জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: জিন এডিটিংয়ে বিরল রোগ নিরাময়: সম্ভাবনা ও নৈতিকতার প্রশ্ন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: জিন এডিটিংয়ে বিরল রোগ নিরাময়: সম্ভাবনা ও নৈতিকতার প্রশ্ন

ড. আদনান সামি  avatar   
ড. আদনান সামি
জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: জিন এডিটিংয়ে বিরল রোগ নিরাময়: সম্ভাবনা ও নৈতিকতার প্রশ্ন
জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: জিন এডিটিংয়ে বিরল রোগ নিরাময়: সম্ভাবনা ও নৈতিকতার প্রশ্ন
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বিশ্বজুড়ে জিন এডিটিং প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি, বিশেষত ক্রিসপার-ক্যাস৯ (CRISPR-Cas9) ভিত্তিক চিকিৎসার অনুমোদন, বিরল রোগ নিরাময়ের নতুন দিগন্ত উন...

সম্প্রতি, বিশ্বজুড়ে জিন এডিটিং প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি, বিশেষত ক্রিসপার-ক্যাস৯ (CRISPR-Cas9) ভিত্তিক চিকিৎসার অনুমোদন, বিরল রোগ নিরাময়ের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। গত বছর মার্কিন খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন (FDA) দুটি ক্রিসপার-ভিত্তিক থেরাপি, যেমন সিকেল সেল অ্যানিমিয়া (sickle cell anemia) এবং বিটা থ্যালাসেমিয়া (beta thalassemia) নিরাময়ের জন্য 'ক্যাজগেভি' (Casgevy) এবং 'লিবমেলডি' (Libmeldy) অনুমোদন করেছে। এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ শুধু বৈজ্ঞানিক সাফল্যের প্রতীক নয়, বরং এটি বিরল জেনেটিক রোগের সঙ্গে লড়াই করা কোটি কোটি মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছে। বাংলাদেশে, যেখানে থ্যালাসেমিয়া, সিকেল সেল অ্যানিমিয়া এবং অন্যান্য জন্মগত ত্রুটির প্রকোপ উল্লেখযোগ্য, সেখানে এই উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তির সম্ভাবনা ও এর সঙ্গে জড়িত নৈতিক প্রশ্ন নিয়ে গভীর আলোচনা ও প্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখনই ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নীতি নির্ধারণ ও অবকাঠামো উন্নয়নে মনোনিবেশ করতে হবে।

জিনোমিক্স এবং উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি, বিশেষত জিন এডিটিং, ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসার সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে রোগের মূল কারণকে লক্ষ্য করে। যেখানে প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো সাধারণত রোগের লক্ষণগুলি নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে জিন এডিটিং কোষের ডিএনএ স্তরে ত্রুটিপূর্ণ জিনকে সংশোধন করে রোগকে স্থায়ীভাবে নিরাময় করার ক্ষমতা রাখে। ক্রিসপার-ক্যাস৯ প্রযুক্তির মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত নির্ভুলভাবে ডিএনএ-এর নির্দিষ্ট অংশে পরিবর্তন আনতে পারেন, যা হিমোফিলিয়া, সিস্টিক ফাইব্রোসিস, হান্টিংটনস রোগ এবং বিভিন্ন প্রকার ক্যান্সারের মতো জটিল জেনেটিক রোগের চিকিৎসায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। এই প্রযুক্তিটি শুধুমাত্র একক জিনের ত্রুটিযুক্ত রোগ নয়, বরং একাধিক জিনের সঙ্গে জড়িত জটিল রোগগুলিকেও লক্ষ্য করার সম্ভাবনা রাখে। এই আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োগে রোগীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে পারে, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য একটি বিশাল অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিধা বয়ে আনতে পারে। তবে, এই প্রযুক্তিগুলির গবেষণা, উন্নয়ন ও প্রয়োগ অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং এর জন্য উচ্চ প্রশিক্ষিত জনবল ও অত্যাধুনিক গবেষণাগার প্রয়োজন, যা বর্তমানে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোতে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

জিন এডিটিং এর অপার সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনি এর সাথে জড়িত নৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নগুলোও কম জটিল নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কগুলোর মধ্যে একটি হলো 'জার্মলাইন এডিটিং' (germline editing) বনাম 'সোমাটিক সেল এডিটিং' (somatic cell editing)। সোমাটিক সেল এডিটিং একজন ব্যক্তির শরীরের নির্দিষ্ট কোষকে লক্ষ্য করে এবং এর পরিবর্তন পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে স্থানান্তরিত হয় না। কিন্তু জার্মলাইন এডিটিং, যা ডিম্বাণু, শুক্রাণু বা ভ্রূণের জিন পরিবর্তন করে, সেই পরিবর্তনগুলো বংশানুক্রমিকভাবে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে চলে যেতে পারে। এটি 'ডিজাইনার বেবি' তৈরির ধারণাকে উৎসাহিত করে, যা মানবজাতির মৌলিক জৈবিক কাঠামোতে অযাচিত হস্তক্ষেপের নৈতিক উদ্বেগ সৃষ্টি করে। এছাড়া, এই অত্যন্ত ব্যয়বহুল চিকিৎসা পদ্ধতি সমাজের উচ্চবিত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, যা স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বৈষম্য আরও বাড়াতে পারে। অপ্রত্যাশিত অফ-টার্গেট এডিটিং বা জিনে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের সম্ভাবনাও রয়েছে, যা নতুন স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এই ধরনের প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি শক্তিশালী আইনি ও নৈতিক কাঠামো অপরিহার্য। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR) এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলিকে এই নৈতিক দিকগুলি নিয়ে গবেষণা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তিগুলি দায়িত্বশীলভাবে প্রয়োগ করা যায়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তির সুফল পেতে হলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, বিরল রোগগুলির ব্যাপকতা এবং জেনেটিক কারণ সম্পর্কে পর্যাপ্ত ডাটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি, যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর অধীনে একটি জাতীয় রেজিস্ট্রি তৈরির মাধ্যমে সম্ভব। দ্বিতীয়ত, এই প্রযুক্তিগুলি ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, যেমন উন্নত জিনোমিক ল্যাবরেটরি এবং বায়োইনফরমেটিক্স ক্ষমতা তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, জিন এডিটিং থেরাপির ক্লিনিকাল ট্রায়াল পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রোটোকল এবং নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া স্থাপন করা প্রয়োজন। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এর তত্ত্বাবধানে এই প্রক্রিয়াগুলির স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। চতুর্থত, এই ক্ষেত্রে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করার জন্য বায়োটেকনোলজি, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং বায়োএথিক্সে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কর্মসূচী চালু করতে হবে। পরিশেষে, এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা পদ্ধতি যেন সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে, তার জন্য সরকার এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা এবং বিশেষ তহবিল গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।

জিনোমিক্স ও বিরল রোগ সংক্রান্ত সূচক (বাংলাদেশ) পরিমাণ/শতাংশ ব্যাখ্যা
থ্যালাসেমিয়া বাহকের হার ১০-১২% (মোট জনসংখ্যা) বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিটা-থ্যালাসেমিয়া এবং হিমোগ্লোবিন ই রোগের বাহক।
জাতীয় জেনেটিক স্ক্রিনিং কর্মসূচী সীমিত/প্রস্তাবিত বর্তমানে জাতীয় পর্যায়ে কোনো সুসংগঠিত ব্যাপক জেনেটিক স্ক্রিনিং কর্মসূচী নেই, তবে MOHFW এর অধীনে আলোচনা চলছে।
জিনোমিক গবেষণাগারের সংখ্যা (উন্নত) ৫-৭টি (আনুমানিক) সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে অত্যাধুনিক জিনোম সিকোয়েন্সিং ও এডিটিং গবেষণাগারের সংখ্যা এখনো অপ্রতুল।
বিরল রোগের জন্য বাজেট বরাদ্দ সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ নেই জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেটে বিরল রোগ নিরাময় ও গবেষণার জন্য সুনির্দিষ্ট বা পর্যাপ্ত বরাদ্দ নেই।
ডিজিটাল হেলথ রেজিস্ট্রি (জেনেটিক রোগ) প্রারম্ভিক পর্যায় IEDCR এবং DGHS এর সহযোগিতায় কিছু রোগের জন্য ডাটা সংগ্রহ শুরু হলেও, একটি পূর্ণাঙ্গ রেজিস্ট্রি এখনো অনুপস্থিত।

উৎস: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর বার্ষিক প্রতিবেদন, IEDCR এর গবেষণা প্রকাশনা এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এর নীতি আলোচনা (২০২৩-২০২৪)।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এর অধীনে একটি 'জাতীয় বায়োএথিক্স কমিটি' গঠন করা, যা জিন এডিটিং এবং অন্যান্য উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতির নৈতিক ও আইনি দিকগুলি পর্যালোচনা করে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করবে। এই নীতিমালা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও কার্যকর হবে, যাতে বাংলাদেশে এই প্রযুক্তিগুলির নিরাপদ ও দায়িত্বশীল প্রয়োগ নিশ্চিত হয়।
  • রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR) এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর তত্ত্বাবধানে জিনোমিক গবেষণা, বিরল রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার জন্য অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি সুবিধা স্থাপন করা। এই উদ্যোগের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ (বায়োইনফরমেটিস্ট, জেনেটিসিস্ট) তৈরি এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচী চালু করা।
  • স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর অধীনে একটি 'বিরল রোগ তহবিল' (Rare Disease Fund) গঠন করা এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা ও চিকিৎসা সহায়তা কর্মসূচী হাতে নেওয়া। এর ফলে জিন এডিটিংয়ের মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসা পদ্ধতি সমাজের সকল স্তরের মানুষের জন্য সহজলভ্য হবে এবং এর ক্লিনিকাল ট্রায়াল ও প্রয়োগে আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা যাবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. আদনান সামি

ড. আদনান সামি 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

لم يتم العثور على تعليقات


News Card Generator