, তারা তড়িঘড়ি করে ভুক্তভোগী পরিবারকে আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে ঘটনাটি মীমাংসা করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
চিকিৎসাসেবার নামে এ ধরনের প্রতারণা এবং অবহেলা জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। যদি মতিউর রহমানের মতো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে এমন আরও প্রাণহানির ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থেকেই যায়। সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং স্বাস্থ্যখাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। তামান্নার মৃত্যুর এই মর্মান্তিক ঘটনাটি একটি সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত, যাতে আর কোনো প্রসূতিকে ভুল চিকিৎসার বলি হতে না হয়।