জলবায়ু তহবিল ও পরিবেশ প্রকল্পে দুর্নীতির কালো ছায়া: বিপর্যস্ত বাংলাদেশ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জলবায়ু তহবিল ও পরিবেশ প্রকল্পে দুর্নীতির কালো ছায়া: বিপর্যস্ত বাংলাদেশ

ওয়াসিফ ইকবাল  avatar   
ওয়াসিফ ইকবাল
জলবায়ু তহবিল ও পরিবেশ প্রকল্পে দুর্নীতির কালো ছায়া: বিপর্যস্ত বাংলাদেশ
জলবায়ু তহবিল ও পরিবেশ প্রকল্পে দুর্নীতির কালো ছায়া: বিপর্যস্ত বাংলাদেশ
ছবি: সংগৃহীত
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততার মতো ...

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিনিয়ত দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনকে বিপর্যস্ত করছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে বিপুল পরিমাণ জলবায়ু তহবিল বরাদ্দ করা হলেও, সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এই খাতের ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর একাধিক প্রতিবেদনে পরিবেশ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড (বিসিসিটিএফ)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোতে সুশাসনের চরম ঘাটতি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ভয়াবহতা উঠে এসেছে। এই দুর্নীতি কেবল আর্থিক অপচয়ই নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার লাখ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকাকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ঘটেছে বলে টিআইবি তাদের বিভিন্ন গবেষণায় বারবার উল্লেখ করেছে। সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিবেশ সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনের দুর্বলতা, এর প্রয়োগে ব্যর্থতা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের অনিয়মের কারণে সেবাদানকারী এই প্রতিষ্ঠানটিতে দুর্নীতি জেঁকে বসেছে। পরিবেশ ছাড়পত্র গ্রহণ ও নবায়নের ক্ষেত্রে নিয়মবহির্ভূত আর্থিক লেনদেন একটি সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে, যেখানে শিল্প-কারখানার মালিকদের কাছ থেকে ৩৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৬৬ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়। এমনকি, আবাসিক এলাকাসহ আইন দ্বারা নিষিদ্ধ স্থানে ইটভাটা ও শিল্প-কারখানা স্থাপনে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের যোগসাজশের অভিযোগও উঠেছে, যা পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় ঘটাচ্ছে। দুদকের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক টিমের গবেষণা ও অনুসন্ধানেও পরিবেশ ছাড়পত্র গ্রহণে নিয়মবহির্ভূত আর্থিক লেনদেন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে গরমিলের সুনির্দিষ্ট উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া, 'নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ' প্রকল্পের অধীনে অযৌক্তিকভাবে কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে অর্থ অপচয়ের অভিযোগও টিআইবি উত্থাপন করেছে। তথ্যের উন্মুক্ততা ও স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও অধিদপ্তরের ঘাটতি রয়েছে; ওয়েবসাইটে বাজেট, প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য, দূষণের মাত্রা বা এর জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠানের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হয় না। সম্প্রতি, মানিকগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন পরিদর্শক ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন, যা এই খাতের দুর্নীতির একটি বাস্তব উদাহরণ।

বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে গঠিত বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড (বিসিসিটিএফ)-এর প্রকল্পগুলোতেও ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র পাওয়া গেছে। টিআইবির এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিসিসিটিএফ-এর ৮৯১টি প্রকল্পে বরাদ্দকৃত প্রায় ৩ হাজার ৮৯৬ কোটি টাকার মধ্যে ২ হাজার ১১০ কোটি টাকারও বেশি (প্রায় ৫৪ শতাংশ) দুর্নীতি বা অপচয়ের শিকার হয়েছে। এই দুর্নীতির প্রধান ক্ষেত্রগুলো হলো প্রকল্প অনুমোদন, ঠিকাদার নিয়োগ এবং বাস্তবায়ন পর্যায়। প্রকল্প অনুমোদনে ১৭৫ কোটি টাকা ঘুষ ও অবৈধ লেনদেন, ঠিকাদার নিয়োগে ৬০০ কোটি টাকা অনিয়ম এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ে ১ হাজার ২৮০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এমনকি, তদারকি পর্যায়েও ৫৪ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে বলে টিআইবি জানিয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব, ট্রাস্টি বোর্ড ও কারিগরি কমিটির সদস্যদের যোগসাজশ এবং তহবিল ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয়তা এসব অনিয়মের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিশেষ করে সৌর সড়কবাতি স্থাপন সংক্রান্ত প্রকল্পগুলোতে অতিমূল্যায়নের মাধ্যমে ১৭০ কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ হয়েছে বলে অনুমান করা হয়। উপকূলীয় অঞ্চলের বরগুনা, সাতক্ষীরা ও পটুয়াখালীর চারটি অভিযোজন প্রকল্পে ১৪ থেকে ৭৭ শতাংশ পর্যন্ত দুর্নীতি হয়েছে বলে টিআইবি ও SOAS ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের এক যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে, যার ফলে অনেক বাঁধ ও ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র অসম্পূর্ণ বা নিম্নমানের রয়ে গেছে।

জলবায়ু তহবিলের এই ব্যাপক অপচয় ও অনিয়ম জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য এক গভীর সংকট তৈরি করেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা একটি সাধারণ চিত্র; পর্যালোচনা করা ৮৯১টি প্রকল্পের মধ্যে ৬২ শতাংশেরই মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে, যা প্রকল্পের কার্যকারিতা ও উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করছে। সংসদ সদস্যরাও জলবায়ু পরিবর্তন তহবিলের ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, যেখানে জনপ্রতিনিধিরা তহবিলের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে অবগত নন। এই পরিস্থিতিতে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ, যেমন ২০২২ সালে চূড়ান্ত করা জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (ন্যাপ) এবং সম্প্রতি ২৯টি নতুন প্রকল্পের অনুমোদন, প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। যদিও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান দুর্নীতির বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি ঘোষণা করেছেন, তবে এই নীতি বাস্তবায়নে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অর্থায়নেও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে; যেমন, ব্রিটিশ অর্থায়নে পরিচালিত একটি বড় জলবায়ু প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যা হাজারো মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে অর্থপ্রাপ্তি বাংলাদেশের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা সুশাসনের অভাবে আরও জটিল হচ্ছে।

এই সামগ্রিক পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রচেষ্টা কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গেই নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও সুশাসনের চ্যালেঞ্জের সঙ্গেও লড়াই করছে। জলবায়ু তহবিলের অপচয় এবং পরিবেশগত প্রকল্পগুলোতে অনিয়ম দেশের পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা অর্জনের লক্ষ্যকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। যখন দেশের লাখ লাখ মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ শিকার, তখন এই তহবিলের এমন অপব্যবহার নৈতিক ও মানবিক উভয় দিক থেকেই অগ্রহণযোগ্য। এই দুর্নীতি দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করছে এবং ভবিষ্যতে আরও তহবিল প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

সুপারিশ: জলবায়ু তহবিল ও পরিবেশ প্রকল্পগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা উচিত: ১. টিআইবি এবং দুদকের প্রতিবেদনে উঠে আসা দুর্নীতির প্রতিটি অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। ২. বিসিসিটিএফ-এর পুনর্গঠন করে এর কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় কঠোর তদারকি ও নিরীক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ৩. পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যক্রমে জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সিস্টেম (জিআইএস) ও রিমোট সেনসিং প্রযুক্তির সম্প্রসারণ করে দূষণের মাত্রা শনাক্তকরণ এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদানের প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করতে হবে, যাতে ম্যানুয়াল হস্তক্ষেপ ও দুর্নীতির সুযোগ কমে। ৪. জলবায়ু তহবিল ও পরিবেশ প্রকল্পের সকল তথ্য (বাজেট, প্রকল্প প্রস্তাব, বাস্তবায়ন অগ্রগতি, নিরীক্ষা প্রতিবেদন) জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে এবং একটি সহজলভ্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। ৫. স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের প্রকল্প পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও তদারকি প্রক্রিয়ায় কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে তৃণমূল পর্যায়ে জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পায়। ৬. পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে তা সংশোধন করতে হবে এবং এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে অবৈধ শিল্প-কারখানা ও ইটভাটার বিরুদ্ধে।


🔎 অনুসন্ধানে: ওয়াসিফ ইকবাল

ওয়াসিফ ইকবাল, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: জলবায়ু তহবিল ও পরিবেশ প্রকল্প অডিট।

Nessun commento trovato


News Card Generator