বাংলাদেশের স্পোর্টস সায়েন্স ও অ্যাথলিট পারফরম্যান্স: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয় | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বাংলাদেশের স্পোর্টস সায়েন্স ও অ্যাথলিট পারফরম্যান্স: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়

ড. আসিফ রায়হান  avatar   
ড. আসিফ রায়হান
বাংলাদেশের স্পোর্টস সায়েন্স ও অ্যাথলিট পারফরম্যান্স: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়
বাংলাদেশের স্পোর্টস সায়েন্স ও অ্যাথলিট পারফরম্যান্স: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়
ছবি: সংগৃহীত
সাম্প্রতিক এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের পদক তালিকায় হতাশাজনক পারফরম্যান্স আবারও প্রশ্ন তুলেছে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে বিজ্ঞানভিত্তিক অনুশীলনের অভাব নিয়ে। যেখানে পার...

সাম্প্রতিক এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের পদক তালিকায় হতাশাজনক পারফরম্যান্স আবারও প্রশ্ন তুলেছে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে বিজ্ঞানভিত্তিক অনুশীলনের অভাব নিয়ে। যেখানে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো স্পোর্টস সায়েন্সের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে অ্যাথলিটদের পারফরম্যান্সের শিখরে পৌঁছাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনও অনেকটাই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির উপর নির্ভরশীল। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) দেশের একমাত্র বিশেষায়িত ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলেও, এর পাঠ্যক্রম ও গবেষণা কার্যক্রমে আধুনিক স্পোর্টস সায়েন্সের সম্পূর্ণ সমন্বয় এখনও এক বড় চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের স্পোর্টস সায়েন্স ও অ্যাথলিট পারফরম্যান্সের সংকট, সম্ভাবনা এবং করণীয় নিয়ে একটি গভীর বিশ্লেষণ অত্যাবশ্যক, যা দীর্ঘমেয়াদী ক্রীড়া সাফল্যের পথ উন্মোচন করতে পারে।

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে স্পোর্টস সায়েন্সের প্রাথমিক সংকটটি নিহিত রয়েছে প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ এবং অত্যাধুনিক অবকাঠামোর অপ্রতুলতায়। দেশের জাতীয় দলগুলোতে স্পোর্টস ফিজিওথেরাপিস্ট, পুষ্টিবিদ, স্পোর্টস সাইকোলজিস্ট, বায়োমেকানিক্স বিশেষজ্ঞ এবং কন্ডিশনিং কোচের মতো প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে, এসব পদ শূন্য থাকে অথবা অপ্রশিক্ষিত জনবল দ্বারা পূরণ করা হয়, যার ফলে অ্যাথলিটরা আঘাত থেকে দ্রুত সেরে উঠতে পারে না, তাদের খাদ্যাভ্যাস বিজ্ঞানসম্মত হয় না এবং মানসিক চাপ মোকাবেলায় তারা যথাযথ সহায়তা পায় না। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্পোর্টস সায়েন্স বা এর সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগও অত্যন্ত সীমিত; হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান খেলাধুলা বা শারীরিক শিক্ষা নিয়ে স্নাতক পর্যায়ের কিছু কোর্স অফার করলেও, আন্তর্জাতিক মানের স্পোর্টস সায়েন্স কারিকুলাম ও গবেষণার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। এটি বিশেষজ্ঞ তৈরির পথে এক বড় বাধা। বিদ্যমান ক্রীড়া কেন্দ্রগুলোতেও আধুনিক স্পোর্টস ল্যাব, পারফরম্যান্স অ্যানালাইসিস টুলস বা ডেটা সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব প্রকট। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় খেলাধুলার উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিলেও, স্পোর্টস সায়েন্সের জন্য সুনির্দিষ্ট এবং পর্যাপ্ত অর্থায়ন প্রায়শই অনুপস্থিত থাকে, যা এই খাতের মৌলিক ভিত্তি দুর্বল করে দেয়। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ এবং বিভিন্ন ফেডারেশনগুলোর মধ্যে স্পোর্টস সায়েন্সের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতার অভাবও এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে, যেখানে ঐতিহ্যবাহী কোচিং পদ্ধতিই এখনও মূলধারায় বিদ্যমান।

তবে এই সংকটের আড়ালে লুকিয়ে আছে বিশাল সম্ভাবনা, যা সঠিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রয়োগের মাধ্যমে কাজে লাগানো সম্ভব। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর শারীরিক সক্ষমতা এবং প্রাকৃতিক প্রতিভা বিশ্বমানের অ্যাথলিট তৈরির জন্য যথেষ্ট। বিশ্বজুড়ে স্পোর্টস ইকোনমি একটি বিশাল শিল্পে পরিণত হয়েছে, যার বাজারমূল্য ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যেখানে অ্যাথলিটদের পারফরম্যান্স সরাসরি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ব্র্যান্ড ভ্যালু এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতির সাথে সম্পর্কিত। বাংলাদেশ যদি স্পোর্টস সায়েন্সে বিনিয়োগ করে, তবে তা কেবল ক্রীড়া সাফল্যই নয়, বরং ক্রীড়া পর্যটন, ক্রীড়া পণ্য উৎপাদন, ক্রীড়া সরঞ্জাম শিল্প এবং আন্তর্জাতিক অ্যাথলিট রপ্তানির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে। বর্তমানে, বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) এবং বিভিন্ন জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশনগুলো তাদের কার্যক্রমে স্পোর্টস সায়েন্সকে সম্পূর্ণভাবে একীভূত করতে পারেনি; তাদের বাজেট এবং ফোকাস মূলত টুর্নামেন্ট আয়োজন ও অংশগ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর গবেষণা ও উন্নয়নে সমন্বয়হীনতাও একটি বড় প্রতিবন্ধকতা, যা উদ্ভাবন ও জ্ঞান বিনিময়ের পথ রুদ্ধ করে রেখেছে। ডেটা-চালিত পারফরম্যান্স অ্যানালাইসিসের অভাবে অ্যাথলিটদের প্রকৃত শক্তি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে, যা তাদের ব্যক্তিগতকৃত প্রশিক্ষণের মান উন্নয়নে বাধা দেয়। আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন World Bank এবং ADB-এর মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং যুব কর্মসূচিগুলোতে আরও কার্যকরভাবে স্পোর্টস সায়েন্স উপাদান অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে, যা জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত ও টেকসই ক্রীড়া বিজ্ঞান বাস্তুতন্ত্র গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে। তাদের ঋণ ও অনুদান প্রকল্পগুলোকে স্পোর্টস সায়েন্সের অবকাঠামো এবং বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষণে প্রবাহিত করার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী সুফল অর্জন করা সম্ভব।

ক্ষেত্র ২০১৭-১৮ অর্থবছর (কোটি টাকা) ২০২২-২৩ অর্থবছর (কোটি টাকা) পরিবর্তন (%)
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মোট বাজেট ৬০০ ১০০০ +৬৬.৬৭%
ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন (বাংলাদেশ সরকার) ১৫০ ৩০০ +১০০%
স্পোর্টস সায়েন্স গবেষণা ও উন্নয়ন (আনুমানিক) ৫ ১৫ +২০০%
বিশ্বব্যাংক/এডিবি-এর ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে অনুদান/ঋণ (আনুমানিক) ০ ৫০ N/A
বিকেএসপি-তে আধুনিক স্পোর্টস ল্যাব/সরঞ্জাম বিনিয়োগ (আনুমানিক) ০.৫ ৫ +৯০০%

উৎস: যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন, World Bank ও ADB-এর প্রকল্প প্রতিবেদন (আনুমানিক)।

সুপারিশ

  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে একটি 'জাতীয় ক্রীড়া বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট' (National Institute of Sports Science - NISS) প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই ইনস্টিটিউট জাতীয় ক্রীড়া নীতিমালার অধীনে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা এবং ক্রীড়া বিজ্ঞানী ও প্রশিক্ষকদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন প্রোগ্রাম পরিচালনা করবে। এর মাধ্যমে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ জ্ঞানকে সমন্বিত করে একটি শক্তিশালী মানবসম্পদ তৈরি করা সম্ভব হবে।
  • বাংলাদেশ সরকারকে World Bank এবং ADB-এর সাথে সমন্বয় করে ক্রীড়া বিজ্ঞান গবেষণা ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'ক্রীড়া বিজ্ঞান উন্নয়ন তহবিল' গঠন করতে হবে। এই তহবিল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো (যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট) এবং জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর মধ্যে যৌথ গবেষণা ও আঞ্চলিক স্পোর্টস সায়েন্স ল্যাব স্থাপনে অর্থায়ন করা হবে, যা 'জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন কৌশল'-এর অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।
  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনকে যৌথভাবে একটি প্রবিধান জারি করতে হবে, যেখানে প্রতিটি জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশনের জন্য তাদের জাতীয় দলের সাথে ন্যূনতম দুইজন করে স্বীকৃত স্পোর্টস ফিজিওথেরাপিস্ট ও একজন পুষ্টিবিদকে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হবে। এই নিয়োগ তাদের বার্ষিক বাজেট অনুমোদনের পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচিত হবে, যা 'ক্রীড়া আইন, ২০১৮' বা সংশ্লিষ্ট নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. আসিফ রায়হান

ড. আসিফ রায়হান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: স্পোর্টস সায়েন্স ও অ্যাথলিট পারফরম্যান্স। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Tidak ada komentar yang ditemukan


News Card Generator