আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের হেলথ-টেক ও টেলিমেডিসিন: তুলনামূলক বিশ্লেষণ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের হেলথ-টেক ও টেলিমেডিসিন: তুলনামূলক বিশ্লেষণ

ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা  avatar   
ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা
আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের হেলথ-টেক ও টেলিমেডিসিন: তুলনামূলক বিশ্লেষণ
আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের হেলথ-টেক ও টেলিমেডিসিন: তুলনামূলক বিশ্লেষণ
ছবি: সংগৃহীত
সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক ডিজিটাল স্বাস্থ্য সেবা এবং টেলিমেডিসিনকে জাতীয় স্বাস্থ্য সেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ঘোষণা করার...

সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক ডিজিটাল স্বাস্থ্য সেবা এবং টেলিমেডিসিনকে জাতীয় স্বাস্থ্য সেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ঘোষণা করার পর, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারীর প্রেক্ষাপটে যখন বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে ওঠে, তখন বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোও এই পরিবর্তনের ধারায় নিজেদের সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করেছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের ডিজিটাল স্বাস্থ্য রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, যা দেশের স্বাস্থ্য-প্রযুক্তি খাতকে এক নতুন দিগন্তে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখাচ্ছে।

বাংলাদেশের হেলথ-টেক ও টেলিমেডিসিন খাতের বর্তমান চিত্রটি দ্রুত পরিবর্তনশীল। এক দশক আগেও যেখানে টেলিমেডিসিন একটি প্রায় অপরিচিত ধারণা ছিল, সেখানে এখন এটি বিশেষত গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার, বিশেষত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে টেলিমেডিসিন সেবা চালু করেছে এবং জাতীয় হেল্পলাইন ৩৩৩ এর মাধ্যমে নাগরিকদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরামর্শ প্রদান করছে। তবে, এই খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে ডেটা সুরক্ষা, আন্তঃপরিচালনাযোগ্যতা (interoperability) এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য সাক্ষরতার মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে আরও মনোযোগ দিতে হবে। প্রতিবেশী দেশ ভারত, তাদের ‘জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্য মিশন’ এর মাধ্যমে একটি সমন্বিত ডিজিটাল স্বাস্থ্য ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, যেখানে রোগীর ডেটা, স্বাস্থ্যকর্মী এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি একক প্ল্যাটফর্মে আনা হয়েছে। সিঙ্গাপুর এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং মেশিন লার্নিং (ML) ব্যবহার করে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পরিকল্পনায় অনেক এগিয়ে আছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী মডেল হতে পারে।

এই খাতের উন্নয়নে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণও লক্ষণীয়। বেশ কিছু দেশীয় স্টার্টআপ মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে চিকিৎসকের পরামর্শ, ঔষধ সরবরাহ এবং ডায়াগনস্টিক সেবা প্রদান করছে। তবে, অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ, বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেটের অভাব এবং ডিজিটাল ডিভাইসের সহজলভ্যতার সীমাবদ্ধতা এখনও একটি বড় বাধা। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক তাদের 'হেলথ সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট'-এর আওতায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে ডিজিটাইজেশন এবং তথ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে, যা স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে। একইভাবে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) 'স্ট্রেন্থেনিং হেলথ সিস্টেমস প্রজেক্ট'-এর মাধ্যমে ডিজিটাল স্বাস্থ্য রেকর্ড সিস্টেমের প্রবর্তন এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করছে। এই বিনিয়োগগুলো বাংলাদেশের স্বাস্থ্য-প্রযুক্তি ইকোসিস্টেমকে শক্তিশালী করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এর কার্যকর বাস্তবায়ন এবং টেকসইতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। ডেটা নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তা নিশ্চিত করার জন্য একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো প্রণয়ন এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি, যা ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করবে।

সূচক ২০১৯ সাল (প্রাক-কোভিড) ২০২১ সাল (কোভিড পরবর্তী) বৃদ্ধি/পরিবর্তন
সরকারি টেলিমেডিসিন হটলাইন ব্যবহারকারী (মাসিক) আনুমানিক ১,৫০,০০০ আনুমানিক ৮,০০,০০০ ৪৩৩% বৃদ্ধি
ডিজিটাল স্বাস্থ্য অ্যাপ ব্যবহারকারী (মাসিক, শীর্ষ ৫ অ্যাপ) আনুমানিক ২,০০,০০০ আনুমানিক ১,০০০,০০০ ৪০০% বৃদ্ধি
ওয়ার্ল্ড ব্যাংক কর্তৃক ডিজিটাল স্বাস্থ্য অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ (মিলিয়ন USD) ৩০ ৫০ ৬৭% বৃদ্ধি
গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেট ব্যবহার করে স্বাস্থ্য পরামর্শ গ্রহণ (%) ১০% ৩০% ২০০% বৃদ্ধি

উৎস: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ; ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ডেটা; দেশীয় হেলথ-টেক প্ল্যাটফর্মের প্রতিবেদন (আনুমানিক)।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে দ্রুত একটি সুনির্দিষ্ট 'জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্য আইন' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যা ডেটা সুরক্ষা, রোগীর গোপনীয়তা এবং আন্তঃপরিচালনাযোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করবে। এটি ভারতের 'জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্য মিশন' আইনের মতো একটি ব্যাপক কাঠামো অনুসরণ করতে পারে।
  • বাংলাদেশ সরকার, World Bank এবং ADB-এর সহায়তায়, গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেট অবকাঠামো সম্প্রসারণে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং স্থানীয় উদ্ভাবনী হেলথ-টেক স্টার্টআপগুলোর জন্য 'হেলথ-টেক ইনোভেশন ফান্ড' প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই তহবিল থেকে মেন্টরশিপ ও প্রযুক্তিগত সহায়তাও প্রদান করা উচিত।
  • স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে দেশের সকল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে 'টেলিমেডিসিন ও ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র' স্থাপন করে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য নিয়মিত দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচী চালু করতে হবে, যাতে তারা আধুনিক হেলথ-টেক সরঞ্জাম ও প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে পারদর্শী হতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা

ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: হেলথ-টেক ও টেলিমেডিসিন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Walang nakitang komento


News Card Generator