গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ: বিদেশি ট্রলারের দৌরাত্ম্য ও দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির পথ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ: বিদেশি ট্রলারের দৌরাত্ম্য ও দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির পথ

শহীদুল ইসলাম  avatar   
শহীদুল ইসলাম
গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ: বিদেশি ট্রলারের দৌরাত্ম্য ও দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির পথ
গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ: বিদেশি ট্রলারের দৌরাত্ম্য ও দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির পথ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বঙ্গোপসাগরের গভীর জলসীমায় বিদেশি ট্রলারের বেপরোয়া উপস্থিতি এবং বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের ধারাবাহিক অভিযানে তাদের আটকের ঘটনাগুলো আবারও দেশের সামুদ্রিক...

সম্প্রতি বঙ্গোপসাগরের গভীর জলসীমায় বিদেশি ট্রলারের বেপরোয়া উপস্থিতি এবং বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের ধারাবাহিক অভিযানে তাদের আটকের ঘটনাগুলো আবারও দেশের সামুদ্রিক সম্পদ সুরক্ষার চ্যালেঞ্জকে সামনে এনেছে। গত তিন মাসে অন্তত পাঁচটি বিদেশি ফিশিং ট্রলারকে অবৈধভাবে মাছ ধরার সময় আটক করা হয়েছে, যার মধ্যে সাম্প্রতিকতম ঘটনাটি ছিল গত সপ্তাহে সেন্ট মার্টিনের অদূরে মিয়ানমারের একটি ট্রলারের অনুপ্রবেশ। এই ধরনের ঘটনা কেবল আমাদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন নয়, বরং দেশের ব্লু ইকোনমির অপার সম্ভাবনাকে খর্ব করছে এবং মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন-জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলছে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) যেমন স্থলভিত্তিক কৃষির অগ্রগতিতে নিবেদিত, তেমনি সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের টেকসই আহরণ ও সংরক্ষণ এখন জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিদেশি ট্রলারগুলো সাধারণত অত্যাধুনিক সরঞ্জাম ও জাল ব্যবহার করে, যা গভীর সমুদ্রের মৎস্য ভান্ডারকে দ্রুত নিঃশেষ করে দিচ্ছে। এদের প্রধান লক্ষ্য থাকে উচ্চমূল্যের টুনা, সার্ডিন, ম্যাকেরেল এবং অন্যান্য পেলাজিক ও ডিমারসাল প্রজাতির মাছ, যা বাংলাদেশের নিজস্ব মৎস্যজীবীদের জন্য অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অবৈধ মৎস্য আহরণ শুধু মাছের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস করছে না, বরং সামুদ্রিক প্রতিবেশের ভারসাম্যকেও নষ্ট করছে। প্রায়শই দেখা যায়, বিদেশি ট্রলারগুলো আন্তর্জাতিক আইন ও দেশীয় জলসীমা লঙ্ঘন করে, যা আমাদের সামুদ্রিক পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) যেমন তাদের গবেষণার মাধ্যমে স্থলভিত্তিক কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে, তেমনি সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ ব্যবস্থাপনায়ও অনুরূপ নিবিড় গবেষণা ও প্রযুক্তির প্রয়োগ অপরিহার্য। মাছের প্রজাতিভিত্তিক স্টক অ্যাসেসমেন্ট, প্রজনন ক্ষেত্র চিহ্নিতকরণ এবং সেগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগর তার সম্পদ হারাবে, যা দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে।

অন্যদিকে, দেশীয় মৎস্যজীবীদের গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণের সক্ষমতা এখনো সীমিত। তাদের ব্যবহৃত অধিকাংশ নৌযান ঐতিহ্যবাহী বা মাঝারি আকারের ট্রলার, যা গভীর সমুদ্রে দীর্ঘ সময় ধরে মাছ ধরার জন্য উপযুক্ত নয়। আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সহায়তার অভাবে দেশীয় জেলেরা বিদেশি ট্রলারগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের মৎস্য আহরণের প্রায় ৯০ শতাংশ এখনো উপকূলীয় ও অগভীর সমুদ্র এলাকা থেকে আসে, যেখানে মৎস্য সম্পদের ওপর চাপ ক্রমশ বাড়ছে। গভীর সমুদ্রে আহরণের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ফিশিং ভেসেল, আধুনিক নেভিগেশন ও ফিশ ফাইন্ডিং ইকুইপমেন্ট এবং উপযুক্ত কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনার অভাবে আমরা এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারছি না। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) দেশের সামগ্রিক কৃষি গবেষণার সমন্বয়কারী সংস্থা হিসেবে, সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণাতেও তার কর্মপরিধি বিস্তৃত করতে পারে। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, নতুন প্রজাতির মাছ চিহ্নিতকরণ এবং টেকসই আহরণ পদ্ধতির বিকাশে BARC-এর তত্ত্বাবধানে সমন্বিত গবেষণা কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়কেও সামুদ্রিক পরিবেশ সুরক্ষায় আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে, বিশেষ করে অবৈধ মৎস্য আহরণের ফলে সৃষ্ট দূষণ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির দিকটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

সময়কাল আটককৃত বিদেশি ট্রলারের সংখ্যা আনুমানিক ক্ষতির পরিমাণ (কোটি টাকা) দেশীয় গভীর সমুদ্রগামী ট্রলারের সংখ্যা (অনুমোদিত) প্রয়োজনীয় গভীর সমুদ্রগামী ট্রলারের সংখ্যা (আনুমানিক)
২০২১ ১২ ২৫০ ৬০ ২০০
২০২২ ১৫ ৩০০ ৬২ ২২০
২০২৩ ১৮ ৩৮০ ৬৫ ২৫০
২০২৪ (প্রথম ৬ মাস) ১০ ২০০ ৬৮ ২৭০

উৎস: মৎস্য অধিদপ্তর ও কোস্ট গার্ডের বিভিন্ন প্রতিবেদন, ২০২৪।

সুপারিশ

  • আইন প্রয়োগ ও নজরদারি জোরদারকরণ: বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড এবং মৎস্য অধিদপ্তরকে অত্যাধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি (যেমন: ভিএসএস, স্যাটেলাইট মনিটরিং) ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টহল জাহাজ সরবরাহ করে বঙ্গোপসাগরের গভীর জলসীমায় বিদেশি ট্রলারের অবৈধ অনুপ্রবেশ কঠোরভাবে দমন করতে হবে। একই সাথে, মেরিন ফিশারিজ অ্যাক্ট, ২০২০ অনুযায়ী অবৈধ মৎস্য আহরণকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে সামুদ্রিক পরিবেশের ওপর এর প্রভাব মূল্যায়নে মৎস্য অধিদপ্তরের সাথে যৌথভাবে কাজ করতে হবে।

  • দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন: মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে একটি সুনির্দিষ্ট দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে দেশীয় মৎস্যজীবীদের জন্য আধুনিক গভীর সমুদ্রগামী ট্রলার ক্রয়ে সহজ শর্তে ঋণ, ভর্তুকি এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার ব্যবস্থা থাকবে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর তত্ত্বাবধানে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটকে গভীর সমুদ্রের মৎস্য সম্পদ, এর প্রজনন ও বিচরণ ক্ষেত্র নিয়ে নিবিড় গবেষণা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল ও অবকাঠামো সরবরাহ করতে হবে, যা BARI ও BRRI-এর মতো স্থলভিত্তিক গবেষণা মডেলের অনুপ্রেরণায় সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে সহায়ক প্রযুক্তি ও পদ্ধতি উদ্ভাবনে সহায়তা করবে।

  • টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সুরক্ষা: পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে মৎস্য অধিদপ্তর এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় করে সামুদ্রিক সংরক্ষিত অঞ্চল (Marine Protected Areas) প্রতিষ্ঠা ও কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে হবে, যেখানে মাছের প্রজনন ও বৃদ্ধি নির্বিঘ্নে হতে পারবে। DAE-এর খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচির সাথে সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার একটি সমন্বিত রূপরেখা তৈরি করতে হবে, যাতে নিশ্চিত করা যায় যে, মৎস্য আহরণের ফলে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট না হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের খাদ্য চাহিদা পূরণ হয়।


✍️ নিবন্ধ লেখক: শহীদুল ইসলাম

শহীদুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ব্লু ইকোনমি ও সামুদ্রিক সম্পদ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator