মিথ্যা তথ্যের গতি বনাম সত্য যাচাইয়ের সময়: ফ্যাক্ট-চেকারদের অনন্ত দৌড় | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মিথ্যা তথ্যের গতি বনাম সত্য যাচাইয়ের সময়: ফ্যাক্ট-চেকারদের অনন্ত দৌড়

তানজিনা ইয়াসমিন  avatar   
তানজিনা ইয়াসমিন
মিথ্যা তথ্যের গতি বনাম সত্য যাচাইয়ের সময়: ফ্যাক্ট-চেকারদের অনন্ত দৌড়
মিথ্যা তথ্যের গতি বনাম সত্য যাচাইয়ের সময়: ফ্যাক্ট-চেকারদের অনন্ত দৌড়
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (আইসিটি বিভাগ) কর্তৃক প্রকাশিত 'ডিজিটাল বাংলাদেশ: চ্যালেঞ্জেস ইন ইনফরমেশন ইকোসিস্টেম' শীর্ষক এক সমীক্ষা প্রতিবেদন দে...

সম্প্রতি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (আইসিটি বিভাগ) কর্তৃক প্রকাশিত 'ডিজিটাল বাংলাদেশ: চ্যালেঞ্জেস ইন ইনফরমেশন ইকোসিস্টেম' শীর্ষক এক সমীক্ষা প্রতিবেদন দেশের তথ্যপ্রবাহের এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। এতে দেখা গেছে, একটি ভুল তথ্য বা গুজব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গড়ে মাত্র ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে হাজার হাজার ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছে যেতে পারে, যেখানে সেই তথ্যের সত্যতা যাচাই করে একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিউত্তর তৈরি করতে ফ্যাক্ট-চেকারদের ন্যূনতম ২-৩ ঘণ্টা থেকে শুরু করে ক্ষেত্রবিশেষে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে যায়। এই বিশাল সময়ের ব্যবধান, যা 'তথ্য যাচাইয়ের অনন্ত দৌড়' নামে পরিচিতি লাভ করেছে, দেশের ডিজিটাল সমাজে বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্থিতিশীলতার উপর গভীর ছায়া ফেলছে। এই অসম দৌড় কেবল একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়, বরং এটি আমাদের সামাজিক সংহতি, জনস্বাস্থ্য এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য এক সুদূরপ্রসারী হুমকি।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর গঠনগত বৈশিষ্ট্যই মিথ্যা তথ্যের দ্রুত প্রসারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। অ্যালগরিদমগুলো ব্যবহারকারীদের আবেগপ্রবণ ও চাঞ্চল্যকর কন্টেন্টে আকৃষ্ট হওয়ার প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে এমন পোস্টগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়, যা দ্রুত শেয়ার হয় ও মিথস্ক্রিয়া বাড়ায়। ফলে, একটি ভিত্তিহীন গুজব চোখের পলকে 'ভাইরাল' হয়ে ওঠে, যা সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে ছড়ানো হয়। অন্যদিকে, ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের প্রক্রিয়াটি inherently ধীরগতির। একটি তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য একাধিক স্বাধীন উৎস থেকে ডেটা সংগ্রহ, বিশেষজ্ঞ মতামত গ্রহণ, চিত্রের ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং বক্তব্যের প্রেক্ষাপট যাচাই করা অপরিহার্য। এই প্রতিটি ধাপেই সময় ও শ্রমের প্রয়োজন হয়, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটে না। ফলস্বরূপ, যখন ফ্যাক্ট-চেকাররা তাদের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ শেষে সত্য তথ্য উপস্থাপন করেন, ততক্ষণে মিথ্যা তথ্যটি সমাজের গভীরে প্রোথিত হয়ে জনমতকে প্রভাবিত করে ফেলেছে এবং এর ক্ষতিকর প্রভাবগুলো সমাজে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতির কারণে, প্রায়শই দেখা যায় যে সত্য যাচাইয়ের প্রচেষ্টা মিথ্যা তথ্যের ব্যাপকতা ও ক্ষতিকর প্রভাবকে পুরোপুরি প্রশমিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

এই অসম প্রতিযোগিতার ফলস্বরূপ জনসাধারণের মধ্যে তথ্যের প্রতি অবিশ্বাস জন্মাচ্ছে এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। বিশেষ করে, জনস্বাস্থ্য বিষয়ক ভুল তথ্য (যেমন কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন সম্পর্কিত গুজব) সমাজে ব্যাপক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করেছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক গুজব জনমনে অস্থিরতা ও বিভেদ সৃষ্টিতে ইন্ধন যুগিয়েছে। ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাগুলো, যেমন বিডি ফ্যাক্টচেক বা রিউমার স্ক্যানার, সীমিত জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ে এই বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। তারা একদিকে যেমন দ্রুত ছড়ানো ভুল তথ্যের স্রোত থামাতে হিমশিম খাচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি বৃহৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে কার্যকর সমন্বয়ের অভাবেও ভুগছে। আন্তর্জাতিকভাবে World Bank এবং ADB মতো সংস্থাগুলো ডিজিটাল স্বাক্ষরতা বৃদ্ধিতে এবং ভুল তথ্য মোকাবেলায় বিভিন্ন দেশের সরকারকে সহায়তা করলেও, বাংলাদেশে এই খাতের জন্য একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত বিনিয়োগ এখনো অপ্রতুল। ফলস্বরূপ, ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের উদ্যোগগুলো প্রায়শই খণ্ড খণ্ড ও বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হচ্ছে, যা সমস্যার সামগ্রিক সমাধানে যথেষ্ট নয়। একটি শক্তিশালী তথ্য যাচাই কাঠামো গড়ে তুলতে সরকার, বেসরকারি সংস্থা, মিডিয়া এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে নিবিড় সহযোগিতা অপরিহার্য।

সূচক ২০২০ ২০২১ ২০২২ ২০২৩
সামাজিক মাধ্যমে একটি ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার গড় সময় (মিনিট) ৩০ ২৫ ২০ ১৫
একটি ভুল তথ্য যাচাই করে সঠিক তথ্য প্রকাশে ফ্যাক্ট-চেকারদের গড় সময় (ঘণ্টা) ৪ ৩.৫ ৩ ২.৫
ডিজিটাল স্বাক্ষরতা সম্পন্ন জনগোষ্ঠীর শতাংশ (১৫-৬০ বছর) ৬৫% ৬৭% ৬৯% ৭১%
গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের জন্য সামাজিক মাধ্যমের উপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর শতাংশ ৫৫% ৫৮% ৬২% ৬৬%

উৎস: তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, বাংলাদেশ সরকার ও World Bank-এর যৌথ সমীক্ষা (২০২৩)

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের মাধ্যমে, একটি জাতীয় ডিজিটাল মিডিয়া স্বাক্ষরতা প্রোগ্রাম চালু করবে, যা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত বাধ্যতামূলক পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে। এই প্রোগ্রামের লক্ষ্য হবে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং অনলাইন তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি করা।
  • সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (যেমন, তথ্য মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়) একটি 'দ্রুত প্রতিক্রিয়া ইউনিট' (Rapid Response Unit) প্রতিষ্ঠা করবে, যা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বা জনস্বাস্থ্য সংকটের সময় দ্রুত ভুল তথ্য শনাক্ত এবং সঠিক তথ্য প্রচারে কাজ করবে। এই ইউনিট স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাগুলোর সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করবে এবং World Bank ও ADB-এর প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তায় এর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে।
  • বাংলাদেশ সরকার, একটি নতুন 'ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম জবাবদিহিতা আইন' প্রণয়ন করবে, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোকে তাদের প্ল্যাটফর্মে প্রচারিত ভুল তথ্য শনাক্তকরণ ও অপসারণের জন্য আরও কঠোর মানদণ্ড এবং সময়সীমা মেনে চলতে বাধ্য করবে। এই আইনে প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য স্বচ্ছতা এবং স্থানীয় ফ্যাক্ট-চেকারদের সাথে কার্যকর সহযোগিতার জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানজিনা ইয়াসমিন

তানজিনা ইয়াসমিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মিসইনফরমেশন ও ফ্যাক্ট-চেকিং। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nessun commento trovato


News Card Generator