সরকারি সেবায় দুর্নীতির লাগামহীন দৌরাত্ম্য: টিআইবির উদ্বেগ ও নাগরিকের নতুন প্রতিবাদ.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

সরকারি সেবায় দুর্নীতির লাগামহীন দৌরাত্ম্য: টিআইবির উদ্বেগ ও নাগরিকের নতুন প্রতিবাদ..

আরিফুজ্জামান সজীব  avatar   
আরিফুজ্জামান সজীব
সরকারি সেবায় দুর্নীতির লাগামহীন দৌরাত্ম্য: টিআইবির উদ্বেগ ও নাগরিকের নতুন প্রতিবাদ..
সরকারি সেবায় দুর্নীতির লাগামহীন দৌরাত্ম্য: টিআইবির উদ্বেগ ও নাগরিকের নতুন প্রতিবাদ..
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের সরকারি পরিষেবা খাতে দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র ক্রমশই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সাম্প্রতিক জরিপ ও প্.....

বাংলাদেশের সরকারি পরিষেবা খাতে দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র ক্রমশই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সাম্প্রতিক জরিপ ও প্রতিবেদনগুলো এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। যেখানে দেশের ৮১.৬ শতাংশ সেবাগ্রহীতা কোনো না কোনোভাবে দুর্নীতির শিকার হচ্ছেন, যা ২০২৩ সালের ৭০.৯ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। ২০২৫ সালে ঘুষ বাবদ মোট ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে, যা জাতীয় বাজেটের প্রায় ১.৫৮ শতাংশের সমান। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের অর্থনীতিতে যেমন নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তেমনি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অভিযান চালালেও এবং সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি ঘোষণা করলেও মাঠ পর্যায়ে এর কার্যকর প্রতিফলন সীমিত।

টিআইবি-এর 'সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫' অনুযায়ী, পাসপোর্ট অফিস দেশের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি খাত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। পাসপোর্ট সেবায় ঘুষের শিকার হওয়া খানার হার জাতীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৭৬.৬ শতাংশ। এরপরই রয়েছে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা। ভূমি অফিসও দুর্নীতির অন্যতম আখড়া হিসেবে পরিচিত। ভূমি নামজারি, খাজনা পরিশোধ, রেকর্ড সংশোধনসহ বিভিন্ন কাজে সাধারণ মানুষকে মাসের পর মাস ঘুরতে হচ্ছে এবং দালাল চক্রের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ না দিলে কাজ আটকে থাকছে। জুন ২০২৬-এ ভূমি মন্ত্রণালয় ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে একজনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত এবং অন্যজনকে বেতন গ্রেডে অবনমিত করা হয়েছে। ভূমিমন্ত্রী যদিও ই-নামজারি, অনলাইন ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থা এবং ১৬১২২ হটলাইন চালুর মাধ্যমে দালালদের হস্তক্ষেপ বন্ধ ও দুর্নীতি কমানোর উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন, তবে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন।

পাসপোর্ট ও ভূমি অফিসের পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং নির্বাচন কমিশন (ইসি) সংশ্লিষ্ট সেবা খাতেও ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এনআইডি তথ্য ফাঁস, জালিয়াতি এবং স্মার্ট কার্ড বিতরণে অনিয়ম দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ১১ কোটিরও বেশি নাগরিকের এনআইডি ডেটা টেলিগ্রাম চ্যানেলে ফাঁস হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়, যা সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক বড় উদ্বেগের কারণ। এছাড়াও, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সিলেট কার্যালয়ের পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কাজ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারদের ১৫ কোটি টাকার অগ্রিম বিল পরিশোধের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলেও, পরবর্তীতে তাদের বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়, যা মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা শাখার তৎকালীন কর্মকর্তাদের 'ম্যানেজ' করার অভিযোগ তুলেছে। এই ধরনের ঘটনাগুলো সরকারি দপ্তরে জবাবদিহিতার অভাব এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে দীর্ঘসূত্রিতা ও দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। ডিসেম্বর ২০২৪-এ সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় একাধিক তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও, এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও এর পেছনের সম্ভাব্য অনিয়ম নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

এই ভয়াবহ দুর্নীতি চিত্রের মাঝে আশার আলো দেখাচ্ছে কিছু নাগরিক উদ্যোগ। সম্প্রতি দুই তরুণ উদ্যোক্তা সাইফ কবির ও সাহেদ শরীফ সরকারি সেবা খাতে ঘুষ দাবির তথ্য বেনামে সংগ্রহের জন্য 'ঘুষ.সাইট' (ghush.site) নামে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করেছেন। চালুর মাত্র তিন দিনের মধ্যেই এই সাইটে প্রায় ১ হাজার ৯০০টি অভিযোগ জমা পড়েছে, যেখানে দাবিকৃত ঘুষের মোট পরিমাণ ২৫ কোটি টাকারও বেশি। এটি প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষ দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে চায়, যদি তাদের জন্য একটি নিরাপদ ও বেনামী প্ল্যাটফর্ম থাকে। অন্যদিকে, সরকারি নথিপত্র নিষ্পত্তিতে বিলম্ব কমাতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ অতিরিক্ত সচিবদের সমন্বয়ে 'পরিবীক্ষণ টিম' গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে, যা আকস্মিক পরিদর্শনের মাধ্যমে দাপ্তরিক কার্যক্রমের গতি ও দক্ষতা যাচাই করবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি অনুসরণের নির্দেশনা দিয়েছেন। তবে, টিআইবি-এর মতে, এই 'জিরো টলারেন্স' নীতি প্রায়শই শুধু ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং দুর্নীতি প্রতিরোধক আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান নানা শক্তির প্রভাবে কার্যকর হতে পারছে না।

দুর্নীতির এই ব্যাপকতা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিশেষ করে দরিদ্র, নিম্ন আয় ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ওপর ঘুষ ও নিয়মবহির্ভূত অর্থের লেনদেনের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি, যা তাদের প্রান্তিকতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। নারী সেবাগ্রহীতাদেরও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা খাতে বেশি দুর্নীতির শিকার হতে দেখা যাচ্ছে, যা তাদের অংশগ্রহণকে নিরুৎসাহিত করছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, বিচারহীনতা, অপর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষমতার লাগামহীন অপব্যবহারের কারণে বাংলাদেশে দুর্নীতি সর্বব্যাপী রয়ে গেছে। দুর্নীতি দমনে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা সীমিত এবং সংস্কার প্রস্তাবগুলো প্রায়শই অবহেলিত হয়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য একটি সমন্বিত ও দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার অপরিহার্য, যেখানে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বরং জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নৈতিকতা চর্চা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

সুপারিশ: সরকারি সেবা খাতে দুর্নীতি প্রতিরোধে অবিলম্বে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রথমত, দুর্নীতি দমন কমিশনকে আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন করতে হবে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভূমি অফিস, পাসপোর্ট অফিস, বিআরটিএ এবং এনআইডি সেবাসহ সকল সরকারি সেবা খাতকে সম্পূর্ণরূপে ডিজিটালাইজড করতে হবে এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে যাতে তথ্য ফাঁস বা জালিয়াতির সুযোগ না থাকে। তৃতীয়ত, ঘুষ ও হয়রানির শিকার নাগরিকদের জন্য 'ঘুষ.সাইট'-এর মতো বেনামী অভিযোগ জানানোর প্ল্যাটফর্মগুলোকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আইনি সুরক্ষা প্রদান করতে হবে, যাতে নির্ভয়ে অভিযোগ জানানো যায়। চতুর্থত, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য যুগোপযোগী আচরণবিধি প্রণয়ন, নিয়মিত সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা এবং মেধা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে পদোন্নতি নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, গণশুনানি ও সামাজিক নিরীক্ষা চালু করে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন জোরদার করতে হবে। সর্বশেষ, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, যাতে দুর্নীতির পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায়।


🔎 অনুসন্ধানে: আরিফুজ্জামান সজীব

আরিফুজ্জামান সজীব, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি ও সচিবালয় ওয়াচ।

Inga kommentarer hittades


News Card Generator