মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন আইন-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন আইন-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ

রেজাউল করিম শিকদার  avatar   
রেজাউল করিম শিকদার
মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন আইন-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ
মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন আইন-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) মানব পাচার প্রতিরোধ ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতকরণে নতুন করে বিনিয়োগের পথ খ...

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) মানব পাচার প্রতিরোধ ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতকরণে নতুন করে বিনিয়োগের পথ খুলে দিয়েছে। বিশেষ করে, 'Resilient, Inclusive, and Safe Migration (RISM)' প্রকল্পের আওতায় অতিরিক্ত ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই সহায়তার প্রতিশ্রুতি মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ এবং অভিবাসী কর্মী (নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা) আইন, ২০১৩-এর কার্যকর বাস্তবায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিচারিক প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং পাচারের শিকার ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনে জোর দেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে, মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন আইনে বিদ্যমান বিনিয়োগের বর্তমান চিত্র, এর সাথে জড়িত সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাগুলো সুনির্দিষ্টভাবে পরিমাপ করা আবশ্যক।

মানব পাচার প্রতিরোধ ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতকরণে বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের বিনিয়োগ কেবল আর্থিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, জনসচেতনতা তৈরি এবং বিচারিক প্রক্রিয়া শক্তিশালীকরণের বিস্তৃত ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করে। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বব্যাংকের 'Resilient, Inclusive, and Safe Migration (RISM)' প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করা হয়েছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সরাসরি অভিবাসন ব্যবস্থাপনা, পাচার প্রতিরোধ ও ভুক্তভোগী পুনর্বাসনে ব্যয়িত হচ্ছে। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে অভিবাসন তথ্য কেন্দ্র স্থাপন, বিএমইটি (Bureau of Manpower, Employment and Training) কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, এবং পাচার প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে কমিটিগুলোর কার্যক্রমকে সমর্থন জানানো হচ্ছে। একইসাথে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) অভিবাসী কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রাক-বহির্গমন প্রশিক্ষণে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করছে, যা নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতকরণে একটি মৌলিক বিনিয়োগ। সংশ্লিষ্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মানব পাচার মামলার তদন্তে নিয়োজিত আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ, আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহ এবং ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব স্থাপনে বাজেট বরাদ্দ করছে। এই বিনিয়োগের মূল লক্ষ্য হলো মানব পাচারের উৎস, ট্রানজিট পয়েন্ট এবং গন্তব্যস্থলে অপরাধীদের সনাক্তকরণ ও বিচারের আওতায় আনা, যা দেশের বিচারিক ব্যবস্থায় একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এছাড়াও, নারী ও শিশু পাচার প্রতিরোধে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সচেতনতা কর্মসূচি এবং ভুক্তভোগীদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে বিনিয়োগ করছে, যা পাচার প্রতিরোধে সামাজিক বিনিয়োগের একটি বড় অংশ।

এই বিশাল বিনিয়োগের পাশাপাশি মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন আইনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ঝুঁকি বিদ্যমান, যা এর কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে। প্রথমত, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২-এর অধীনে গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালগুলোর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ফলে মামলার জট তৈরি হচ্ছে এবং বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে, যা ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে বিলম্ব ঘটাচ্ছে এবং অপরাধীদের বিচার এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অনেক জেলায় এখনও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করেনি অথবা পর্যাপ্ত বিচারক ও সহযোগী কর্মীর অভাবে ধীরগতিতে চলছে। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, যেমন – পুলিশ, র‌্যাব, কোস্ট গার্ড, বিজিবি এবং অভিবাসন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের (যেমন – বিএমইটি) মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদান ও সমন্বয়ের অভাব একটি বড় ঝুঁকি। মানব পাচার একটি আন্তঃদেশীয় অপরাধ হওয়ায় এর প্রতিরোধে সমন্বিত পদক্ষেপ অপরিহার্য, কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে এই সমন্বয়হীনতা অপরাধীদের সুযোগ করে দিচ্ছে। তৃতীয়ত, দুর্নীতির ঝুঁকি মানব পাচার প্রতিরোধ প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। বিশেষ করে, কিছু অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি এবং স্থানীয় দালাল চক্রের অপতৎপরতা অভিবাসন প্রক্রিয়াকে অনিরাপদ করে তুলছে এবং মানব পাচারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিথ্যা প্রলোভন ও উচ্চ খরচের কারণে অনেক অভিবাসী কর্মী ঋণের ফাঁদে পড়ে মানব পাচারের শিকার হচ্ছেন। চতুর্থত, পাচারের শিকার ভুক্তভোগীদের সনাক্তকরণ, উদ্ধার ও পুনর্বাসনে অপর্যাপ্ত সহায়তা আরেকটি বড় ঝুঁকি। অনেক ভুক্তভোগী সামাজিক কলঙ্ক, মানসিক আঘাত এবং আর্থিক সংকটের কারণে পুনরায় পাচারের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। এই ঝুঁকিগুলো মোকাবিলা না করতে পারলে আইনের উদ্দেশ্য পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

তবে, এই খাতে বিনিয়োগ এবং আইনের কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য বিশাল সম্ভাবনা উন্মোচিত হতে পারে। সুষ্ঠুভাবে বিনিয়োগ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশ নিরাপদ, নিয়মিত ও দায়িত্বশীল অভিবাসনের একটি মডেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। প্রথমত, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ এবং অভিবাসী কর্মী (নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা) আইন, ২০১৩-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে এবং আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করবে। এটি বাংলাদেশের জন্য নতুন নতুন শ্রমবাজার উন্মুক্ত করতে এবং বিদ্যমান শ্রমবাজারগুলোতে কর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। দ্বিতীয়ত, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে, যা দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের জিডিপি’তে একটি উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। নিরাপদ অভিবাসন এই প্রবাহকে আরও টেকসই করবে। তৃতীয়ত, পাচারের শিকার ভুক্তভোগীদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত হলে তারা সমাজের মূল স্রোতে ফিরে আসতে পারবে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারবে। এটি কেবল তাদের ব্যক্তিগত জীবনকে নয়, বরং তাদের পরিবার এবং সামগ্রিকভাবে সমাজের উন্নতিতে সহায়ক হবে। চতুর্থত, প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ যেমন – একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডেটাবেজ স্থাপন এবং স্মার্ট কার্ডের ব্যবহার অভিবাসন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করবে, যার ফলে অবৈধ রিক্রুটিং এবং পাচারের সুযোগ কমে আসবে। বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহ যদি বিশ্বব্যাংক ও ADB-এর মতো আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহায়তায় এই সম্ভাবনাগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে, তবে মানব পাচার প্রতিরোধে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন এবং নিরাপদ অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় একটি নেতৃত্বশীল ভূমিকা পালন করা সম্ভব হবে।

বছর মানব পাচার মামলা (দায়েরকৃত) মানব পাচার মামলা (নিষ্পন্ন) উদ্ধারকৃত ভুক্তভোগী বিশ্বব্যাংকের নিরাপদ অভিবাসন প্রকল্পে বিনিয়োগ (মিলিয়ন মার্কিন ডলার)
২০১৯ ৪৭৫ ১২০ ৯৫০ ৫০
২০২০ ৫১০ ১৫০ ১১২০ ৭৫
২০২১ ৫৬০ ১৮৫ ১২৮০ ১০০
২০২২ ৬০০ ২১০ ১৪০০ ১৫০
২০২৩ ৬৩০ ২৩০ ১৫৫০ ১৮০

উৎস: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন শাখা), প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং বিশ্বব্যাংকের RISM প্রকল্প প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ এর অধীনে গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালসমূহের সংখ্যা অবিলম্বে বৃদ্ধি করা এবং বিচারকদের জন্য নিয়মিত বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা। এর মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তির হার বৃদ্ধি পাবে এবং ভুক্তভোগীরা দ্রুত ন্যায়বিচার পাবেন। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান: আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
  • প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-এর মধ্যে একটি সমন্বিত 'জাতীয় টাস্কফোর্স' গঠন করে মানব পাচার প্রতিরোধ ও ভুক্তভোগী পুনর্বাসনের জন্য একটি অভিন্ন, প্রযুক্তি-নির্ভর কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা। বাংলাদেশ সরকার এই টাস্কফোর্সের কার্যকারিতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে।
  • অভিবাসন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে 'অভিবাসী কর্মী (নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা) আইন, ২০১৩' এর আওতায় একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডেটাবেজ ও অভিযোগ নিষ্পত্তি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। এই প্ল্যাটফর্মে বিশ্বব্যাংক এবং ADB-এর প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করে অবৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালালদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রেজাউল করিম শিকদার

রেজাউল করিম শিকদার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Tidak ada komentar yang ditemukan


News Card Generator